17/09/2026
“তালাক দিলেই কি সব শেষ? নাকি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া শুরু হতে পারে নতুন আইনি জটিলতা!
রহিম ও করিম দুই বন্ধু। একদিন আদালতের বারান্দায় বসে তারা পারিবারিক আইন নিয়ে আলোচনা করছিল।
রহিম বলল, “বন্ধু, আমি তো জানি চেয়ারম্যানকে তালাকের নোটিশ দিলেই ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তাহলে আবার রেজিস্ট্রেশন করার দরকার কী?”
করিম মুচকি হেসে বলল, “এই ভুল ধারণার কারণেই অনেক মানুষ পরবর্তীতে জটিল আইনি সমস্যায় পড়ে। শোন, পুরো বিষয়টা পরিষ্কার করে বলছি।”
তালাক কার্যকর হওয়ার প্রথম ধাপ:
করিম বলল, “মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭(৩) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে তালাকের নোটিশ দেওয়ার পর ৯০ দিন অতিবাহিত হলে তালাক কার্যকর হয়।”
রহিম বলল, “তাহলে তো সব শেষ!”
করিম মাথা নেড়ে বলল,"না, এখানেই আসল ভুলটা হয়। তালাক কার্যকর হওয়া আর আইনগতভাবে তা যথাযথভাবে নথিভুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়।”
রেজিস্ট্রেশন কেন বাধ্যতামূলক?
করিম বলল, “মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪-এর ৬ ধারায় তালাক নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।”
এর সমর্থনে 10 ALR (2017) (2) (HC) 269 মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন— 'মুসলিম আইনের অধীন কোনো তালাক আইনগতভাবে স্বীকৃত হতে হলে তা ১৯৭৪ সালের আইনের ৬(১) ধারার বিধান অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে।’
আবার 36 BLD (2016) (HC) 538 মামলায় আদালত বলেছেন- 'যেভাবে বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, ঠিক সেভাবেই তালাকও নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিকট বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হবে।’
রেজিস্ট্রেশন না করলে কী হতে পারে?
করিম বলল,“ধরো, কয়েক বছর পরে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। তখন প্রথম স্ত্রী দাবি করলেন যে কোনো তালাকই হয়নি। যদি রেজিস্ট্রেশনের দলিল না থাকে, তাহলে আদালতে তালাক প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যাবে।”
রহিম বিস্মিত হয়ে বলল, “তাহলে দেনমোহর, খোরপোষ কিংবা উত্তরাধিকার নিয়েও সমস্যা হতে পারে?”
করিম বলল, “অবশ্যই। শুধু তাই নয়, বৈবাহিক অবস্থান নিয়েও দীর্ঘ আইনি বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।”
কাজী রেজিস্ট্রেশন করতে অস্বীকৃতি জানালে?
করিম আরও বলল,“আইন এখানেও প্রতিকার দিয়েছে। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪-এর ৬(৪) ধারা অনুযায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রার তালাক নিবন্ধনে অস্বীকৃতি জানালে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের নিকট আপিল করতে পারবেন। সেই আপিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।”
রেজিস্ট্রেশন না থাকলে যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে:
১. দ্বিতীয় বিবাহের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে (বিশেষত মুসলিম নারীর পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে);
২. দেনমোহর ও খোরপোষ সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে;
৩. আদালতে তালাক প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে;
৪. উত্তরাধিকার নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে;
৫. স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা-মোকদ্দমা চলতে পারে।
করিম শেষ কথা হিসেবে বলল—
“চেয়ারম্যানকে নোটিশ প্রদান ও ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়া বা আইনানুগ সময় অতিবাহিত হওয়ার মাধ্যমে তালাক কার্যকর হতে পারে; কিন্তু সেই তালাককে ভবিষ্যতের বিরোধ, সন্দেহ ও আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতে রেজিস্ট্রেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক।”
আইনের ভাষায়, তালাকের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তালাকের রেজিস্ট্রেশনই তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।
মোঃ নাজমুল আলম
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট