01/01/2026
২৫ মার্চ, ২০২৫ ইং তারিখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অধিকতর সংশোধনকল্পে রাষ্ট্রপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করেন। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে উক্ত আইনে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন আনা হয় যা সংক্ষিপ্ত এবং সহজবোধ্যভাবে নীচে উপস্থাপন করা হয়েছে।
1. সংজ্ঞা: এই সংশোধনী দ্বারা ধারা ২-এ নতুন তিনটি দফা যথাক্রমে ‘ছছ’, ‘ছছছ’ এবং ‘ঞঞ’ সংযুক্ত করে বলাৎকার, মারাত্মক জখম এবং যৌনকর্মকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
2. দন্ডের পরিমানে পরিবর্তন:
• ধারা ৪-এর অধীনে দহনকারী, ইত্যাদি পদার্থ দ্বারা সংঘটিত অপরাধের শাস্তিস্বরূপ প্রদত্ত অর্থদন্ডের পরিমান বৃদ্ধি করে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকাকে অনূর্ধ্ব ১০ লক্ষ টাকা এবং অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকাকে অনূর্ধ্ব ৫ লক্ষ টাকায় রুপান্তর করা হয়েছে।
• ধারা ৯-এর অধীনে ধর্ষনের শাস্তিস্বরূপ প্রদত্ত অর্থদন্ডের পরিমান বৃদ্ধি করে অন্যূন ১ লক্ষ টাকা থেকে পরিবর্তন করে অনধিক ২০ লক্ষ টাকায় রূপান্তর করা হয়েছে।
• ধারা ৯ উপধারা ৪-এ নতুন দফা ‘গ’ সংযুক্ত করা হয়েছে। কোন ব্যাক্তি কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে শরীরের কোন অঙ্গ, ধারালো অস্ত্র, রাসায়নিক পদার্থ, বা অন্য কোন উপকরণ ব্যবহার করে কিংবা অন্য কোনভাবে নারী বা শিশুর যৌনাঙ্গ বা স্তনে মারাত্মক জখম (grievous hurt) করলে, উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা এবং অতিরিক্ত অনূর্ধ্ব ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।
• ধারা ৯ উপধারা ৫-এ পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন ধর্ষনের শাস্তিস্বরূপ প্রদত্ত অর্থদন্ডের পরিমান বৃদ্ধি করে অন্যূন ১০ হাজার টাকা থেকে পরিবর্তন করে অনধিক ৫০ হাজার টাকায় রূপান্তর করা হয়েছে।
• ধারা ১১-এর দফা ‘ক’ পরিবর্তন করে নতুন দফা ‘ক’ এবং ‘কক’ করা হয়েছে। যৌতুকের জন্যে মৃত্যু ঘটানোর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড থেকে পরিবর্তন করে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড করা হয়েছে এবং মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টার জন্যে নির্ধারিত একমাত্র শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড থেকে পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক বার বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড করা হয়েছে।
• ধারা ১১-এর দফা ‘গ’-তে যৌতুকের জন্যে সাধারণ জখম করার শাস্তি অনধিক ৫ বৎসর কিন্তু অন্যূন ২ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড করা হয়েছে যা পূর্বে ছিল অনধিক ৩ বৎসর কিন্তু অন্যূন ১ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড।
• ধারা ১৭-তে নতুন উপধারা ৩ সংযুক্ত হয়েছে। এখন এই আইনের অধীন কোন অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর রায় প্রদানকালে যদি ট্রাইব্যুনালের নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয় যে, কোন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তাহলে উক্ত ট্রাইব্যুনাল মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তি বরাবর যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারবে এবং প্রয়োজন মনে করলে ক্ষতিপূরণের আদেশ প্রদানের পাশাপাশি উক্ত মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তিকে অনধিক ২ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবে।
3. ধর্ষন সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন:
• ধারা ৯-এ ‘পুরুষ’ শব্দটি পরিবর্তন করে ‘কোন ব্যক্তি’ সন্নিবেশিত হয়েছে। অর্থাৎ এখন শুধু পুরুষ নয় যেকোন লিঙ্গের ব্যক্তি ধর্ষনের জন্যে অভিযুক্ত হতে পারে এবং শাস্তি পেতে পারে। এই ধারায় ধর্ষনের ফলে গুরুতর জখমের শাস্তি সনযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অর্থদন্ডের পরিমাণে পরিবর্তন আনা হয়েছে যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
• এছাড়া উপধারা ৬ সংযুক্ত করা হয়েছে। এখন থেকে এই ধারায় অর্পিত আরোপিত অর্থদন্ড ক্ষতিপূরণ হিসাবে অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা, ক্ষেত্রমত, তাহার আইনগত উত্তরাধিকারীকে প্রদান করার বিধান করা হয়েছে।
• ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলা তদন্ত করার সময়ে প্রশাসনিক আদেশে কোন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বদলি করা যাবে না মর্মে বিধান করা হয়েছে। [ধারা ১৮]
• ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার বিচারকার্য ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের তারিখ হতে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে সমাপ্ত করতে হবে। [ধারা ২০(৩ক)]
• কেবল ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত মনে করলে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারবে। [ধারা ২০(৯)]
4. বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম: ধারা ৯খ সংযুক্ত করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সংগে যৌনকর্ম শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। নারীর সাথে আস্থাভাজন সম্পর্ক আছে এমন ব্যক্তি দৈহিক বলপ্রয়োগ ব্যতীত বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ১৬ বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সংগে যৌনকর্ম করলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৭ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।
5. অপরাধের তদন্ত: এই আইনের অধীন কোন অপরাধের অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময়ে হাতেনাতে ধরা না পরলে, সেক্ষেত্রে অপরাধের তদন্তের আদেশ প্রাপ্তির তারিখ হইতে পরবর্তী ৩০ কার্য দিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এই সময়কাল সংশোধনীর পূর্বে ৬০ কার্য দিবস ছিল। [ধারা ১৮(১)(খ)]
6. আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচার: ধারা ২১ প্রতিস্থাপন করে আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচারের নতুন পদ্ধতি ঢুকানো হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের যদি বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি তার গ্রেফতার বা তাকে বিচারের জন্য সোপর্দকরণ এড়াবার জন্য পলাতক আছেন বা আত্মগোপন করেছেন এবং তাহার আশু গ্রেফতারের কোন সম্ভাবনা নাই, সেইক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যে উক্ত অনুপস্থিত বা পলাতক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাজির করার জন্যে তথ্যপ্রযুক্তির যে কোন উপযুক্ত মাধ্যমে বা একটি বাংলা দৈনিক জাতীয় খবরের কাগজে প্রজ্ঞাপিত আদেশ দ্বারা বা অন্যবিধ যুক্তিসংগত যে কোন উপায়ে উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নোটিশ জারি করে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে হাজির না হন, তাহা হইলে ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে বিচার করতে পারবে।
7. থানার অফিসার ইনচার্জের দায়িত্ব: অফিসার ইনচার্জের দায়িত্ব সংক্রান্ত নতুন ধারা ২৫ক সংযুক্ত করা হয়েছে। কোন অপরাধের প্রাথমিক সাক্ষ্যপ্রমাণসহ কোনো অভিযোগকারী থানায় হাজির হলে অফিসার ইনচার্জ তাৎক্ষণিকভাবে তার অভিযোগটি এজাহারভুক্ত করবেন এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল পরীক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কোন অফিসার ইনচার্জ শুধু এই যুক্তিতে কাউকে ফিরিয়ে দেবে না যে ঘটনাটি অন্য থানার এখতিয়ারাধীন এলাকায় ঘটেছে।
8. শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল: শিশু ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধ বিচারের নিমিত্ত প্রত্যেক জেলায় ও মহানগর এলাকায় শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল নামে এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করার বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকার জেলা ও দায়রা জজগণের মধ্য হতে উক্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিযুক্ত করবে। [ধারা ২৬ক]
9. আপীল: এখন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ, রায় বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপীল করতে হবে ৩০ দিনের মধ্যে। পূর্বে এই সময়সীমা ছিল ৬০ দিন। [ধারা ২৮]
10. সুরক্ষা ও ভাতা: ধারা ৩২খ সংযুক্ত করে তদন্তাধীন বা বিচারাধীন মামলার অভিযোগকারী বা অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা কোন সাক্ষীকে নিরাপত্তা বা সুরক্ষা প্রদান এবং মামলায় আগত সাক্ষীদের যাতায়াত ও সময়ের ক্ষতিপূরণ বাবদ যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ নির্ধারণ ও প্রদান করার আদেশ প্রদানের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রদান করা হয়েছে।
11. ধারা ১১ এর দফা (গ) এ বর্ণিত অপরাধ সম্পর্কে বিশেষ বিধান: নতুন ধারা ৩৫ সংযুক্ত করে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটকে এই আইনের ধারা ১১ এর দফা (গ) এ বর্ণিত অপরাধ (যৌতুকের জন্যে সাধারন জখম) বিচার করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
সূত্র- ল ল্যাব