07/06/2026
পাশের জমি দখল প্রতিদিনের ঘটনা। দখল ও বেদখলের ঘটনা নিয়ে যত মামলা। একই দাগের বা জোতের জমি হলে বাটোয়ারা (বণ্টন) মামলা ছাড়া বুঝি সুনির্দিষ্ট দখল উদ্ধার করা সম্ভব নয়! এই আইনি জটিলতার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় সহ-শরিকরা প্রবাসীদের বা দুর্বল পক্ষের চিহ্নিত জমি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সম্প্রতি একটি রায় প্রদান করেছেন।
বুলবুল আহমেদ বনাম মোঃ আলী হোসেন এবং অন্যান্য মামলার রায় আজ আলোচনা করবো। আইনের শিক্ষার্থী, গবেষণা, আইনজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের জানার সুবিধার্থে আলোচনা করবো।
♈রায়ের তারিখ: ২৬/০২/২০২৬
♈মাননীয় বিচারপতি মোঃ রিয়াজ উদ্দিন খান
✅মামলার ঘটনা (Fact of the Case): মামলার মূল সম্পত্তিসহ মোট ৯১ শতাংশ জমির আদি স্বত্বাধিকারী ছিলেন ৩ নং বিবাদী শামসী আরা বেগম, যা তিনি ২৯/০৬/১৯৯৭ তারিখে একটি বিনিময় দলিলের (দলিল নং ৫৫৬৭) মাধ্যমে প্রাপ্ত হন।
🔴৩ নং বিবাদী, শামসী আরা বেগম পরবর্তীতে ১৮/০২/২০০২ তারিখে একটি রেজিস্ট্রি বিনিময় দলিলের (দলিল নং ১৬৩২) মাধ্যমে বাদী, মোঃ আলী হোসেনের কাছে ১টি দ্বিতল ভবনসহ ১০ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন এবং দখল বুঝিয়ে দেন। বাদী, মোঃ আলী হোসেন (যিনি একজন প্রবাসী) উক্ত জমিতে আধাপাকা ঘর নির্মাণ ও সীমানা প্রাচীর দিয়ে শান্তিপূৰ্ণভাবে ভোগদখল করতে থাকেন।
🔴৩ নং বিবাদী, শামসী আরা বেগম ২৯/০৬/২০০২ তারিখে ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিনকে ৬ শতাংশ জমি হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে দান করেন। উক্ত ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিন আবার ১৮/০৭/২০০৬ তারিখে দক্ষিণ দিক থেকে ৪ শতাংশ জমি ১ নং বিবাদী, বাবুল আহমেদের কাছে বিক্রি করেন। বাদী, মোঃ আলী হোসেনের জমি এবং ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদের ক্রয়কৃত জমির মাঝে ২ শতাংশ জমি অবশিষ্ট ছিল।
✅মামলার কারণ (Cause of Action): বাদী, মোঃ আলী হোসেন প্রবাসে থাকা অবস্থায় ২০০৬ সালের জুলাই মাসে জানতে পারেন যে ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিন তাঁর দক্ষিণ সীমানা ঘেঁষে প্রাচীর নির্মাণ করে জমি দখল করেছেন। বাদী, মোঃ আলী হোসেন দেশে ফিরে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে নিজস্ব উদ্যোগে উক্ত অবৈধ প্রাচীরটি সরিয়ে ফেলেন।
🔴এর জের ধরে ০৫/০২/২০০৭ তারিখে ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদ, ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিনের সহায়তায় বাদী, মোঃ আলী হোসেনের সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দির ১০ শতাংশ জমির মধ্যে দক্ষিণ দিক থেকে ২ শতাংশ জমি জোরপূর্বক প্রাচীর নির্মাণ করে বেদখল করেন। এই ২ শতাংশ জমিই মামলার নালিশী সম্পত্তি।
✅মামলা দায়ের (Institution of the Suit): বাদী, মোঃ আলী হোসেন ২০০৭ সালে ময়মনসিংহের ভালুকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদ এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে "অন্যান্য শ্রেণী মামলা নং ১৩/২০০৭" দায়ের করেন। মামলাটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৮ ধারার অধীনে "স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল উদ্ধারের" প্রতিকার চেয়ে মূল্যনুপাতিক (ad valorem) কোর্ট ফি প্রদানপূর্বক দায়ের করা হয়।
✅বাদী পক্ষের মূল বক্তব্য/আরজি (Plaintiff’s Case): বাদী, মোঃ আলী হোসেন নালিশী জমির সুনির্দিষ্ট চতুর্দিকস্থ চৌহদ্দি (উত্তরে, পূর্বে, দক্ষিণে ও পশ্চিমে কে কে আছেন) আরজিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন.
🔴বাদী, মোঃ আলী হোসেনের দাবি, তিনি বৈধ দলিলের মাধ্যমে এবং বিবাদীদের দলিলের অনেক পূর্বে জমি ক্রয় করে সুনির্দিষ্ট দখলে ছিলেন এবং বিবাদীগণ তাঁকে বেআইনিভাবে ০৫/০২/২০০৭ তারিখে বেদখল করেছেন।
🔴বিবাদীর মূল জবাব/বক্তব্য (Defendant’s Case): ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদ লিখিত জবাবের মাধ্যমে দাবি করেন যে, তিনি ১৮/০৭/২০০৬ তারিখে ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিনের কাছ থেকে ৪ শতাংশ জমি কিনে ২৫.০৭.২০০৬ তারিখেই দখল নিয়েছেন। তিনি কোনো বেদখলের ঘটনা ঘটাননি।
🔴১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদের দাবি—বাদী, মোঃ আলী হোসেন এবং তিনি একই মূল বিক্রেতার কাছ থেকে জমি কেনায় তাঁরা সহ-শরিক, তাই বাটোয়ারা (বণ্টন) মামলা ছাড়া এই খাস দখল উদ্ধারের মামলা রক্ষণীয় নয়।
✅নিম্ন আদালতের (বিচারিক আদালত) রায়:
ভালুকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালত উভয় পক্ষের নথিপত্র এবং বাদী, মোঃ আলী হোসেনের পক্ষে ৩ জন সাক্ষী (PW) ও বিবাদী পক্ষের ৫ জন সাক্ষী (DW) পরীক্ষা করেন;
🔴আদালত নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাদী, মোঃ আলী হোসেনের পক্ষে স্বত্ব ও বেদখলের বিষয়টি প্রমাণিত পাওয়ায় ২৭/০৪/২০১১ তারিখে বাদীর অনুকূলে মামলাটি ডিক্রি ঘোষণা করেন।
🔴আপিল দায়ের ও আপিলের রায়৷ বিচারিক আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদ ময়মনসিংহের জেলা জজ আদালতে "অন্যান্য আপিল নং ১৭৫/২০১১" দায়ের করেন. পরবর্তীতে মামলাটি ২য় অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে শুনানির জন্য স্থানান্তরিত হয়।
✅আপিল আদালতের রায়:
২য় অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্বিবেচনা করে বিচারিক আদালতের রায়ে কোনো আইনগত ভুল না পাওয়ায় ১১/০৩/২০১৫ তারিখে আপিলটি খারিজ (Dismiss) করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
✅হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন দায়ের: নিম্ন আপিল আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে বিবাদী-পিটিশনার, বুলবুল আহমেদ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানী রিভিশন নং ১৩৮২/২০১৫ দায়ের করেন। আদালত প্রাথমিক শুনানিতে অধস্তন আদালতের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ ও পক্ষদ্বয়কে স্থিতাবস্থা (Status-quo) বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে রুল ইস্যু করেন।
✅রিভিশন শুনানিতে বিবাদী (পিটিশনার) পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য: বিজ্ঞ আইনজীবী মিঃ খায়ের এজাজ মাসুদ যুক্তি দেখান যে, অধস্তন আদালতসমূহ মৌখিক সাক্ষ্য এবং আরজির বিষয়বস্তু সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়ে আইনের ভুল করেছেন।
🔴স্বীকাৰ্যভাবেই যেহেতু উভয় পক্ষ একই জোতের সহ-শরিক, তাই বাটোয়ারা (Partition) মামলা ছাড়া শুধু দখল উদ্ধারের মামলা আইনের দৃষ্টিতে রক্ষণীয় নয়. (সমর্থনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি অপ্রকাশিত সিদ্ধান্ত—‘নোয়াব আলী বেপারী বনাম হাচানেরজামান’ মামলার নজির উল্লেখ করেন)।
🔴তিনি দাবি করেন, ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদ ২০০৬ সাল থেকেই দখলে আছেন এবং পৌরসভা কর ও ইউটিলিটি বিল দিচ্ছেন, তাই ২০০৭ সালের বেদখলের কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কাল্পনিক।
✅রিভিশন শুনানিতে বাদী (প্রতিপক্ষ) পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য: বিজ্ঞ আইনজীবী মিঃ মোঃ হামিদুর রহমান যুক্তি দেন যে, এটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারার অধীনে স্বত্বসহ দখল উদ্ধারের মামলা। বাদী, মোঃ আলী হোসেন সফলভাবে তাঁর পূর্ববর্তী স্বত্ব এবং সুনির্দিষ্ট সীমানা থেকে বেদখল হওয়ার তারিখ প্রমাণ করেছেন।
🔴সহ-শরিক হলেও, যদি কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট বাউন্ডারি দ্বারা চিহ্নিত সুনির্দিষ্ট দখলীয় অংশ থেকে বেদখল হন, তবে বাটোয়ারা মামলা ছাড়াই দখল উদ্ধারের মামলা রক্ষণীয়।
তিনি ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদের জেরা উল্লেখ করে দেখান যে, বিবাদী নিজেই স্বীকার করেছেন যে তাঁর বিক্রেতা ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিনের নালিশী জোতে বর্তমানে কোনো দখল নেই এবং বাদী, মোঃ আলী হোসেনের দখল সেখানে সুনির্দিষ্ট ছিল।
✅উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ (Court’s Observation):
মাননীয় বিচারপতি মোঃ রিয়াজ উদ্দিন খান মামলাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিম্নলিখিত আইনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন:
🔴আরজির ভাষা, সাক্ষ্য এবং কোর্ট ফি অনুযায়ী মামলাটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারার নয়, বরং ৮ ধারার অধীনে দায়েরকৃত একটি পূর্ণাঙ্গ স্বত্ব ঘোষণা ও দখল উদ্ধারের মামলা।
🔴সাধারণ নিয়মে সহ-শরিকদের মধ্যে বিরোধে বাটোয়ারা মামলা করতে হয়. কিন্তু প্রতিষ্ঠিত আইনি ব্যতিক্রম হলো—যদি কোনো সহ-শরিক একটি সুনির্দিষ্ট সীমানাবদ্ধ জমিতে শান্তিপূৰ্ণ দখলে থাকার পর অন্য কারও দ্বারা বেদখল হন, তবে তিনি বাটোয়ারা ছাড়াই সরাসরি ৮ ধারায় স্বত্ব ঘোষণা ও দখল উদ্ধারের মামলা করতে পারেন।
🔴বিবাদীর উল্লেখ করা নজিরটি এই মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কারণ সেখানে বাদীদের একচ্ছত্র দখল ছিল না (যৌথ গঠনমূলক দখল ছিল), যা বর্তমান মামলায় বাদী, মোঃ আলী হোসেনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও একচ্ছত্র প্রমাণিত।
🔴বাদী, মোঃ আলী হোসেনের দলিলটি বিবাদীদের দলিলের চেয়ে অগ্রবর্তী এবং ১ নং বিবাদী, বুলবুল আহমেদ বাদী, মোঃ আলী হোসেনের ১০ শতাংশ জমির স্বত্ব অস্বীকার করেননি. বিবাদী নিজেই জেরায় স্বীকার করেছেন যে ২ নং বিবাদী, সালাহ উদ্দিনের উক্ত জোতে কোনো দখল নেই। বিবাদীর অবস্থান পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর।
🔴বিচারিক আদালত এবং নিম্ন আপিল আদালত (যা তথ্যের চূড়ান্ত আদালত বা Final Court of Facts) উভয়ই সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অভিন্ন সিদ্ধান্ত (Concurrent Findings) দিয়েছেন. নথিতে সাক্ষ্যের কোনো মারাত্মক অপব্যাখ্যা বা আইনগত ভুল না থাকলে রিভিশনাল আদালতে এই সমসাময়িক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। বাদী, মোঃ আলী হোসেনের জবানবন্দিতে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেও তা মামলার মূল গুণাগুণকে প্রভাবিত করে না।
✅আদালতের চূড়ান্ত রায় (Final Judgment): মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ সামগ্রিক তথ্যাদি ও আইনি নীতি পর্যালোচনান্তে সিদ্ধান্ত নেন যে, অধস্তন আদালতসমূহের রায়ে কোনো আইনগত ত্রুটি নেই এবং এতে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো উপাদান বিদ্যমান নেই।
🔴বিবাদী-পিটিশনার, বুলবুল আহমেদের দায়েরকৃত দেওয়ানী রিভিশন মামলাটি খারিজ করা হলো / Rule is discharged.
🔴অধস্তন আদালতসমূহ কর্তৃক প্রদত্ত রায় ও ডিক্রি (বাদী, মোঃ আলী হোসেনের পক্ষে খাস দখল ও স্বত্ব) বহাল রইল।
যেকোনো মতামত, সংশোধনী, পরামর্শ প্রদান করতে পারেন। যাচাই-বাছাই পূর্বক সংশোধন করা হবে।
অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মিয়া
লেক্সজোন ল' চেম্বারস
(অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার ও লিগ্যাল কনসালটেন্টস)
ঠিকানা: রুম নং ৪০৮ এ, ৪র্থ তলা, বাংলাদেশ শিশু কল্যান পরিষদ ভবন, তোপখানা, ঢাকা (মেট্রোরেল সচিবালয় স্টেশন এর উত্তর পাশে)।
মোবাইল: 01841700461, 01724700461
Email: [email protected]
www.Lexzonelawchambers.com
#আইনি_পরামর্শ
©2026Adv Adv Monirul Islam Miah
#আইনি_পরামর্শ,
ালত, ,