03/06/2026
ডিএনএ টেস্ট কি যেকোনো সময় করা যায়? বাংলাদেশ হাইকোর্টের একটি যুগান্তকারী রায়
মামলা: মোঃ শাখাওয়াত হোসেন বনাম আফরোজ সানু
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ)
রায়ের তারিখ: ২৬ নভেম্বর, ২০১৫
বিচারক: মাননীয় বিচারপতি মি. শরীফ উদ্দিন চাকলাদার
রেফারেন্স: 24 BLT HCD 150
[Civil Revision No. 1115 of 2015]
🧩 মামলার পটভূমি (স্টেপ-১)
আফরোজ সানু নামের একজন মহিলা দাবি করেন:
· ২০০৮ সালে তিনি পূর্বের স্বামীকে তালাক দেন।
· ২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি মোঃ শাখাওয়াত হোসেনকে (যিনি একজন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) বিয়ে করেন।
· ৫ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হলেও তা পরিশোধ করা হয়নি।
· তাদের দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয় এবং ২০১২ সাল থেকে স্বামী ভরণপোষণ দিচ্ছেন না।
অপরদিকে, স্বামী মোঃ শাখাওয়াত হোসেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেন:
· তিনি দাবি করেন, তাদের মধ্যে কোনোদিন কোনো বৈধ বিয়েই হয়নি।
· এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং তাঁর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে টাকা আদায়ের একটি অপচেষ্টা মাত্র।
⚖️ নিম্ন আদালত কী করেছিল? (স্টেপ-২)
ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া ফ্যামিলি কোর্টে মামলা চলাকালীন:
· ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল স্ত্রী হঠাৎ সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণে ডিএনএ টেস্টের আবেদন করেন।
· ফ্যামিলি কোর্টের বিচারক কোনো শুনানি ছাড়াই, স্বামীকে আপত্তি তোলার সুযোগ না দিয়ে, ওই দিনই আবেদনের প্রথম পৃষ্ঠার বাম পাশে নিজ হাতে লিখে (Handwriting) ডিএনএ টেস্টের আদেশ দিয়ে দেন!
· এই তাড়াহুড়ো করে দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে স্বামী জেলা জজে আপিল করলেও তা খারিজ হয়। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন আবেদন করেন।
🏛️ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও কঠোর মন্তব্য (স্টেপ-৩)
হাইকোর্ট শুনানিতে দুটি মূল প্রশ্ন তোলেন:
১. ডিএনএ টেস্টের আদেশ দেওয়ার মতো কোনো আইনগত ভিত্তি (Valid Foundation) আদৌ ছিল কি?
২. শুধু 'সহবাসের' (Co-habitation) দাবি কি মুসলিম আইনে বিয়ে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট?
নিম্ন আদালতের তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত নিয়ে মাননীয় বিচারপতি মন্তব্য করেন:
"আমি বুঝতে পারছি না কেন নিম্ন আদালতের বিচারক এত তাড়াহুড়ো করে আদেশ দিলেন। এটি কোনো বিচারিক আদেশ (Judicial Order) নয়, বরং তাড়াহুড়ো করে পাস করা একটি আদেশ।"
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই নারীর দাবিকৃত বিয়ের কোনো কাজী, রেজিস্ট্রি বা সাক্ষী ছিল না। এমনকি তিনি অন্য এক ব্যক্তির সাথেও সম্পর্কে যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
📖 মুসলিম আইনে বৈধ বিয়ের শর্তাবলি (স্টেপ-৪)
মাননীয় বিচারপতি মুসলিম পারিবারিক আইন ব্যাখ্যা করে বলেন:
"শুধু একসঙ্গে বসবাস বা ঘুমালেই বিয়ে হয় না—এটি পাশ্চাত্য সংস্কৃতি (Western Culture), যেখানে 'লিভ টুগেদার' বৈধ। কিন্তু ইসলামে লিভ টুগেদার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।"
ইসলামী শরিয়ত ও আইন অনুযায়ী বৈধ বিয়ের জন্য যা যা আবশ্যক:
১. কাজী বা নিকাহ রেজিস্টার
২. নির্দিষ্ট সাক্ষী (২ জন পুরুষ অথবা ১ জন পুরুষ ও ২ জন নারী)
৩. কাবিননামা (লিখিত চুক্তি)
৪. দেনমোহর নির্ধারণ ও ধর্মীয় রীতিনীতি।
আদালত 'খোরশেদ আলম বনাম আমির সুলতান হায়দার [38 DLR (AD) 133]' মামলার সূত্র ধরে আরও কঠোর ভাষায় বলেন:
"কোনো পতিতা, কলগার্ল বা গণিকা দীর্ঘদিন কারো সঙ্গে শয়ন বা সহবাস করলেও সে 'স্ত্রী'র মর্যাদা পায় না। এবং সেই নারী বা তার সন্তান কখনো পুরুষের ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী) হতে পারে না।"
🔬 ডিএনএ টেস্টের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (স্টেপ-৫)
ডিএনএ টেস্ট প্রসঙ্গে মহামান্য হাইকোর্ট বলেন:
"ডিএনএ (DNA) মূলত অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত এক ধরনের ম্যাক্রোমলিকিউল (Macromolecule), যা জিনগত তথ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন।
ডিএনএ টেস্ট একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু এটি কোনো রুটিন টুল নয়। যতক্ষণ না মামলায় ডিএনএ টেস্ট করার মতো কোনো সুদৃঢ় ও আইনগত ভিত্তি (Valid Foundation) তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে ডিএনএ টেস্ট করতে বাধ্য করা যাবে না।"
✅ রায়ের ফলাফল (স্টেপ-৬)
হাইকোর্ট তাঁর চূড়ান্ত রায়ে বলেন:
১. নিম্ন আদালতের দেওয়া ডিএনএ টেস্টের আদেশটি আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত হওয়ায় বাতিল করা হলো।
২. স্বামীর পক্ষে রুলটি চূড়ান্ত (Absolute) করা হলো।
৩. কোনো পক্ষকে মামলার খরচা বহন করতে হবে না।
বিচারপতি রায়ের শেষে বলেন: "I find substance in this rule." (অর্থাৎ, স্বামীর আবেদনটিতে আমি যথেষ্ট যুক্তি খুঁজে পেয়েছি।)
📢 এই রায় থেকে আমাদের শিক্ষণীয়:
১. ডিএনএ টেস্ট রুটিন বিষয় নয়: কথায় কথায় বা শুধু সন্দেহের বশে আদালত ডিএনএ টেস্টের আদেশ দিতে পারেন না। এটি একটি অসাধারণ (Extraordinary) পদক্ষেপ।
২. সহবাস মানেই বিয়ে নয়: কাবিননামা, কাজী এবং উপযুক্ত সাক্ষী ছাড়া শুধু একসাথে থাকার দাবিতে কাউকে স্বামী-স্ত্রী বা উত্তরাধিকারী দাবি করা যাবে না।
৩. আইনি ভিত্তি জরুরি: ডিএনএ টেস্টের আবেদন করার আগে দাবিদারকে অবশ্যই মামলার প্রাথমিক সত্যতা বা 'Strong Prima Facie Case' প্রমাণ করতে হবে।
⚖️ "Unless there be valid foundation for D.N.A. test, no one can compel to go for D.N.A. test."
— বাংলাদেশ হাইকোর্ট (Civil Revision No. 1115 of 2015)
লেখক:
© মোঃ করমুল্লাহ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট