25/05/2026
আইনজীবীর ভূমিকা নিয়ে সমাজে প্রায়ই একটি ভুল ধারণা দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, একজন আইনজীবী যদি বুঝতে পারেন তার মক্কেল অপরাধী, তাহলে তার পক্ষে দাঁড়ানোই অনৈতিক কিংবা বেআইনি। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো, “প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে ন্যায্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।” একজন আইনজীবীর দায়িত্ব অপরাধকে বৈধ প্রমাণ করা নয়; বরং নিশ্চিত করা যে বিচারটি আইন অনুযায়ী, নিরপেক্ষভাবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হচ্ছে।
বাংলাদেশে একজন আইনজীবী যদি জেনে-শুনে আদালতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেন, ভুয়া সাক্ষী দাঁড় করান, জাল নথি ব্যবহার করেন কিংবা আদালতকে বিভ্রান্ত করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের কাজ পেশাগত অসদাচরণ (professional misconduct) হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অধীনে শাস্তিযোগ্য। অর্থাৎ, আইনজীবী তার মক্কেলের পক্ষে লড়াই করতে পারেন, কিন্তু মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার কোনো বৈধতা নেই।
একজন আইনজীবী ও একজন বিচারকের ভূমিকা এক নয়। বিচারক সত্য নির্ধারণ করেন, আর আইনজীবী নিশ্চিত করেন যে তার মক্কেলের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যথাযথ আইনি সহায়তা না পেলে নির্দোষ ব্যক্তিও অন্যায়ভাবে দণ্ডিত হতে পারেন। তাই আইনজীবীর উপস্থিতি বিচার ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ।
ইসলামী বিচারব্যবস্থার কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে ন্যায়বিচার, সাক্ষ্যের সততা, মিথ্যা পরিহার এবং জুলুমের বিরোধিতা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছে। তবে ইসলামী আইনেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বিচারকের দায়িত্ব ছিল নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ মূল্যায়ন করা। সুতরাং ইসলামের মূল শিক্ষা হচ্ছে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, প্রতিশোধ বা আবেগ নয়।
ধর্ষণ, হত্যা ও নৃশংস অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক দুর্বলতা, সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট, মাদকের বিস্তার, বিকৃত অনলাইন কনটেন্ট এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারসহ বহু কারণ কাজ করতে পারে। তবে কোনো অপরাধের দায় পুরো রাজনৈতিক দল, মতবাদ বা গোষ্ঠীর ওপর প্রমাণ ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইনের শাসন মানে হলো, ব্যক্তি অপরাধ করলে ব্যক্তি দায় বহন করবে।
একইভাবে, প্রকাশ্যে শাস্তি কার্যকর করার বিষয়েও বিশ্বব্যাপী ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন এটি ভয় সৃষ্টি করে অপরাধ কমাতে পারে, আবার অনেকে মনে করেন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা প্রতিশোধমূলক নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক হওয়া উচিত। তাই এ ধরনের প্রশ্নে আবেগের পরিবর্তে গবেষণা, সংবিধান, মানবাধিকার এবং সমাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আজ সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো:
নৈতিক শিক্ষা,
দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার,
আইনের সমান প্রয়োগ,
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত,
এবং সমাজে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা।
কারণ বিচারহীনতা যেমন অপরাধ বাড়ায়, তেমনি আবেগপ্রসূত বিচারও রাষ্ট্রকে বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়, ন্যায়বিচারে।
Barrister Md Jakaria Habib
Advocate Bangladesh Supreme Court ✅