12/01/2026
চেক ডিজঅনার মামলার বিচার:
অভিযোগকারী ও আসামির প্রমাণের দায় (Burden of Proof)
চেকের “ড্রয়ার” কর্তৃক চেকে উল্লেখিত অর্থ পরিশোধের দায় মূলত একটি চুক্তিভিত্তিক দায়, যা প্রকৃতপক্ষে একটি দেওয়ানি দায় (civil liability)। তবে আইনপ্রণেতা একটি আইনগত কল্পনার (legal fiction) মাধ্যমে এই দেওয়ানি দায়কে অপরাধে রূপান্তর করেছেন। এই উদ্দেশ্যেই Negotiable Instruments Act, 1881-এ ধারা ১৩৮ সংযোজিত হয়, যা Negotiable Instruments (Amendment) Act, 1994 (Act No. XIX of 1994)-এর ধারা ২ দ্বারা প্রবর্তিত।
Negotiable Instruments Act, 1881-এর ধারা ১৪১ অনুযায়ী, ধারা ১৩৮/১৪০ এর অধীনে দায়েরকৃত প্রতিটি মামলা অবশ্যই complaint petition এর মাধ্যমে দায়ের করতে হয়। ফলস্বরূপ, Code of Criminal Procedure, 1898-এর Chapter XVI প্রযোজ্য হয় এবং ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত বিধান অনুযায়ী অভিযোগপত্র নিষ্পত্তি করেন। পরবর্তীতে মামলা বিচারযোগ্য হলে, Negotiable Instruments Act, 1881-এর ধারা ১৪১(c) অনুসারে তা বিচার পরিচালনার জন্য Sessions Court-এ স্থানান্তরিত হয়। বিচারিক আদালত তখন CrPC Chapter XXIII (Sections 265A থেকে 265L) অনুযায়ী বিচার পরিচালনা করে।
Negotiable Instruments Act, 1881-এর ধারা ১৩৮ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, এই ধারা প্রণয়নের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হলো চেক নামক একটি negotiable instrument-এর ক্ষেত্রে strict liability আরোপ করা।
ধারা ১৩৮/১৪০ এর অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচার অন্যান্য সাধারণ ফৌজদারি মামলার বিচার থেকে ভিন্ন।
Sheikh Mashuk Rahman vs. State and another, 62 DLR (2010) 28 মামলায় মাননীয় হাইকোর্ট ডিভিশন রায় দিয়েছেন যে, ফৌজদারি আইনের কিছু মৌলিক নীতি যেমন mens rea এবং presumption of innocence ধারা ১৩৮/১৪০ এর অধীনে দায়েরকৃত অভিযোগভিত্তিক বিচারে প্রযোজ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, এই ধরনের মামলায় প্রসিকিউশনকে mens rea প্রমাণ করতে হয় না এবং আসামিও presumption of innocence-এর সুবিধা পাওয়ার অধিকারী নন।
এছাড়াও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, Negotiable Instruments Act, 1881-এর ধারা ১১৮ negotiable instrument সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রমাণ বিধান নির্ধারণ করেছে। এটি একটি আইনগত অনুমান (presumption of law), যার অধীনে আদালত ধরে নেবে যে—
negotiable instrument বা endorsement বৈধ বিবেচনায় (consideration) ইস্যু বা অনুমোদিত হয়েছে, এবং
negotiable instrument-এর ধারক একজন holder in due course।
ফলে, প্রসিকিউশন বা অভিযোগকারীকে প্রাথমিকভাবে কেবল নিম্নোক্ত বিষয়গুলো প্রমাণ করলেই যথেষ্ট—
সংশ্লিষ্ট চেকের ডিজঅনার হওয়া, এবং ধারা ১৩৮-এ বর্ণিত প্রক্রিয়াগত শর্তসমূহ পূরণ করা হয়েছে কি না, যেমন:
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চেক উপস্থাপন,
ব্যাংক কর্তৃক চেক ডিজঅনার,
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনি নোটিশ প্রদান,
নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মামলা দায়ের।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আসামি বা ডিফেন্সের পক্ষে প্রসিকিউশনের মামলা খণ্ডানোর কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ Md. Abul Kaher Shahin v. Emran Rashid and another, 14 SCOB [2020] AD 96 মামলায় ধারা ১৩৮/১৪০ এর মামলায় প্রসিকিউশন ও আসামি উভয়ের জন্য প্রযোজ্য প্রমাণের মানদণ্ড (standard of proof) নির্ধারণ করেছেন।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ধারা ১৩৮-এ ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ—
“without prejudice to any other provisions of this Act”
স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে ধারা ১৩৮ কোনো বিচ্ছিন্ন বিধান নয়। এই ধারার অধীনে মামলা নিষ্পত্তির সময় আইনের অন্যান্য বিধান বাদ দেওয়া হয়নি। ফলে আসামি ধারা ৪৩, ৮৭ সহ আইনের অন্যান্য বিধানে প্রদত্ত প্রতিরক্ষা গ্রহণের পূর্ণ সুযোগ পান।
বিচারিক আদালতের কর্তব্য হলো আসামিকে পর্যাপ্ত সুযোগ প্রদান করা, যাতে তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে—
চেকটি অপরাধমূলক বা প্রতারণামূলক উপায়ে গ্রহণ করা হয়েছে, অথবা
চেকটি অবৈধ বিবেচনায় (unlawful consideration) বা বিনা বিবেচনায় ইস্যু করা হয়েছে।
এভাবে আসামি ধারা ১১৮-এর অধীনে সৃষ্ট অনুমান খণ্ডানোর জন্য একটি probable defense উপস্থাপন করতে পারেন।
তবে, চেকটি বিনা বিবেচনায় বা অবৈধ বিবেচনায় ইস্যু হয়েছে—এটি প্রমাণ করার দায় আসামির ওপরই বর্তায়, এবং আসামিকে সেই দায় পালন করতে হয়। প্রশ্ন হলো, এই দায় কীভাবে পালন করা যাবে?
আইনগত অনুমান খণ্ডানোর জন্য আসামিকে তার প্রতিরক্ষা beyond reasonable doubt প্রমাণ করতে হয় না, যেমনটি প্রসিকিউশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। কিন্তু কেবল বিবেচনা অস্বীকার করলেই চলবে না। এমন কিছু সম্ভাব্য ও বিশ্বাসযোগ্য উপাদান আদালতের সামনে আনতে হবে, যার ফলে প্রমাণের দায় পুনরায় অভিযোগকারীর ওপর স্থানান্তরিত হয়।
একবার আসামি প্রমাণ করতে পারলে যে চেকটি বিনা বিবেচনায় বা অবৈধ বিবেচনায় ইস্যু হয়েছে, তখন প্রমাণের দায় আবার অভিযোগকারীর ওপর বর্তায়। তখন অভিযোগকারীকে দলিল বা মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে চেকটির বৈধ বিবেচনা প্রমাণ করতে হয়।
সারসংক্ষেপে বলা যায়—
প্রথম পর্যায়ে প্রসিকিউশন বা অভিযোগকারীকে কেবল চেক ডিজঅনার এবং ধারা ১৩৮-এ বর্ণিত প্রক্রিয়াগত শর্ত পূরণ প্রমাণ করতে হয়।
কিন্তু আসামি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে চেকটি বিনা বিবেচনায় বা অবৈধ বিবেচনায় ইস্যু হয়েছে, তাহলে প্রমাণের দায় অভিযোগকারীর ওপর স্থানান্তরিত হয়। অভিযোগকারী যদি তখন বিবেচনা প্রমাণে ব্যর্থ হন, তবে প্রসিকিউশনের মামলা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
এক্ষেত্রে আদালতের দায়িত্ব হলো একটি fair trial নিশ্চিত করা এবং উভয় পক্ষকে তাদের মামলা উপস্থাপনের জন্য যৌক্তিক ও সমান সুযোগ প্রদান করা।