23/05/2026
স্বামী বা স্ত্রী তালাক যেই দিক না কেন, আইনানুসারে নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক।
..................................এবং.................................
যেখানে স্ত্রী নিজেই স্বামীকে তালাক দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছেন, সেখানে জোরপূর্বক তাকে স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া বা দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের রায় কার্যকর করা আইনত ভুল এবং বলবৎ অযোগ্য।
Reference:
DLR 51 (HD) 512.
BLD 20 (HD) 159.
MLR 5 (HD) 81.
মামলার পটভূমি:
বিবাহ ও বিচ্ছেদ: ১৯৭৮ সালের ১ অক্টোবর শেরইন আক্তার (আবেদনকারী বা স্ত্রী) এবং মোঃ ইসমাইল (বিবাদী বা স্বামী) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল ৩৫,০০০ টাকা। পরবর্তীতে দাম্পত্য কলহের জেরে ১৯৯১ সালের ৫ জানুয়ারি স্ত্রী তার অর্পিত তালাকের অধিকার (তালাক-ই-তৌফিজ) প্রয়োগ করে স্বামীকে তালাক দেন।
নোটিশ সংক্রান্ত জটিলতা:
তালাকের নোটিশটি যেখানে বিবাহ রেজিস্ট্রি হয়েছিল অর্থাৎ কুমিল্লার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু স্ত্রী তা না করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠান এবং একটি অনুলিপি (কপি) স্বামীকে দেন। স্বামী ওই সময় ঢাকার তেজকুনিপাড়ায় থাকতেন।
নিম্ন আদালতের রায়:
স্বামী (মোঃ ইসমাইল) ১৯৯১ সালে ফ্যামিলি কোর্টে এই তালাককে অবৈধ দাবি করে এবং দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করেন। ফ্যামিলি কোর্ট এবং পরবর্তীতে অধস্তন জজ আদালত (Subordinate Judge) উভয় আদালতই স্বামীর পক্ষে রায় দেন। নিম্ন আদালতগুলোর যুক্তি ছিল— নোটিশ সঠিক জায়গায় (কুমিল্লার ইউনিয়ন পরিষদে) পাঠানো হয়নি, তাই তালাকটি বৈধ হয়নি এবং স্বামী দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের অধিকারী।
হাইকোর্ট বিভাগের আইনি পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত:
অধস্তন আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে স্ত্রী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই চূড়ান্ত রায় দেন, যেখানে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের প্রধান আইনি সিদ্ধান্তগুলো নিম্নরূপ:-
ক. নোটিশের মূল উদ্দেশ্য এবং গ্রহণযোগ্যতা
মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭(১) ও ৮ ধারা অনুযায়ী, স্ত্রী তালাক দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে এই মামলার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট 'নেলী জামান বনাম গিয়াসউদ্দিন' মামলার নজির টেনে বলেন:
নোটিশ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বামী যেন জানতে পারেন যে তার স্ত্রী তালাকের অধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং প্রয়োজনে যেন সালিশি কাউন্সিল গঠন করে আপিল বা মীমাংসার চেষ্টা করা যায়।
যেহেতু স্বামী নোটিশের অনুলিপি পেয়েছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে জানতেন যে স্ত্রী তাকে তালাক দিয়েছেন, তাই নোটিশ প্রেরণে সামান্য প্রশাসনিক ত্রুটি (কুমিল্লার বদলে ঢাকায় পাঠানো) থাকলেও তালাকটি অকার্যকর হয়ে যায় না। সাব-সেকশন (১) এর মূল উদ্দেশ্য এখানে বাস্তবায়িত হয়েছে।
খ. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে
হাইকোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক ও মানবিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন:
"যেখানে স্ত্রী নিজেই স্বামীকে তালাক দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছেন, সেখানে জোরপূর্বক তাকে স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া বা দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের রায় কার্যকর করা আইনত ভুল এবং বলবৎ অযোগ্য।"
আদালত উল্লেখ করেন যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে স্বামীর সাথে সংসার করতে বাধ্য করা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ এবং ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
চূড়ান্ত ফলাফল:
তালাক বৈধ:
হাইকোর্ট ঘোষণা করেন যে, আবেদনকারী (স্ত্রী) কর্তৃক প্রদত্ত তালাক-ই-তৌফিজ সম্পূর্ণ বৈধ এবং কার্যকর হয়েছে।
মামলা খারিজ:
নিম্ন আদালতের দেওয়া "দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার"-এর ডিক্রিটি বাতিল করা হয় এবং স্বামীর দায়ের করা মূল পারিবারিক মামলাটি পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়া হয়।