12/07/2026
রিয়েল এস্টেট কোম্পানীকে টাকা দিয়েছেন আর কোম্পানী আবাসন নির্মান না করে ফেলে রেখেছে অথবা ডেভেলপার কোম্পানী আপনাকে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিচ্ছে না। এই সেক্টরে বিষয়গুলো খুবই কমন সমস্যা।অনেক সময় তো আপনার কিস্তির টাকাও ইচ্ছা করেই গ্রহণ করে না আর পরে আপনি কিস্তি পরিশোধ করছেন না বলে উল্টো মামলা ঠুকে দেয়। মানে চোরের মায়ের বড় গলা আর কি। আবার টাকা ফেরত দেবার কথা বলে একটা চেক ধরিয়ে দেয় যেটার একাউন্টে কোন টাকা থাকে না। আবার এটার জন্য চেক ডিজঅনার এর মামলা করতে হয়। মানে একটা বিরিছিরি অবস্থা আর কি। আবার ক্রিমিনাল মামলা হিসেবে প্রতারনা আর জালিয়াতির মামলা তো ফ্রি! এতে শুরুতে ফ্ল্যাট বা টাকা কোনটাই হাতে না আসলেও থানা-পুলিশ আর আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে ব্যায়ামটা ভালই হয়। ও আচ্ছা, একই ফ্ল্যাট/ জমি যেটা আপনার কাছে বিক্রি করেছে সেটা আবার অন্য বহুজনের কাছে বিক্রিও করে দেয়। উফ!
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর ১৫ ধারায় বলা আছে, চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেভেলপার রিয়েল এস্টেট বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে, ক্রেতাকে তার পরিশোধিত সম্পূর্ণ অর্থ এবং চুক্তিতে উল্লেখিত ক্ষতিপূরণ ৬ মাসের মধ্যে 'একাউন্ট পেয়ি' (account payee) চেকের মাধ্যমে ফেরত দিতে হবে। আর যদি চুক্তিতে ক্ষতিপূরণের হার উল্লেখ না থাকে, তবে পরিশোধিত অর্থের ওপর ১৫% হারে ক্ষতিপূরণ হিসাব করতে হবে। ডেভেলপার এই সম্পূর্ণ অর্থ অনধিক ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩টি কিস্তিতে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।
টাকা ফেরত চাওয়ার বিধান আছে ১৭ ধারায়। বলা আছে, ক্রেতা যদি কোনো কারণে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে তার বরাদ্দ বাতিল করে টাকা ফেরত নিতে চান, তবে ডেভেলপার আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে জমাকৃত অর্থের ১০% কেটে রাখবেন। অবশিষ্ট অর্থ ৩ মাসের মধ্যে এককালীন চেক বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ক্রেতাকে ফেরত প্রদান করতে হবে।
আর ২৭ ধারার বিধান তো সবাই-ই জানেন। ডেভেলপার যদি জমির মালিক বা ক্রেতার সাথে চুক্তি বা বরাদ্দপত্র সম্পাদন করার পরও কোনো কাজ না করেন, বা আংশিক কাজ করে বিনা কারণে ফেলে রাখেন এবং এর বিনিময়ে জমির মালিক বা ক্রেতাকে কোনো আর্থিক সুবিধা না দেন, তবে সেটি প্রতারণামূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে ডেভেলপার অনূর্ধ্ব ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
এছাড়া, ক্রেতার অজ্ঞাতে চুক্তিবদ্ধ রিয়েল এস্টেট অবৈধভাবে অন্যত্র বিক্রি করলে অনূর্ধ্ব ৩ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় শাস্তি হতে পারে।
ওহ, কোনো ডেভেলপার যদি নিজে জমি কিনে মালিক হয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে রিয়েল এস্টেট নির্মাণ করে, তবে তার ক্ষেত্রেও এই আইনের সকল বিধি-বিধান প্রযোজ্য হবে। এছাড়া, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি (যারা ডেভেলপার বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নন) যদি নিজেদের জমিতে ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রিয়েল এস্টেট নির্মাণ করেন, তবে তাঁদের ক্ষেত্রেও এই আইনের বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে।
অপরাধগুলোর বিচার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। আদালত চাইলে আদায়কৃত জরিমানার সর্বোচ্চ ৫০% ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক বা ক্রেতাকে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। এছাড়াও থানায় গিয়ে অথবা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে ৪২০/ প্রতারণার মামলা সহ অন্যান্য ক্রিমিনাল মামলা করার স্কোপ তো আছেই। আর নিষেধাজ্ঞার মামলা বা দেওয়ানী আদালতে মালিকানা দাবি থেকে শুরু করে ডিক্লারেশন মামলা সবই করা যাবে। (সোজাভাবে, ক্রিমিনাল মামলা করলে কোম্পানীকে জেলে নিয়ে যাবে। আর আপনার টাকা/ ক্ষতিপূরণ পেতে হলে বা ফ্ল্যাট বুঝে নেয়ার জন্য দেওয়ানী আদালতে বা বিশেষ আইন অনুযায়ী মামলা করতে হবে।)
'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩' নামে যে একটি নতুন আইন হয়েছে সেখানেও বলা হয়েছে, ভূমির নির্ধারিত সম্পূর্ণ মূল্য ক্রেতা কর্তৃক পরিশোধ করার পরও বিক্রেতা (বা ডেভেলপার) যদি যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া ক্রেতাকে উক্ত ভূমির দখল বুঝিয়ে না দেন (হস্তান্তর না করেন), তবে সেটি একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ডেভেলপার বা বিক্রেতা যদি অন্যের জমি নিজের বলে প্রচার করে, তথ্য গোপন করে কোনো প্রপার্টি হস্তান্তর করে, মিথ্যা বিবরণ দিয়ে দলিল সম্পাদন বা স্বাক্ষর করে তাহলে এই ধরনের প্রতারণামূলক অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ হবে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। এই আইনের অধীনে বিচার চলাকালে আদালতের কাছে যদি প্রমাণিত হয় যে অপরাধের কারণে ক্রেতা বা কোনো ব্যক্তি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তবে আদালত অপরাধীর কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেওয়ার আদেশ প্রদান করতে পারবেন। এছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আদালত উপযুক্ত ব্যক্তির অনুকূলে জমির দখল অর্পণেরও নির্দেশ দিতে পারবেন।
যাহোক, ক্রেতা চুক্তি ভঙ্গ করলে বা কিস্তি পরিশোধ না করলেও আইনে বিধান রয়েছে, সেগুলো আরেকদিন....
এসব ঝক্কি ঝামেলা যাতে পোহাতে না হয় সেজন্য কি করা যাবে?
সত্যি কথা হচ্ছে, আপনি যতই সতর্ক থাকুন না কেন, প্রতারণা শতভাগ এড়ানো অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তবে কিছু হোমওয়ার্ক করা থাকলে ক্ষতি কমানো যেতে পারে।
দেখুনঃ
ডেভেলপার কোম্পানিটি প্রকৃতপক্ষে নিবন্ধিত এবং সক্রিয় কিনা।
প্রকল্পের জমির প্রকৃত মালিক কে এবং ডেভেলপারের সেই জমির উপর বৈধ অধিকার আছে কিনা।
জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) হালনাগাদ আছে কিনা।
রাজউক, সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কিনা।
একই প্রকল্পে পূর্বে অন্য ক্রেতারা ফ্ল্যাট বা প্লট বুঝে পেয়েছেন কিনা এবং কোম্পানির অতীত রেকর্ড কেমন।
চুক্তিপত্রে হস্তান্তরের নির্দিষ্ট সময়, বিলম্বের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ এবং টাকা ফেরতের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভাল আইনজীবী আপনার চুক্তিটি লিখে দিতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানী থেকে চুক্তিপত্রটি দেয়া হতে শুধু স্বাক্ষর করার জন্য। এক্ষেত্রে আপনার আইনজীবীকে দিয়ে তা ভেটিং করিয়ে নিন।
সব ধরনের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধ করুন এবং প্রতিটি লেনদেনের রসিদ, ব্যাংক স্লিপ ও কাগজপত্র যত্নসহকারে সংরক্ষণ করুন।
সব লিখিতভাবে নিশ্চিত করুন।
ডেভেলপারের মিষ্টি কথার চেয়ে চুক্তিপত্রের একটি ধারা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হবে।
যেকোন আইনি পরামর্শের যোগাযোগ করুন
০১৭৬১-৮৫৫৪৫৩