03/05/2026
অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ (৪০৬) বনাম প্রতারণা (৪২০): বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা
কখনো কখনো আদালতে বাদীর উকিল সাহেবরা বলেন, “আসামি বাদীকে সৌদি আরবের ভিসা দিবে বলেছিল, বাদী আসামির সেই কথা বিশ্বাস করে আসামিকে টাকা দিয়েছিল, আসামি কথা রাখেনি, ভিসা দেয়নি, আসামি বাদীর সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করে বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধ করেছে, এভাবেই ৪০৬ ধারার জামিন অযোগ্য অপরাধ হয়ে গেছে, ফলে আসামি আইনত জামিন পেতে পারে না।”
কিন্তু বাদীর এই বিশ্বাস সেই বিশ্বাস নয়, এই বিশ্বাস ভঙ্গ সেই বিশ্বাস ভঙ্গ নয়, যা পেনাল কোডের ৪০৬ ধারায় শাস্তিযোগ্য। পেনাল কোডের ৪০৬ ধারায় ‘অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ’ নামে একটি অপরাধ আছে, যে অপরাধের সংজ্ঞা ৪০৫ ধারায় প্রদান করা হয়েছে। সমগোত্রীয় আরেকটি অপরাধ হলো—প্রতারণা, যা ৪২০ ধারায় শাস্তিযোগ্য।
৪২০ ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য কিন্তু ৪০৬ ধারার অপরাধ জামিন অযোগ্য। ৪২০ ধারায় মামলা হলে আসামির আসা মাত্র জামিন হয়ে যাবে কিন্তু ৪০৬ ধারায় মামলা হলে জামিন নাই; তাই ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে টাকা-পয়সার লেনদেন বিষয়ে মামলা দায়ের করার সময় মামলার আরজিতে ‘ধারা: ৪০৬/৪২০’ লিখে আনা হয়, লাগাও উভয় ধারা, ব্যাটা যেন বাদীর টাকা না দিয়ে জামিনে যেতে না পারে।
৪০৬ ধারার অপরাধের প্রাণ হলো—জিম্মাদারিত্ব; এই অপরাধের ইংরেজি নাম হলো Criminal Breach of Trust, এর বাংলা ‘অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ’ না করে ‘অপরাধজনক জিম্মাদারিত্ব ভঙ্গ’ করলে ভালো হতো, তাহলে অনেক বিভ্রান্তি এড়ানো যেত। যখন কোনো অর্থ বা সম্পত্তি আসামিকে ভোগ করতে দেয়া হয় না; জমা রাখতে, বহন করতে, মেরামত করতে, পাহারা দিতে ইত্যাদি উদ্দেশ্যে দেয়া হয়; তখন তা আসামি নিজে খেয়ে ফেললে বা ভোগ করে ফেললে বা অন্য কাউকে খেয়ে ফেলতে দিলে ৪০৬ ধারার অপরাধ হয়। সংক্ষেপে বলা যায়—যখন বেড়ায় খেত খেয়ে ফেলে তখন এই অপরাধ হয়।
অন্যদিকে, ৪২০ ধারার প্রাণ হলো—প্রতারণা, এই কারণে সমাজে প্রতারক শ্রেণির মানুষকে ‘ফোর টুয়েন্টি’ বলে ডাকা হয়, বলা হয় “সে একটা ৪২০”। যখন কোনো কিছুর বিনিময়ে Consideration হিসেবে কোনো টাকা বা সম্পত্তি দেয়া হয়, তখন তা আসামিকে ভোগ করার জন্যই দেয়া হয়, তা আসামি খেয়ে ফেললে আত্মসাতের বা অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধ হয় না, তবে তা লিখিত বা মৌখিক চুক্তি ভঙ্গের ঘটনা হতে পারে, যেমন:
ভিসার জন্য কোনো প্রবাসী বা আদম ব্যবসায়ীকে টাকা দেয়া,
কাজের জন্য শ্রমিক বা শ্রমিকের মাঝিকে টাকা দেয়া,
সম্পত্তির বিনিময় হিসেবে অন্য কোনো সম্পত্তি বা টাকা দেয়া,
বিক্রেতাকে মালের জন্য টাকা দেয়া,
ক্রেতাকে বাকিতে মাল দেয়া ইত্যাদি।
এখানে আসামিকে যা দেয়া হয়েছে তা তাকে খাওয়ার জন্যই দেয়া হয়েছে, আমানত হিসেবে নয়, হেফাজতে রেখে তা ফেরত দেয়ার জন্য নয়, তা সে খেয়ে ফেললে অপরাধ হয় না। এমনকি, ফেরত দেয়ার শর্তে কোনো টাকা বা ভোগ্যপণ্য ধার দিলেও তা খাওয়ার জন্যই দেয়া হয়, পরে সেই মানের সেই পরিমাণ টাকা বা খাদ্য ফেরত দেয়া হবে—এমন শর্ত থাকে, তা খেয়ে ফেললে কোনো অপরাধই হয় না, কারণ খাওয়ার জন্যই তো দেয়া-নেয়া হয়েছিল;
যেমন—গ্রামের মহিলারা রান্না করতে গিয়ে তেল, নুন, চাল, ডাল ইত্যাদিতে কমতি পড়লে পাশের বাড়ির মহিলা থেকে ধার নেয়। যে শর্তে সেই খাওয়ার বা ভোগ করার বা ব্যবহার করার সেই জিনিসটি দেয়া হলো, সে শর্ত পূরণ না করলে প্রতারণা করে সেই মাল গ্রহণ করা হয়েছে কি না সে প্রশ্ন আসতে পারে, প্রতারণার ঘটনা ঘটলেই শুধু ৪২০ ধারার অপরাধ হতে পারে।
প্রতারণা করে টাকা বা মাল আসামি নিয়েছিল কি না, তা আসামির ইনটেনশন বা মানসিকতা থেকে বুঝা যায়, এটাকে আইনের ভাষায় Initial intention of deception বলা হয়; ৪২০ ধারার অপরাধ হতে হলে ঘটনা বা লেনদেনের শুরু থেকেই আসামির সেই অসৎ মানসিকতা থাকতে হবে [46 DLR AD 180]।
এখন ইনটেনশন তো থাকে আসামির বুকের ভিতর—মনে, না কি মাথায়! মন মহাশয় কোথায় বাস করেন? আসামির মনে বা মাথার ভিতরে কী আছে বা ছিল তা কেমনে দেখা যাবে!! তা কিন্তু দেখতে পাওয়া যায়! আশ্চর্য! কেমনে!! তা ঘটনার সার্বিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আসামির সামগ্রিক আচরণে (Surrounding circumstances and subsequent conduct of the accused) ফুটে উঠে [48 DLR AD 100]; যেমন—
আগামীকাল বাড়ির আমগাছে থাকা মধুর বাসা ভেঙে একদম খাঁটি মধু দেব বলে টাকা নেয়া কিন্তু সেই মধু আর না দেয়া, এমনকি দেখা গেল তার বাড়ির আমগাছে কোনো মধুর বাসাই নাই বা সব মধু টাকা নেয়ার আগের দিন অন্য লোককে বিক্রি করে দিয়েছিল;
কাল ফেরত দেব বলে টাকা ধার নিয়ে পরে অস্বীকার করা ও টাকা চাইলে মাইর খাবি বলে হুমকি দেয়া;
ভিসা দেব বলে টাকা নেয়া ও ভিসা দেয়ার কোনো চেষ্টাই না করা বা ভিসা দেয়ার মতো কোনো উপায় তার নাই জেনেও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা নেয়া;
মাল বিক্রি করে দাম দেব বলে পাইকার থেকে মাল নিয়ে খুচরা বিক্রি শেষ করেও পাইকারের পাওনা না দেয়া ও কোনো যোগাযোগ না করা;
জমি বিক্রি করব বলে বায়না করে টাকা নেয়া ও সেই জমি গোপনে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া বা সে জমি আগেই অন্যত্র বিক্রির পর বায়না করা ইত্যাদি।
ঘটনায় ফোর টুয়েন্টি টাইপের লোকের মনের বা মাথার ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা চিটারকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
কিছু লেনদেন থাকতে পারে যেখানে বাদী আসামির নিকট টাকা পাওনা হলেও আসামির মোটেও কোনো অপরাধ বা ফৌজদারি দায় থাকে না, তবে দেওয়ানি দায় থাকতে পারে, এগুলোকে ব্যবসায়িক লেনদেন বা দেওয়ানি প্রকৃতির দায় বলা হয়, সে টাকা দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় আদায়যোগ্য হয়, যেমন:
দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ব্যবসায়িক একাধিক লেনদেনের পর হিসাব শেষে যদি আরও কিছু টাকা পাওনা থেকে যায়, তা দিতে না পারলে ও কোনো তথ্য গোপন বা প্রতারণার উপাদান না থাকলে কোনো অপরাধ হয় না [42 DLR AD 240, 19 BLD AD 128];
ব্যবসায়িক পাওনা আংশিক পরিশোধ করার পর বাকি টাকা আসামির আর্থিক অসঙ্গতির জন্য দিতে ব্যর্থ হলে অপরাধ হয় না, তা একটি দেওয়ানি প্রকৃতির দায় ও দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় প্রতিকারযোগ্য; কিন্তু সেই Part payment-ই যদি হয় প্রতারণার হাতিয়ার, তা দিয়েই যদি বাকি টাকা না দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে মাল সরবরাহ করার জন্য বাদীকে প্ররোচিত করা হয়, তাহলে ৪২০ এর অপরাধ হয় [46 DLR AD 180];
আসামি বাদীর পাওনা পরিশোধে আন্তরিক, কিছু দিয়েছে ও দিচ্ছে, বাকিটা দেবে দেবে বলছে ও সময় চাচ্ছে, কোনো তথ্য গোপন করছে না, বাদীকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে না, তখন প্রতারণার উপাদান থাকে না ও কোনো অপরাধ হয় না [50 DLR AD 163, 49 DLR AD 132] ইত্যাদি।
খুব খুব কম ঘটনা আছে, যেটাতে এই দুই ধারার অপরাধ একত্রে হতে পারে, যেমন: কেউ বিদেশ থেকে দেশে আসতেছে; আসার সময় অন্য প্রবাসীরা তাদের পরিবারকে এনে দেয়ার জন্য সেই লোককে কিছু খেজুর, মোবাইল, নগদ টাকা ইত্যাদি দিবে; এইসব জিনিস দেশে এসে ঠিকমতো বুঝিয়ে না দিয়ে খেয়ে ফেললে ৪০৬ ধারায় আত্মসাতের অপরাধ হয়; আরেক প্রবাসী তার বাড়িতে পাঠানোর জন্য কোনো জিনিস দিতে আসেনি, তবুও সে দেশে আসা লোক তার কাছে গিয়ে “তোমার বাড়ির জন্য এটা দাও, সেটা দাও” বলে খুঁজে নিয়ে আসলো এবং সব মেরে দিল!! এই খুঁজে আনা জিনিসের ক্ষেত্রে ৪২০ ও ৪০৬ উভয় ধারার অপরাধ একত্রে হয়েছে;
প্রথমত: সে মেরে দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে মানুষকে দেশের বাড়ির জন্য কিছু জিনিস তাকে দিতে প্ররোচিত করে চিটিং করেছে, দ্বিতীয়ত: সেসব জিনিস এনে তার বাড়িতে বুঝিয়ে না দিয়ে খেয়ে ফেলে ৪০৬ ধারায় আত্মসাতের অপরাধ করেছে। তবুও এই রকম নগদ টাকা খরচ করে ফেলে পরে নিজের টাকা এনে দিয়ে দিলে অপরাধ হবে না, কিন্তু খেজুর-মোবাইল ইত্যাদি হুবহু আসলটা অসৎ উদ্দেশ্যে অবৈধ লাভের জন্য বদল করে ফেললেও আত্মসাতের অপরাধ হবে।
৪০৬/৪২০ ধারার অপপ্রয়োগ অহরহ হতে দেখা যায়। অতিরিক্ত জেলা জজ হওয়ার পর ফৌজদারি আপিল-রিভিশনে দেখলাম—এমন কিছু ৪০৬/৪২০ ধারার মামলা হয়েছে, আসামির অনেক দিন জামিন হয়নি, এমনকি সাজা হয়ে গেছে!! যেখানে আসলে কোনো অপরাধই হয়নি বা ৪২০ ধারার অপরাধ হয়েছে কিন্তু ৪০৬ ধারা অন্যায়ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুইটি অপরাধের মর্মার্থ ও পার্থক্য বুঝার ও সঠিকভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদালত পাড়ায় কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে পাওনা টাকা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে এই দুইটি ধারাকে একত্রে বুঝে-শুনে অপপ্রয়োগের আবেদন জানানো হয়, কোনো কোনো আদালত সেই আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে থাকেন, উদ্দেশ্য অনেকটা সৎ ও পাওনা টাকা আদায় করে দেয়া, কিন্তু পাওনা টাকা আদায়ের অন্য আইনগত উপায় রয়েছে, পাওনা টাকা আদায়ের জন্য ৪০৬/৪২০ ধারাকে অপপ্রয়োগ করা আইনকে ইচ্ছাকৃতভাবে না মানার শামিল হয়ে যায়।
সর্বদা আইন মেনে চলতে হবে, বিশেষ করে আদালতকে। আইনকে লিখিত রূপ দেয়া হয়েছে এই জন্য যে—সবাই যেন তা এক রকমভাবে মেনে চলতে বাধ্য হয়, কেউ যেন কোনটা ন্যায় বা কোনটা অন্যায় তা নিজের খামখেয়ালের বশে ব্যাখ্যা করে যা ইচ্ছা তা করতে না পারে। প্রয়োজনে আইনকে বদলানো যেতে পারে, যেমন—পেশাদার চিটারদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য ৪২০ কে অজামিনযোগ্য করা যেতে পারে।
দেওয়ানি রোগে আক্রান্ত মক্কেল আসলেই টেনেটুনে বা মিথ্যা গল্প সাজিয়ে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দেয়ার একটা প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। স্বামী পরিত্যক্ত অসহায় মহিলা আদালতে এসেছেন, তার আশা নিজের ও সন্তানের মোহরানা ও ভরণপোষণ পাওয়া, কিন্তু মিথ্যা ও কল্পনার রং মেখে দায়ের করে দেয়া হলো—যৌতুকের মামলা! সাথে একটি নারী-শিশু নির্যাতনের মামলা! সাথে স্বামীর বৃদ্ধ মা-বাবা ও দূরে স্বামী গৃহে বসবাসরত ননদ-ননাসও আসামি! সবাইকে জেল খাটিয়ে তছনছ। রেগে গিয়ে স্বামী দিল বাদীকে তালাক!! অনেক বছর পর বিচারে দেখা গেল—যৌতুকের কোনো ব্যাপার ছিল না, অন্য কারণে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল, মামলা খারিজ!!! তখনো ভরণপোষণ ও মোহরানা আদায়ের জন্য পারিবারিক মামলা করা হয়নি। ভরণপোষণের দাবিও তামাদি হয়ে যায়, শেষ, সব শেষ।
বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা দেনা-পাওনার ঘটনায় দায়েরকৃত আইনত অচল ফৌজদারি মামলা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে দেন। বিজ্ঞ আইনজীবী ও বিজ্ঞ আদালত উভয়ের সৎ উদ্দেশ্য ও আশা: এতে আসামি বাদীর পাওনা দিয়ে দিবে। এতে বরং বাদীর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, কারণ এমন অচল মামলা শেষ পর্যন্ত টিকবে না, অনেক বছর পর উচ্চ আদালতে গিয়ে খারিজ হয়ে যাবে, তত দিনে বাদীর দম ও টাকা আদায়ের তামাদির মেয়াদ শেষ! তাই শুরুতে আপাত নিষ্ঠুর দেখালেও আইনত অচল মামলা ফাইলিং-এর সময় খারিজ করে দেয়া ও বাদীকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া উত্তম, যেন আইনত অচল ফৌজদারি মামলা চালাতে চালাতে বাদীর দম ও পাওনা আদায়ের তামাদির মেয়াদ ফুরিয়ে না যায়।
Credit: LawyersClubBangladesh.Com
Source: https://lawyersclubbangladesh.com/2026/05/03/difference-between-section-406-and-420-penal-code/?fbclid=IwY2xjawRj8T5leHRuA2FlbQIxMABzcnRjBmFwcF9pZBAyMjIwMzkxNzg4MjAwODkyAAEeulG8nKFEeO2wxIZu83kaKvZiVaeNpv7mssx-JIzMbefrk6IURYkpHK2HjFg_aem_4OPXjAqh35i088VQ2D5ibA
Disclaimer: The shared content is the sole property and thought of the Author of the piece of writing and the published platform (referred to as source link). The SSLA team or any of its members does not agree, disagree, support or stand against the content and thoughts of the Author. The SSLA team always tries its best to share updates on laws, the latest information and current affairs going around for its audience from reasonably trusted sources. The SSLA and its Team can not be held accountable for the contents which is not directly authored by the SSLA and shared from other sources.