15/05/2026
অ্যাডমিরালটি কেস একধরনের অভিজাত কেস হিসেবে পরিচিত। খুব অল্প সংখ্যক বিজ্ঞ আইনজীবী এই মামলার সাথে পরিচিত। লিটিগ্যান্টরা এটি সম্পর্কে খুব কম জানে। আজকে মো. শাহজাহান খান এবং অন্যান্য বনাম এম.টি. ফজল-এ-রাব্বি (M.T. FADL-E-RABBI) ও অন্যান্য মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত আইনি পর্যালোচনা করবো।
মামলার সারসংক্ষেপ ও আইনি বিশ্লেষণ:
১. মামলার প্রেক্ষাপট (Fact of the Case)
এই মামলার বাদীরা হলেন বাংলাদেশি নাগরিক, যারা পানামার পতাকাবাহী জাহাজ 'এমটি ফজল-এ-রাব্বি' (MT FADL-E-RABBI)-তে যথাক্রমে প্রধান প্রকৌশলী এবং ২য় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাদীরা তাদের নিয়োগকর্তা ও জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে সম্পাদিত 'স্ট্যান্ডার্ড সিফেয়ারার এমপ্লয়মেন্ট এগ্রিমেন্ট' অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করলেও দীর্ঘ সময় ধরে তাদের মাসিক মজুরি নিয়মিতভাবে পাননি। জাহাজে চাকরির মেয়াদ শেষ করে যখন তারা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি (Sign off) নেন, তখন তাদের বিপুল পরিমাণ মজুরি বকেয়া ছিল। মালিকপক্ষ বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা না করায় বাদীরা আদালতের শরণাপন্ন হন।
২. মামলা দায়ের (Filing of the Suit)
২০১৭ সালের ১৬ মার্চ বাদীরা হাইকোর্ট বিভাগের অ্যাডমিরালটি এখতিয়ারে এই মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার ধরন: এটি একইসাথে জাহাজটির বিরুদ্ধে বস্তুগত (In Rem) এবং মালিক ও পরিচালনাকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত (In Personam) মামলা।
দাবিকৃত অর্থ: বাদীরা বকেয়া মজুরি ও আইনি খরচসহ মোট ৪১,৯২১.০৭ মার্কিন ডলার (তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী ৩২,৯৪,৯৯৭ টাকা) দাবি করেন।
বিবাদী: জাহাজের নিবন্ধিত মালিক 'ইডেন লাইন লিমিটেড', ম্যানেজার 'পানাম শিপ ম্যানেজমেন্ট' এবং স্থানীয় এজেন্টসহ মোট ৫ জন প্রধান বিবাদী।
৩. আদালতের পর্যবেক্ষণ (Court’s Observation)
মামলাটি একতরফা (Ex-parte) শুনানির পর মাননীয় বিচারপতি জাফর আহমেদ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন:
রক্ষণীয়তা (Maintainability): আদালত জানান, 'অ্যাডমিরালটি কোর্ট অ্যাক্ট, ২০০০' এর ধারা ৩(২)(ন) অনুযায়ী নাবিকদের বকেয়া মজুরি আদায়ের মামলা অ্যাডমিরালটি কোর্টে সম্পূর্ণভাবে রক্ষণীয়।
প্রমাণক দলিল: আদালত নাবিকদের CDC (Continuous Discharge Certificate)-কে নিয়োগের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন। যেহেতু শিপিং মাস্টার এই দলিলে সিল ও স্বাক্ষর করেন, তাই এটি জাহাজে চাকরির অকাট্য দলিল।
মেরিটাইম লিয়েন (Maritime Lien): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, 'বাংলাদেশ মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩' এর ৪৭৭ ও ৪৭৯ ধারা অনুযায়ী, নাবিকদের মজুরির দাবি জাহাজের ওপর একটি অগ্রাধিকারমূলক অধিকার (Lien) তৈরি করে। এই অধিকার জাহাজের ওপর থাকা অন্য যেকোনো ঋণের চেয়ে আগে পরিশোধযোগ্য।
আইনি খরচ: আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, বাদীরা ৪,০০০ ডলার আইনি খরচ দাবি করলেও তা কোনো চুক্তি বা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, তাই এটি ডিক্রির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
৪. আদালতের রায় (Judgment)
আদালত সার্বিক তথ্য-প্রমাণ ও নথি পর্যালোচনার পর বাদীদের পক্ষে আংশিক রায় প্রদান করেন:
আসল দাবি মঞ্জুর: আদালত প্রকৃত বকেয়া মজুরি বাবদ ৩৭,৯২১.০৭ মার্কিন ডলার (২৯,৮০,৫৯৭ টাকা) প্রদানের নির্দেশ দেন।
সুদ প্রদান: ডিক্রির তারিখ থেকে শুরু করে অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত বার্ষিক ১০% হারে সুদ প্রদানের আদেশ দেওয়া হয়।
দায়বদ্ধতা: বিবাদী মালিকপক্ষ এবং জাহাজ পরিচালনাকারী এজেন্টরা যৌথ ও পৃথকভাবে এই অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য।
অর্থ প্রাপ্তির উৎস: যেহেতু জাহাজটি অন্য একটি মামলায় ইতিমধ্যে নিলামে বিক্রি হয়েছে, তাই আদালত নির্দেশ দেন যে সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকেও বাদীরা তাদের পাওনা সংগ্রহ করতে পারবেন।
এই রায়ের মাধ্যমে এটি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সমুদ্রগামী জাহাজে কর্মরত নাবিকদের অধিকার বাংলাদেশে অত্যন্ত সুরক্ষিত। জাহাজের মালিকপক্ষ দেউলিয়া হোক বা জাহাজ বিক্রি হয়ে যাক, নাবিকদের বকেয়া মজুরি 'মেরিটাইম লিয়েন' হিসেবে অন্য সব পাওনার ওপর অগ্রাধিকার পাবে।
অ্যাডভোকেট মো: মনিরুল ইসলাম মিয়া
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা
হেড অব চেম্বারস
Lexzone Law Chambers
Cell: 019841700461
Email: [email protected]
Website: Lexzonelawchambers.com..
# law.
Judgment date: 27.10.2025