02/06/2026
ইতালিতে “ছ্যাপরী” সংস্কৃতি: একটু ভাবার সময় এসেছে
ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি শব্দ খুব বেশি শোনা যায় “ছ্যাপরী”। সাধারণত এই শব্দটি এমন মানুষকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়, যারা অযথা নজর কাড়ার চেষ্টা করে, অপরিণত আচরণ করে, কিংবা এমন কিছু করে যা অন্যদের কাছে অস্বস্তিকর বা অরুচিকর মনে হয়।
বাংলাদেশে কে কীভাবে চলবে, কী পোশাক পরবে বা কী ধরনের ভিডিও বানাবে, সেটা নিয়ে কিছু না বলি। কিন্তু যখন আমরা বিদেশে থাকি, বিশেষ করে ইতালির মতো দেশে, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত থাকে না।
বিদেশে প্রতিটি বাংলাদেশি একেকটি বাংলাদেশ
আপনি যখন ইতালির রাস্তায় হাঁটেন, অফিসে কাজ করেন, বাসে ওঠেন বা কোনো প্রতিষ্ঠানে যান, তখন মানুষ আপনাকে শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখে না; অনেক সময় তারা আপনার মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকেই মূল্যায়ন করে।
ধরুন, একজন বাংলাদেশি রাস্তায় উচ্চস্বরে চিৎকার করছে, অশোভন আচরণ করছে বা জনসম্মুখে এমন কিছু করছে যা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। একজন ইতালিয়ান হয়তো ভাববে, “বাংলাদেশিরা কি সবাই এমন?” যদিও বাস্তবে তা নয়।
এভাবেই কয়েকজনের আচরণের কারণে পুরো কমিউনিটির সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
দোষটা কি শুধুই ব্যক্তির?
সত্যি বলতে, আমি শুধু সেই মানুষদের দোষ দিই না।
একজন ছেলে বা মেয়ে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে বড় হয়েছে। তাকে কখনো শেখানো হয়নি বিদেশে গিয়ে কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কীভাবে চলতে হয়, কিংবা আন্তর্জাতিক পরিবেশে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়।
ফলে অনেকেই ইতালিতে এসেও নিজের গ্রামের পরিবেশের মতো আচরণ করতে থাকে। এতে তাদের দোষ যেমন আছে, তেমনি আমাদের শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
যারা ইতালিতে এসেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
মনে রাখবেন, এটি বাংলাদেশ নয়; এটি ইতালি। একটি ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সামাজিক নিয়ম ও জীবনধারার দেশ।
এখানে সফল হতে হলে শুধু টাকা উপার্জন করলেই হবে না; সম্মানও অর্জন করতে হবে।
টিকটক বা রিলস বানানো খারাপ নয়। কিন্তু যদি সেটি আপনাকে হাস্যকর, অপরিণত বা অশোভনভাবে উপস্থাপন করে, তাহলে একটু ভেবে দেখুন আপনি কী বার্তা দিচ্ছেন?
নিজেকে এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, যাকে দেখে মানুষ বলবে:
“বাংলাদেশিরা পরিশ্রমী, ভদ্র, শিক্ষিত এবং সম্মানিত মানুষ।”
ইতালীয় ভাষা শিখুন। এখানকার আইন-কানুন জানুন। স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করুন। নিজের ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান এবং আচরণের মাধ্যমে পরিচিত হন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশের স্কুল পর্যায়ে (কমপক্ষে ১ম থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত) একটি বিষয় থাকা উচিত:
“আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব ও প্রবাস জীবন”
যেখানে শেখানো হবে:
বিমান ভ্রমণের শিষ্টাচার
বিদেশে গিয়ে কীভাবে আচরণ করতে হয়
ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোর উপায়
আইন ও নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব
কর্মক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ
প্রবাস জীবনের মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
কারণ আগামী বছরগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে যাবে। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান বিশাল। তাই ভালো প্রবাসী তৈরি করাও জাতীয় স্বার্থের একটি অংশ হওয়া উচিত।
কিছু বাস্তব উদাহরণ
❌ বাসে বা ট্রেনে উচ্চস্বরে ভিডিও দেখা বা কথা বলা।
✅ হেডফোন ব্যবহার করা এবং অন্যের শান্তির প্রতি সম্মান দেখানো।
❌ রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা।
✅ আশেপাশের পরিবেশ বিবেচনা করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা।
❌ শুধুমাত্র ভাইরাল হওয়ার জন্য অদ্ভুত বা বিব্রতকর ভিডিও বানানো।
✅ নিজের দক্ষতা, শিক্ষা, কাজ বা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা।
❌ বছরের পর বছর ইতালিতে থেকেও ভাষা শেখার চেষ্টা না করা।
✅ ইতালীয় ভাষা শেখা এবং সমাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করা।
শেষ কথা
মানুষ সাধারণত সেই আচরণই করে, যা সে দেখে এবং যা তাকে শেখানো হয়। তাই কাউকে ছোট করার আগে আমাদের উচিত তাকে সঠিক পথ দেখানো।
কারণ একজন সচেতন প্রবাসী শুধু নিজের জীবনই বদলায় না; সে পুরো বাংলাদেশের সম্মানও বহন করে।
ভাল থাকুন সবাই ❤️❤️❤️