14/08/2026
টার্নওভার ট্যাক্স: আয়ের বদলে বিক্রির উপর কর, কতটা ন্যায়সঙ্গত?
লোকমান হোসাইন
আইনজীবী, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ন্যূনতম টার্নওভার ট্যাক্সের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন ব্যবসায়ী বছরে ১০০ টাকার পণ্য বা সেবা বিক্রি করলে, তাকে সেই ১০০ টাকার উপর ১ টাকা কর দিতে হবে—তার প্রকৃত আয় বা মুনাফা যাই হোক না কেন। হিসাব করলে দেখা যায়, একজন ব্যবসায়ী যদি বছরে ১ কোটি টাকা টার্নওভার দেখান, তাহলে লাভ-লোকসান নির্বিশেষে তাকে ন্যূনতম ১ লক্ষ টাকা কর পরিশোধ করতে হবে। এই বিধানটি নিয়ে ব্যবসায়ী মহল ও কর অঙ্গনে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছে, এবং সংশ্লিষ্ট মহল থেকে ইতিমধ্যে এই সীমা পুনর্বিবেচনার দাবিও উঠেছে।
আয়কর বনাম টার্নওভার কর: মৌলিক পার্থক্য
আয়কর আইনের নামেই এর মূল দর্শন নিহিত—কর আরোপিত হবে আয়ের উপর, ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে প্রকৃত মুনাফা অবশিষ্ট থাকে তার উপর। এটিই আয়কর ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক ও সর্বজনস্বীকৃত নীতি। কিন্তু টার্নওভার বা মোট বিক্রয়ের উপর কর আরোপ করা হলে এই মূলনীতিই লঙ্ঘিত হয়। টার্নওভার একটি ব্যবসায়ের কার্যক্রমের পরিমাণ নির্দেশ করে, লাভের পরিমাণ নয়। একজন ব্যবসায়ী প্রচুর বিক্রি করেও অল্প মুনাফা করতে পারেন, এমনকি লোকসানেও থাকতে পারেন—বিশেষত যেসব খাতে মুনাফার হার (margin) সীমিত, যেমন খুচরা ব্যবসা, পাইকারি বাণিজ্য বা উৎপাদনশীল শিল্প।
এমতাবস্থায় টার্নওভারের উপর সরাসরি ১ শতাংশ হারে কর আরোপ করার অর্থ দাঁড়ায়—একজন ব্যবসায়ী লাভ করুন বা না করুন, তাকে নির্দিষ্ট হারে কর গুনতেই হবে। এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ করনীতির একটি স্বীকৃত নীতি হলো "করদানের সক্ষমতা অনুযায়ী কর" (ability to pay principle)। যার আয় নেই বা সামান্য, তাকে বড় অঙ্কের কর দিতে বাধ্য করা এই নীতির পরিপন্থী।
অগ্রিম করের যৌক্তিকতা ও তার সীমা
এটি ঠিক যে, রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে এবং কর ফাঁকি রোধে ন্যূনতম বা অগ্রিম কর ব্যবস্থার একটি যৌক্তিকতা রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী প্রকৃত আয় গোপন করে বা কম দেখিয়ে কর এড়ানোর চেষ্টা করেন—এই বাস্তবতায় সরকারের পক্ষে একটি ন্যূনতম কর ব্যবস্থা রাখা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ন্যূনতম বিকল্প কর (Alternative Minimum Tax) বা টার্নওভার-ভিত্তিক ন্যূনতম কর ব্যবস্থা প্রচলিত আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অগ্রিম বা ন্যূনতম করের হার কত হওয়া উচিত। এটি এমন একটি সহনীয় মাত্রায় রাখা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃতপক্ষে লোকসানে থাকা বা সামান্য মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের উপর তা অসহনীয় বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। ১ শতাংশ হার—বিশেষত যেসব ব্যবসায় মুনাফার হার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেমন মুদি ব্যবসা, পাইকারি বিক্রয়, নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবসা—তাদের জন্য কার্যত প্রকৃত মুনাফার একটি বড় অংশ কর হিসেবে চলে যাওয়ার শামিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো লোকসানেও কর দিতে হবে, যা ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের উপর প্রভাব
এই বর্ধিত হারের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা (SME)। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনামূলক বেশি মুনাফার হার ও সক্ষমতা থাকলেও, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রায়শই সীমিত মূলধন, কম মুনাফার মার্জিন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার সংগ্রাম করেন। এমন একটি খাতের উপর টার্নওভারের ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর আরোপ করা মানে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
দেশের অর্থনীতিতে SME খাতের অবদান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর ভূমিকা বিবেচনায় নিলে, এই ধরনের নীতি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে, ব্যবসা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের (formalization) পরিবর্তে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যবসা ঠেলে দিতে পারে, এবং সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ের যে মূল লক্ষ্য, তাও ব্যাহত হতে পারে।
করনীতিতে ভারসাম্যের প্রয়োজন
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, এবং এনবিআরের এই প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলার সুযোগ নেই। তবে রাজস্ব আদায়ের পথ হিসেবে যদি এমন একটি ব্যবস্থা বেছে নেওয়া হয় যা মুনাফার সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং করদাতার প্রকৃত সক্ষমতা বিবেচনা করে না, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে করদাতা ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাব করা যায়—টার্নওভার ট্যাক্সের হার পুনর্বিবেচনা করে একটি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা, অথবা খাতভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন হার নির্ধারণ করা, যাতে কম মুনাফার মার্জিনের ব্যবসাগুলো অসহনীয় করের বোঝায় না পড়ে। পাশাপাশি, প্রকৃত লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ন্যূনতম কর থেকে অব্যাহতি বা সমন্বয়ের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
উপসংহার
আয়কর আইনের মূল দর্শন হলো আয়ের উপর কর আরোপ—এই নীতি থেকে সরে গিয়ে টার্নওভারের উপর উচ্চ হারে ন্যূনতম কর আরোপ করা ন্যায়বিচারের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেই বলা যায়, ১ শতাংশ হারের এই ন্যূনতম টার্নওভার ট্যাক্স বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ভারসাম্যহীন ও কষ্টকর বিধান। নীতিনির্ধারকদের উচিত এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে একটি সহনীয়, ন্যায়সঙ্গত ও ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়ন করা—যাতে রাজস্ব আদায়ও নিশ্চিত হয়, আবার ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার সক্ষমতাও অক্ষুণ্ণ থাকে।
লেখক: আইনজীবী, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট; সিইও, লোকমান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস
আপনার মতামত জানতে চাই
আপনি কি মনে করেন, ১% turnover-based minimum tax ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহনীয়? নাকি এর হার ও কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন?
#আয়কর #আয়করআইন #অর্থআইন২০২৬ #টার্নওভারট্যাক্স