10/07/2026
🇮🇳 মতভেদ ছিল, বিদ্বেষ নয়। ইতিহাসের পাতায় নেতাজি ও ড. শ্যামাপ্রসাদের সম্পর্ক আজও আমাদের বড় শিক্ষা দেয়।
অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমার অফিসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি একসঙ্গে কেন আছে?
আমার উত্তর খুব স্পষ্ট।
ইতিহাসকে দলীয় দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখলে বাংলার ইতিহাসকে বোঝা যায় না। রাজনৈতিক পথ আলাদা হতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের জন্য সাহস, আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধকে কখনও ছোট করা যায় না।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের 𝐋𝐞𝐚𝐯𝐞𝐬 𝐟𝐫𝐨𝐦 𝐚 𝐃𝐢𝐚𝐫𝐲 পড়লে দেখা যায়, তিনি নেতাজিকে কোনও দূরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি। তাঁর লেখায় মতভেদ আছে, সমালোচনা আছে, কিন্তু ব্যক্তিগত অসম্মান নেই।
একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো। ড. শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ইংরেজি ডায়েরিতে নেতাজিকে বারবার “Subhas” বলে উল্লেখ করেছেন। “Subhas Babu” নয়, “Mr. Bose” নয়, সরাসরি Subhas।
এই সম্বোধনকে অসম্মান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি তাঁদের পারস্পরিক পরিচয়, একই সময়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং এক ধরনের ব্যক্তিগত স্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দেয়। কারণ সম্পূর্ণ দূরের মানুষকে সাধারণত এভাবে লেখা হয় না, বিশেষ করে যখন একই লেখায় শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং রাজনৈতিক আলোচনার উল্লেখ আছে।
𝐋𝐞𝐚𝐯𝐞𝐬 𝐟𝐫𝐨𝐦 𝐚 𝐃𝐢𝐚𝐫𝐲-তে ড. শ্যামাপ্রসাদ লিখেছেন, বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর সরাসরি আলোচনা হয়েছিল। শরৎচন্দ্র বসুর উপস্থিতিতেও তাঁদের দীর্ঘ আলোচনা হয়।
𝐑𝐞𝐟𝐞𝐫𝐞𝐧𝐜𝐞: 𝐋𝐞𝐚𝐯𝐞𝐬 𝐟𝐫𝐨𝐦 𝐚 𝐃𝐢𝐚𝐫𝐲, 𝐩. 𝟑𝟏.
পৃষ্ঠা ৩২-এ তিনি লিখেছেন, সুভাষচন্দ্র তাঁকে সতর্ক করেছিলেন “in a friendly spirit”। এই শব্দবন্ধ খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আলোচনার দরজা বন্ধ ছিল না।
𝐑𝐞𝐟𝐞𝐫𝐞𝐧𝐜𝐞: 𝐋𝐞𝐚𝐯𝐞𝐬 𝐟𝐫𝐨𝐦 𝐚 𝐃𝐢𝐚𝐫𝐲, 𝐩. 𝟑2.
কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী লাইনটি আছে পৃষ্ঠা ৩৫-এ। ড. শ্যামাপ্রসাদ লিখেছেন:
“𝐖𝐞, 𝐬𝐩𝐞𝐜𝐢𝐚𝐥𝐥𝐲 𝐈, 𝐡𝐚𝐝 𝐧𝐨 𝐩𝐞𝐫𝐬𝐨𝐧𝐚𝐥 𝐠𝐫𝐮𝐝𝐠𝐞 𝐚𝐠𝐚𝐢𝐧𝐬𝐭 𝐒𝐮𝐛𝐡𝐚𝐬. 𝐈𝐧𝐝𝐞𝐞𝐝 𝐈 𝐡𝐚𝐝 𝐟𝐨𝐫 𝐡𝐢𝐦 𝐚𝐝𝐦𝐢𝐫𝐚𝐭𝐢𝐨𝐧 𝐚𝐧𝐝 𝐚𝐟𝐟𝐞𝐜𝐭𝐢𝐨𝐧, 𝐚𝐧𝐝 𝐠𝐞𝐧𝐮𝐢𝐧𝐞𝐥𝐲 𝐛𝐞𝐥𝐢𝐞𝐯𝐞𝐝 𝐭𝐡𝐚𝐭 𝐭𝐡𝐞𝐫𝐞 𝐰𝐚𝐬 𝐧𝐨 𝐨𝐭𝐡𝐞𝐫 𝐩𝐞𝐫𝐬𝐨𝐧 𝐰𝐡𝐨 𝐜𝐨𝐮𝐥𝐝 𝐜𝐨𝐦𝐞 𝐧𝐞𝐚𝐫 𝐡𝐢𝐦 𝐢𝐧 𝐭𝐡𝐞 𝐩𝐨𝐥𝐢𝐭𝐢𝐜𝐚𝐥 𝐟𝐢𝐞𝐥𝐝 𝐨𝐟 𝐈𝐧𝐝𝐢𝐚, 𝐬𝐩𝐞𝐜𝐢𝐚𝐥𝐥𝐲 𝐁𝐞𝐧𝐠𝐚𝐥.”
𝐑𝐞𝐟𝐞𝐫𝐞𝐧𝐜𝐞: 𝐃𝐫. 𝐒𝐲𝐚𝐦𝐚 𝐏𝐫𝐚𝐬𝐚𝐝 𝐌𝐨𝐨𝐤𝐞𝐫𝐣𝐞𝐞, 𝐋𝐞𝐚𝐯𝐞𝐬 𝐟𝐫𝐨𝐦 𝐚 𝐃𝐢𝐚𝐫𝐲, 𝐩. 𝟑𝟓.
এই একটি লাইন থেকেই বোঝা যায়, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে কী ভাবতেন।
এটা কোনও শত্রুর ভাষা নয়। এটা কোনও দূরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর শুষ্ক ভাষাও নয়। এই ভাষায় আছে শ্রদ্ধা, স্নেহ, ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক মতভেদ এবং এক ধরনের মান-অভিমানের ছাপ।
যাঁদের মধ্যে সম্পর্ক থাকে, আলোচনা থাকে, মতভেদ থাকে, আবার হৃদয়ের মধ্যে সম্মানও থাকে, তাঁরাই এমনভাবে লিখতে পারেন।
ড. শ্যামাপ্রসাদ স্পষ্ট লিখেছেন, তাঁর নেতাজির প্রতি কোনও ব্যক্তিগত বিরাগ ছিল না। বরং ছিল “𝐚𝐝𝐦𝐢𝐫𝐚𝐭𝐢𝐨𝐧 𝐚𝐧𝐝 𝐚𝐟𝐟𝐞𝐜𝐭𝐢𝐨𝐧”। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন, ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বাংলায়, নেতাজির সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না।
তাই ইতিহাসকে সরল শত্রু-মিত্রের চোখে দেখা ভুল।
ড. শ্যামাপ্রসাদ ও নেতাজির মতভেদ ছিল। কিন্তু সেই মতভেদে বিদ্বেষ ছিল না।
রাজনৈতিক দূরত্ব ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত অসম্মান ছিল না।
বরং ছিল এক গভীর স্বীকৃতি: নেতাজি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অনন্য রাজনৈতিক মহীরুহ।
তাই আমার অফিসে দুজনেরই স্থান আছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আমাদের শেখান, স্বাধীনতার জন্য সাহস লাগে।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আমাদের শেখান, জাতির স্বার্থে দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়াতে হয়।
মতভেদ ইতিহাসের অংশ।
শ্রদ্ধা চরিত্রের পরিচয়।
🇮🇳 ইতিহাসকে বিভাজনের অস্ত্র নয়, চরিত্র গঠনের শিক্ষা হিসেবে দেখা উচিত।
𝐁𝐨𝐨𝐤 𝐑𝐞𝐟𝐞𝐫𝐞𝐧𝐜𝐞:
𝐃𝐫. 𝐒𝐲𝐚𝐦𝐚 𝐏𝐫𝐚𝐬𝐚𝐝 𝐌𝐨𝐨𝐤𝐞𝐫𝐣𝐞𝐞, 𝐋𝐞𝐚𝐯𝐞𝐬 𝐟𝐫𝐨𝐦 𝐚 𝐃𝐢𝐚𝐫𝐲, 𝐎𝐱𝐟𝐨𝐫𝐝 𝐔𝐧𝐢𝐯𝐞𝐫𝐬𝐢𝐭𝐲 𝐏𝐫𝐞𝐬𝐬, 𝟏𝟗𝟗𝟑, 𝐩𝐩. 𝟑𝟏, 𝟑𝟐, 𝟑𝟓