30/06/2025
মিথ্যা নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলা: একজন পুরুষের করণীয় ও আইনি প্রতিকার:
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। তবে এসব আইনের অপব্যবহার অনেক সময় নিরপরাধ পুরুষ ও তার পরিবারকে ভয়াবহ হয়রানির শিকার করে। বিশেষ করে, মিথ্যা নারী নির্যাতন বা যৌতুকের মামলা দিয়ে সামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়।
এই লেখায় আমরা দেখবো—
১. কোন কোন আইন দিয়ে পুরুষরা প্রতিকার পেতে পারেন
২. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০–এর ৭ ধারা কিভাবে ব্যবহার করা যায়
৩. বাস্তব মামলা, কোর্টের রায় ও পত্রিকার খবর
৪. এবং সচেতনতামূলক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।
প্রধান প্রযোজ্য আইনসমূহ:
1. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)
2. দণ্ডবিধি ১৮৬০ (Penal Code)
3. ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)
4. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (প্রয়োজনে)
আইনের অপব্যবহার:
অনেক সময় দেখা যায়, একজন নারী পারিবারিক বিরোধের জেরে মিথ্যা নারী নির্যাতন বা যৌতুক মামলা দিয়ে স্বামী ও তার পরিবারকে ফাঁসিয়ে দেন।
কিন্তু যদি এটা প্রমাণ হয় যে অভিযোগটি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তাহলে আইনেই সেই নারী বা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
- আইনি প্রতিকার ও করণীয় (Step-by-Step):
১. জামিনের আবেদন (Section 498 CrPC):
i) মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে প্রথম কাজ হলো জামিনের আবেদন করা।
ii) প্রয়োজন হলে হাইকোর্টে রুল জারি করে জামিন চাওয়া যায়।
২. মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে প্রতিকার:
i) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ – ধারা ১৭:
এই ধারা অনুযায়ী,
"কোনো ব্যক্তি যদি মিথ্যা মামলা বা মিথ্যা অভিযোগ করেন বা মিথ্যা তথ্য দেন, তাহলে তিনি অনধিক ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।"
- এটা একটি শাস্তিমূলক ধারা, যা পুরুষ বা যে কেউ মিথ্যা মামলার শিকার হলে প্রয়োগ করতে পারেন।
ii) দণ্ডবিধির ধারা ২১১:
- উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করলে, এই ধারায় মামলা করা যায়।
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল।
iii) দণ্ডবিধি ৫০০-৫০২: মানহানির মামলা
- যদি সামাজিকভাবে সম্মানহানি হয়, তাহলে মানহানির মামলার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব।
৩. জেনারেল ডায়েরি (GD) ও Counter Case:
- ঘটনা ঘটার পরপরই থানায় জিডি করে রাখুন।
- নিজের অবস্থান স্পষ্ট করুন এবং সম্ভাব্য হুমকি উল্লেখ করুন।
৪. ডিজিটাল সাক্ষ্য সংরক্ষণ:
- সকল চ্যাট, কল রেকর্ড, ভিডিও, ভয়েস ক্লিপ ইত্যাদি নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।
- এগুলো মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৫. হাইকোর্টে রিট আবেদন (Writ):
- যদি মামলা গঠনে ত্রুটি থাকে বা হয়রানিমূলক হয়, তাহলে হাইকোর্টে রিট দিয়ে মামলা বাতিল করা যায়।
বাস্তব মামলা ও কোর্টের পর্যবেক্ষণ:
Case Reference:
State vs. Md. Shahidul Islam, 69 DLR (HCD) 123 (2017)
হাইকোর্ট বলেন:
"নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন যেমন প্রয়োগযোগ্য, তেমন এর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণেও আদালতের দৃষ্টি রাখা জরুরি।"
Ariful Islam vs. The State (2020)
মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত বলেন—শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী ধরা যায় না।
পত্রিকার সংবাদ ও বাস্তব উদাহরণ:
প্রথম আলো (২০২২):
এক নারী তার স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেন। বিচার শেষে প্রমাণ হয় অভিযোগটি ভিত্তিহীন। আদালত তাকে ‘ভুয়া মামলা দায়েরকারী’ হিসেবে দণ্ড দেন।
ঢাকা টাইমস রিপোর্ট (২০২১):
মিরপুরের এক নারী যৌতুক মামলা করেন। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে স্বামী মানহানির মামলা করেন এবং আদালত ক্ষতিপূরণের আদেশ দেন।
নারায়ণগঞ্জ (২০২১):
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৭ ধারায় নারীকে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়, কারণ প্রমাণিত হয় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন।
সচেতনতামূলক পরামর্শ:
✔️ আইন যেমন অপরাধীর বিরুদ্ধে, তেমনি নিরপরাধের পক্ষে।
✔️ প্রতিটি পদক্ষেপে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা গ্রহণ করুন।
✔️ কেবল অভিযোগ খারিজ হলেই ৭ ধারা প্রযোজ্য হয় না—ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে তা প্রমাণ করতে হবে।
✔️ কোনভাবেই উত্তেজিত হয়ে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না—সবসময় আইনানুগ পথে চলুন।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন নারীকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হলেও, এর অপব্যবহারও এখন এক বাস্তবতা। একজন পুরুষ যদি মিথ্যা মামলার শিকার হন, তাহলে হতাশ না হয়ে আইনানুগ পথে ন্যায্য প্রতিকার নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্য আইনের সমান ব্যবহারই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
আপনার বা আপনার পরিচিত কারো যদি এমন সমস্যায় পড়তে হয়, দয়া করে একজন দক্ষ আইনজীবীর সহায়তা নিন এবং আইনি প্রমাণাদি আগে থেকেই সুরক্ষিত রাখুন।।
তানিয়া আক্তার রেশমী
অ্যাডভোকেট
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ময়মনসিংহ।।