22/07/2026
উচ্চ আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন কাস্টডি-সংক্রান্ত বিরোধ দেখি, যেখানে বাবা ও মা—উভয়েই সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে তাকে নিজের কাছে রাখতে চান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে সেই ভালোবাসার লড়াইই শিশুটির জন্য মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাস্তবে দেখা যায়, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর পারস্পরিক অভিমান, ক্ষোভ কিংবা অহমিকা অনেক সময় আইনি বিরোধকে আরও জটিল করে তোলে। আদালতের বাইরে যে বিষয়টি আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান হতে পারত, সেটিই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। আর সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সেই শিশুকেই, যার কোনো দোষ নেই।
বাংলাদেশের পারিবারিক আইন এবং বিচারিক নীতিতে সন্তানের কাস্টডি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি বারবার প্রতিফলিত হয়েছে—“Welfare of the Child” (সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ)। অর্থাৎ, আদালত কেবল বাবা বা মায়ের আইনগত অধিকার বিবেচনা করেন না; বরং শিশুর বয়স, মানসিক ও শারীরিক বিকাশ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, আবেগগত স্থিতি এবং সামগ্রিক কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
আইনজীবী হিসেবে আমাদের ভূমিকাও কেবল আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় ক্লায়েন্টকে বাস্তবতা বোঝানো, অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়াতে উৎসাহিত করা এবং সন্তানের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, অধিকাংশ শিশু বাবা-মা—উভয়ের ভালোবাসা, সান্নিধ্য ও মানসিক সমর্থনেই সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করে। তাই দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান হলেও, অভিভাবকত্বের দায়িত্বের অবসান হয় না।
আসুন, আমরা মনে রাখি—কাস্টডি মামলায় প্রকৃত বিজয়ী সেই পক্ষ নয়, যে আদালতের আদেশ পায়; প্রকৃত বিজয় তখনই, যখন একটি শিশুর শৈশব, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থেকে রক্ষা পায়।
শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থই হোক প্রতিটি কাস্টডি বিরোধের মূল বিবেচনা।
মোহাম্মদ আহসান উদ্দিন নিলয়,
ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট