25/06/2026
পলাশীর ষড়যন্ত্রকারীদের শেষ পরিণতি
________________________________
১। জগৎ শেঠ পরিবার
পলাশীর ষড়যন্ত্রের মূল গুটি এবং অর্থদাতা ছিল—জগৎ শেঠ। যার ঘরে বসে রচিত হয়েছিল বাংলার পতনের নকশা। ১৭৬৩ সালে ইংরেজদের সঙ্গে মীর কাসিমের যুদ্ধ শুরু হলে জগৎশেঠেরা আবারও ইংরেজদের অর্থ দিয়ে গোপনে সাহায্য করছিলেন। এই ষড়যন্ত্র হাতেনাতে ধরে ফেলে নবাব মীর কাসিম।
মীর কাসিম নির্দেশ দেয় জগৎশেঠ মহাতাপ চাঁদ ও তাঁর ভাই স্বরূপ চাঁদকে বস্তায় ভরে মুঙ্গের দুর্গের চূড়া থেকে গঙ্গায় ফেলে হত্যা করার।
২। উমিচাঁদ
জয়ের ক্লাইভ চোখ উল্টে ফেলে। ক্লাইভের জালিয়াতির প্রথম শিকার হয়েছিলেন কাসিমবাজার ষড়যন্ত্রের অন্যতম অর্থদাতা ব্যবসায়ী উমিচাঁদ। ক্লাইভ জাল দলিল ব্যবহার করে উমিচাঁদকে লভ্যাংশ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করেছিলেন (সেই বিখ্যাত লাল কাগজ ও সাদা কাগজের চুক্তি)। এই চরম বিশ্বাসভঙ্গের ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে উমিচাঁদ তাঁর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং স্মৃতিভ্রষ্ট ও উন্মাদ অবস্থায় অত্যন্ত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন
৩। রাজবল্লভ
ঘষেটি বেগমের প্রধান দেওয়ান ছিলেন এই রাজা রাজবল্লভ। পলাশীর পর তিনি মীরজাফরের রাজত্বে ভালো পদ পেলেও, পরবর্তীতে মীর কাসিম যখন নবাব হন, তখন রাজবল্লভের ইংরেজ-তোষণ ও ষড়যন্ত্র মীর কাসিমের নজরে আসে। ১৭৬৩ সালে মীর কাসিমের আদেশে জগৎশেঠদের সাথে রাজা রাজবল্লভ এবং তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাসকেও বিহারের মুঙ্গের দুর্গের কাছে বস্তাবন্দী করে পদ্মা-গঙ্গার মিলনস্থলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।
৪। নন্দকুমার
তরুণ নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে যিনি ইংরেজদের কলকাতা পুনর্দখল করতে দিয়েছিলেন, সেই নন্দকুমার পরবর্তীতে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এক জালিয়াতির মামলায় ফেঁসে যান। ১৭৭৫ সালে কলকাতায় অত্যন্ত অপমানজনকভাবে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
৫। রবার্ট ক্লাইভ
পলাশীর যুদ্ধের মূল কারিগর রবার্ট ক্লাইভ ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করে ব্রিটেনে ফিরে যান। তিনি তৎকালীন ইংল্যান্ডের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপের অভিযোগ ওঠে। যদিও বিচারে তিনি খালাস পান, কিন্তু তীব্র সামাজিক ধিক্কার, অপবাদ এবং শারীরিক অসুস্থতার (পিত্তথলির পাথর) তীব্র যন্ত্রণায় তিনি ভেঙে পড়েন। অতিরিক্ত আফিম সেবনের কারণে তীব্র মানসিক অবসাদ ও হাহাকার থেকে ১৭৭৪ সালে লন্ডনে নিজের বিলাসবহুল বাড়িতে এই ব্রিটিশ সেনাপতি বাথরুমে ছুরি দিয়ে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেন।
৬। ইয়ার লতিফ খান
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীর অন্যতম এই সেনাপতি পলাশীর মাঠে মীরজাফরের মতো নিজ সৈন্যদল নিয়ে পুতুলের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রের মূল চুক্তি অনুযায়ী, তাঁরও নবাব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লর্ড ক্লাইভ শেষ মুহূর্তে মীরজাফরকে বেছে নেন। যুদ্ধের পর ইয়ার লতিফ খান তাঁর প্রাপ্য ক্ষমতা বা অর্থ কোনোটিই পাননি। কিছুদিন পর তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। ধারণা করা হয়, মীরজাফরের পুত্র মীরন অথবা ইংরেজদের নির্দেশে তাঁকে গুপ্তহত্যা করে লাশ গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল।
৭। দানা শাহ
নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন সপরিবারে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন রাজমহলের কাছে এই তথাকথিত সুফি সাধক বা ফকির দানা শাহ নবাবকে চিনে ফেলেন। নবাবের কাছে থাকা বহুমূল্য রত্ন দেখে এবং পুরস্কারের লোভে সে মীরজাফরের ভাই মীর দাউদকে খবর দিয়ে নবাবকে ধরিয়ে দেয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই চরম বিশ্বাসঘাতকতার কিছুদিন পরেই এক বিষাক্ত সাপের কামড়ে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কভাবে দানা শাহের মৃত্যু হয়।
৮। ঘষেটি বেগম
নবাব সিরাজের খালা ও অন্যতম প্রধান চক্রান্তকারী ঘষেটি বেগমকে পলাশীর পর মীরজাফরের পুত্র মীরন ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে বন্দি করে রাখেন। পরবর্তীতে ১৭৬০ সালে তাঁদেরকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বুড়িগঙ্গা বা ধলেশ্বরী নদীতে চলন্ত নৌকা ফুটো করে ডুবিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
৯। মীরজাফর
ষড়যন্ত্রের অন্যতম গুটি মীরজাফর আলী খান বাংলার মসনদ পেলেও তাঁর সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত হওয়া এই নবাব ১৭৬৫ সালে এক মারাত্মক ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। লোকগাথা অনুযায়ী তাঁর সারা শরীর কুষ্ঠ রোগে পচে খসে পড়েছিল।
১০। মিরন
মীরজাফরের চেয়েও নির্মম পরিণতি হয়েছিল তাঁর পুত্র মীরনের, যিনি সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার মূল নির্দেশদাতা ছিলেন। ১৭৬০ সালে বিহারে এক সামরিক অভিযানের সময় মেজর ওয়াটসনের তাঁবুতে রহস্যময় এক বজ্রপাতে মীরন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। অনেকে মনে করেন, ইংরেজরাই তাদের এই অবাধ্য মিত্রকে পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল।
১১। মুহাম্মদী বেগ:
বেগ সামান্য অর্থের বিনিময়ে নিজ আশ্রয়দাতা সিরাজউদ্দৌলাকে তলোয়ারের আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড করেছিলেন, তিনি শেষ জীবনে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে যান এবং এক অন্ধকার কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
১২। মীর কাসিম
যদিও মীর কাসিমের পলাশীর পরে বোধোদয় হয়, ইংরেজ এবং হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তবে তিনিও পলাশীর অভিশাপ এড়াতে পারে নাই। বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দিল্লী পালিয়ে যান। শেষ জীবনে তার অবস্থা—ছিন্নবস্ত্র, ভিখারীর মতো জীবন। এই দশাতেই তার জামে মসজিদের কাছে মৃত্যু হয়।
( মূল লেখা থেকে সংক্ষেপিত)