03/10/2026
পুলিশ ভেরিফিকেশন কথা বলে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যায় না, পুলিশ ভেরিফিকেশন অখণ্ড দলিল নয়’—পিএসসির সুপারিশের ৩ বছর পর রায়,পিটিশনারকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে 'ব্যক্তিগত কর্মকর্তা' (Personal Officer) পদে নিয়োগপত্র ইস্যু করার স্পষ্ট নির্দেশ। চাকরিপ্রার্থীদের পক্ষে হাইকোর্টের যুগান্তকারী আদেশ!। হাইকোর্ট বিভাগে নিষ্পত্তি হওয়া মুজাহিদুল ইসলাম আরিফ বনাম বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যান্য মামলার রায় আইনের শিক্ষার্থী, গবেষণা, আইনজীবী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও সাধারণ নাগরিকদের জানার সুবিধার্থে আলোচনা করবো।
🔴রায় প্রদানের তারিখ: ০২/১১/২০২২
🔴 বিচারপতি কাশেফা হোসেন (Kashefa Hussain, J.)
বিচারপতি কাজী জীনাত হক (Kazi Zinat Hoque, J.)
✅মামলার মূল ঘটনা (Facts of the Case): পিটিশনার মুজাহিদুল ইসলাম আরিফ (পিতা: শাহ আহমদ আলী, জেলা: কিশোরগঞ্জ) বিপিএসসি (BPSC) কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ সচিবালয়ের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে 'ব্যক্তিগত কর্মকর্তা' (Personal Officer) পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ও মনোনীত হন।
🔴যাচাই-বাছাই ও পুলিশ রিপোর্ট: লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁর পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়। পুলিশ প্রতিবেদনে পিটিশনারের নিজের স্বভাব-চরিত্র, অতীত রেকর্ড ও নাগরিকত্ব শতভাগ নিষ্কলঙ্ক ও পরিচ্ছন্ন পাওয়া যায়।
🔴তবে ভেরিফিকেশন রিপোর্টের মন্তব্য কলামে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, পিটিশনারের পিতা কটিয়াদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত বিএসসি শিক্ষক এবং তিনি "শিক্ষকতা করাকালীন জামায়াত শিবির করতেন"।
🔴পরবর্তীতে পিতার বিরুদ্ধে আনা এই অস্পষ্ট অভিযোগের অজুহাতে সমপর্যায়ের অন্যান্য প্রার্থীরা নিয়োগ পেয়ে চাকরিতে যোগ দিলেও পিটিশনার আরিফকে দীর্ঘ ৩-৪ বছর ধরে কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, আবার নিয়োগ বাতিলও করা হয়নি।
✅মামলার কারণ (Cause of Action): পিটিশনারের নিজের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অপরাধ বা বিরূপ তথ্য না থাকা সত্ত্বেও এবং বিপিএসসি-এর সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও—কেবল পিতার অতীতের কথিত অস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর নিয়োগপত্র আটকে রেখে বৈষম্যমূলক আচরণ করা এবং চাকরির বয়সসীমা পার করে দেওয়ার মাধ্যমে সংক্ষুব্ধ করায় এ মামলার আইনি বিরোধ বা Cause of Action-এর সৃষ্টি হয়।
✅রিট পিটিশন দায়ের (Filing of Writ Petition): প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় সংক্ষুব্ধ হয়ে ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় মুজাহিদুল ইসলাম আরিফ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এই Writ Petition No. 5399 of 2019 দায়ের করেন।
✅রুল জারি ও প্রাথমিক আদেশ (Rule Nisi and Interim Order): আবেদনটির প্রাথমিক শুনানি শেষে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ বিবাদীগণের (সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের) প্রতি একটি Rule Nisi জারি করেন।
To issue Rule nisi calling upon the respondents to show cause as to why the inaction and failure of the respondents to issue appointment letter to the petitioner in spite of being selected and nominated by Bangladesh Public Service Commission as Personal Officer in Legislative and Parliamentary Affairs Division under the Ministry of Law, Justice and Parliamentary Affairs, Bangladesh Secretariat, Dhaka in a discriminatory manner wherein all other incumbents being selected similarly with the petitioner has been issued appointment letter and working in their respective post should not be declared to have been done without lawful authority and of no legal effect and why the respondents should not be directed to issue appointment letter in favour of the petitioner to the post of Personal Officer in Legislative and Parliamentary Affairs Division under the Ministry of Law, Justice and Parliamentary Affairs, Bangladesh Secretariat, Dhaka as had been nominated and recommended for appointment by the Bangladesh Public Service Commission and/or such other or further order or orders passed as to this Court may seem fit and proper.
✅আইনজীবীদের বক্তব্য (Submissions of Learned Counsel): পিটিশনারের আইনজীবীবিজ্ঞ আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, প্রার্থীর নিজের চরিত্র ও অতীত রেকর্ড সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক। সংবিধান অনুযায়ী প্রার্থীর ব্যক্তিগত কোনো অপরাধ না থাকলে পরিবারের কারও বিরুদ্ধে করা ঢালাও মন্তব্যের কারণে তাঁকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
🔴তারা উল্লেখ করেন, পুলিশ রিপোর্টে পিতার ব্যাপারে এক লাইনের যে অস্পষ্ট মন্তব্য করা হয়েছে, তার কোনো সত্যতা নেই। কারণ স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই সভাপতি এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কটিয়াদী উপজেলা কমান্ডের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডারের দেওয়া প্রত্যয়নপত্রে (Annexures J, K, L) স্পষ্ট বলা হয়েছে—পিতা কখনো দেশবিরোধী বা রাজনৈতিক অপতৎপরতায় যুক্ত ছিলেন না।
🔴আরও বড় প্রমাণ হলো (Annexure-M), একই পিতার দুই সহোদর ভাই ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন (একজন সচিবালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং অন্যজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক)। সুতরাং, কেবল এই পিটিশনারকে বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (malafide) ও বৈষম্যমূলক।
✅রেসপন্ডেন্ট/রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য (Mr. Noor Us Sadik Chowdhury, DAG): রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রুলের বিরোধিতা করে বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট অত্যন্ত গোপনীয় দলিল। যেহেতু রিপোর্টে প্রার্থীর পিতার "জামায়াত শিবির" করার উল্লেখ ছিল, তাই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এমন পরিবার থেকে স্পর্শকাতর পদে নিয়োগ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
✅আদালতের পর্যবেক্ষণ (Court's Observation with Citations): মাননীয় বিচারপতি কাশেফা হোসেন এবং বিচারপতি কাজী জীনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নথিপত্র ও আইনি দিক বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তসমূহ প্রদান করেন:
🔴'জামায়াত শিবির' মন্তব্যের অসংগতি (Paragraph 14): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, 'জামায়াত' হলো মূল রাজনৈতিক দল এবং 'শিবির' হলো তার ছাত্র সংগঠন। পুলিশ রিপোর্টে 'জামায়াত শিবির' বলাটি চরম অনিশ্চিত ও অসংগত, কারণ একই সাথে একজন ব্যক্তি মূল দল ও ছাত্র সংগঠন দুটি সত্তার সাথেই যুক্ত থাকবেন—তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও যুক্তিবহির্ভূত (defies all reasoning)।
ভেরিফিকেশন রিপোর্ট চূড়ান্ত বা অখণ্ড নয় (Paragraph 15), আদালত স্পষ্ট জানান—"Police verification report is not a sacrosanct piece of document" (পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট কোনো অখণ্ড বা অলঙ্ঘনীয় দলিল নয়)। রিট এখতিয়ারে আদালতের দায়িত্ব হলো কথিত অভিযোগের কোনো বস্তুগত বা আইনি প্রমাণ রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা।
🔴পুলিশ রিপোর্টে কোনো তারিখ, সময়, পদ বা স্থান উল্লেখ ছাড়া যে এক লাইনের ঢালাও মন্তব্য করা হয়েছে, তার কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ নেই। পক্ষান্তরে, স্থানীয় স্বাধীনতাকামী নেতৃত্ব ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ইতিবাচক প্রত্যয়নপত্র এবং প্রার্থীর অপর দুই ভাইয়ের সরকারি চাকরিতে বহাল থাকার তথ্য প্রমাণ করে যে, পিতার রাজনৈতিক যুক্ততার অভিযোগটি factual basis বা তথ্যের ভিত্তিহীন।
🔴পিটিশনারের নিজের রেকর্ড সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ, যা পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টেও স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে।
✅আদালতের রায় ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Judgment of the Court): ০২ নভেম্বর ২০২২ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে মামলাটির চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:
🔴রুল অ্যাবসোলিউট (Rule Absolute): পিটিশনারের পক্ষে জারি করা Rule Nisi-কে চূড়ান্ত বা Absolute ঘোষণা করেন।
🔴বিপিএসসি কর্তৃক মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও পিটিশনার মুজাহিদুল ইসলাম আরিফকে নিয়োগপত্র না দেওয়ার প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও বৈষম্যমূলক আচরণকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত (without lawful authority) এবং আইনগত প্রভাবহীন (of no legal effect) ঘোষণা করেন।
🔴সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে পিটিশনার মুজাহিদুল ইসলাম আরিফকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে 'ব্যক্তিগত কর্মকর্তা' (Personal Officer) পদে নিয়োগপত্র ইস্যু করার স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করা হয়।
Writ Petition No. 5399 of 2019 এর রায় থেকে তথ্য গৃহীত।
যেকোনো মতামত, সংশোধনী, পরামর্শ প্রদান করতে পারেন। যাচাই-বাছাই পূর্বক সংশোধন করা হবে।
অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মিয়া
লেক্সজোন ল' চেম্বারস
(অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার ও লিগ্যাল কনসালটেন্টস)ঐ
ঠিকানা: রুম নং ৪০৮ এ, ৪র্থ তলা, বাংলাদেশ শিশু কল্যান পরিষদ ভবন, তোপখানা, ঢাকা (মেট্রোরেল সচিবালয় স্টেশন এর উত্তর পাশে)।
মোবাইল: 01841700461, 01724700461
Email: [email protected]
www.Lexzonelawchambers.com
#আইনি_পরামর্শ
©️2026Adv Adv Monirul Islam Miah
ালত, ,