26/02/2019
প্রাণির প্রতি আচরণ- কি,কেন এবং প্রচলিত আইন- বিবিসি বাংলায় দেয়া সাক্ষাৎকারের মূল।
আলোচনাকে তিন ভাগে করতে পারি। যেহেতু বাংলাদেশে প্রাণির প্রতি আচরণ নিয়ে কাজকর্মের শুরুর দিকে আছি আমরা।
১। প্রাণির প্রতি আমাদের আচরণ সম্মানজনক এবং সহমর্মিতার হওয়া দরকার কেন?
যেহেতু প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোর উন্নতি একটি সমাজের মূল নয়- বরং মোড়াল প্রোগ্রেস হল সুস্থ-স্বাভাবিক সমাজের মূল ভীত- কাজেই মানুষের মানবিক আচরণের কিছু মৌলিক বিষয়ের প্রতিফলন তো অবশ্যই থাকতে হবে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় কিন্তু শিশুদের প্রতি আচরণ, প্রতিবেশির প্রতি আচরন-করনীয় সহ নানা বিষয় শেখানো হয়। বাদ যায়না পরিবেশ। ঠিক তেমনই একটি স্বাভাবিক কিন্তু আবশ্যিক বিষয় হল- নিরীহ প্রাণির প্রতি আমি কি আচরণ করছি। সেইদিক থেকে যদি বলি- সমাজের বড় বড় অপরাধ প্রবণতা থেকে রক্ষা করতে পারে এইসব ছোট ছোট মানবিক আচরণ। আমাদেরকে বার বার শেখানো হয়- অন্যের প্রতি সহমর্মী হতে হবে। কারণ কি- আমাদের মাঝে মানবিকতাবোধের বীজ বপনের জন্য। কাজেই একটি নিরিহ,কথা বলতে না পারা প্রানির প্রতি আমার আচরণ অবশ্যই আমার সমাজের মোড়াল প্রোগ্রেসকে প্রতিফলিত করে।
মহাত্মা গান্ধী এ কারনে বলেছেন- “একটি জাতির মহত্ব এবং মোড়াল প্রোগ্রেস নির্ভর করে তাঁদের পশু-পাখিদের প্রতি তাঁরা কি আচরণ করেন সেটির উপর।“
২। আইন করে কি সমাধান করা যাবে?-
আইন তো অনেক আছে দেশে। ১৯২০ সালের হলেও প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে আইনটি প্রচলিত। কিন্তু খুব কম মানুষ এটি জানেন। প্রয়োগের কথায় আসলামই না। গত বছর ১৬ জন কুকুর জীবন্ত মাটি চাপা দেবার বিরুদ্ধে যে মামলা এবং রায়ের ঘটনা সেটি আমরাই বাংলাদেশে প্রথম করে দেখালাম। ৪৭ বছরে এটি ছিল দ্বিতীয় রায় এবং প্রথম সর্বোচ্চ সাজা।
আইন থাকবার পরেও প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা কেন মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে? কোন প্রাণিকে আঘাত করা, ঝুলিয়ে বাঁধা, ক্ষমতার বাইরে বোঁঝা চাপিয়ে দেয়া, ক্ষুধার্ত রাখা- এমন অনেক কিছুই কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে আমরা দেখছি এবং স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছি। খুব কম মানুষ প্রতিবাদ করছি। কেন? কারণ- আমরা এটিকে প্রথা হিসেবে নিয়েছি। আইন করে সাজা দিয়ে বিক্ষিপ্ত অন্যায়-অপরাধ দমন করা যায়, কিন্তু প্রথা দমন করতে হলে আইনের পাশাপাশি গনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নইলে ১০০ টাকা জরিমানার সাজা অথবা ১ লক্ষ টাকা জরিমানার সাজা- দুটোই এক। মানুষ না জানলে এবং আইনের প্রয়োগ না থাকলে সেটির প্রভাব কতটুকু পরবে সমাজে?
৩। আজকের যে নিউজটি এসেছে প্রথম আলোতে- মুরগি ঝুলিয়ে নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ-
যে আইনের ধারায় এটি রয়েছে সেখানে ৯ টি ধারায় নানা অপরাধের ভিত্তিতে সাজার কথা বলা হয়েছে। শুধু মুরগি নয়- গরু-ছাগল পরিবহন, মুরগিকে খাঁচায় রাখা, চিড়িয়াখানায় উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া বন্য প্রাণিকে আটক রাখা, পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়িতে ২০-২৫ জন মানুষের বোঁঝা দুইজন ঘোড়ার উপর চাপিয়ে দেয়া, অসুস্থ প্রাণিকে দিয়ে কাজ করানো, শখে পোষা কুকুর-বিড়াল শখ ফুরিয়ে গেলে অন্ধকার কোণে আবর্জনার মত ফেলে রাখা- এমন অনেক ইস্যু সেখানে আছে। এবং দুঃখের বিষয়- আমরা কাজ করতে গিয়ে এসব কিছুরই উপস্থিতি সমাজে প্রকটভাবে পেয়েছি। এর মূল কারণ- আমাদের মোড়ালিটি...আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, অসচেতনতা।
মুরগির প্রসঙ্গে যদি আসি- আমি কয়েকজন ফেরিওয়ালাকে প্রশ্ন করেছিলাম- দৈনিক ২৫জন মুরগি সে ফেরি করে। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধছিল সে। এরপর পা ধরে একসাথে ঝুলিয়ে নেয়। ৩০/৩৫ কেজি ওজন সে বহন করে। তাঁরা টুকরিতে বা ঝুড়িতে নেয় না কারণ- ক্রেতা মুরগির শরীর না দেখলে কিনে না। অর্থাৎ, আপনি ঝুলিয়ে দেখে, যন্ত্রনায় তড়পানো দেখে তাজা মুরগি চিনবেন। এখন- আপনি ক’জন ফেরিওয়ালাকে মামলা করবেন?
প্রথমেই বলেছি- এসব অন্যায় আচরণ আমাদের প্রথা হয়ে গিয়েছে। কাজেই- পুরো সিস্টেমে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই সহমর্মিতার সমাজ আসবে এবং অপরাধ কমে আসবে। কোমল মনের মানুষ কখনো খুন- ধর্ষণ করতে পারে না।
রাত- ১২ঃ৩০ মিনিট/১৩ই জানুয়ারি/২০১৯