14/08/2026
@ #বিচারপ্রার্থীর বিচার প্রাপ্তিতে বিলম্ব নাকি আইনি জটিলতা
#সংবিধানের মূল মর্মবাণী অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্রবিন্দু হলো আদালত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। বিচার নিশ্চিত করার জন্য একের পর এক আইন ও প্রজ্ঞাপন জারি হলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা প্রায়শই বিচারপ্রার্থীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু মামলা দায়েরের পূর্বে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যালয়ে আবেদনের বাধ্যতামূলক বিধান এবং আদালতের এখতিয়ার সংক্রান্ত নানা আইনি মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষ আজ চরম হয়রানি ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি।
#সম্প্রতি দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ছয়টি আইনি ক্ষেত্রের মামলা দায়েরের পূর্বে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যালয়ে আবেদন করার বিধান করা হয়েছে। এই পরিধিভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ৫ ধারা; পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ৫ ধারা; যৌতুক নিরোধক আইন, ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারা; দণ্ডবিধির বহুবিধ ধারা (যেমন: ১৪৩, ৪৪৭, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩৫০, ৪২০, ৪৯৪ ইত্যাদি); সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের বিভিন্ন ধারা এবং বহুল আলোচিত নিগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট)-এর ১৩৮ ধারা। সরকারের সদিচ্ছা হয়তো বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা মামলার জট কমানো ছিল, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
#সরেজমিনে নাটোর জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন সেখানে ৫০টির বেশি আবেদন জমা পড়ছে। অথচ এই বিশাল পরিমাণ আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল বা অবকাঠামোগত সক্ষমতা উক্ত কার্যালয়ের নেই। ফলে বহু বিচারপ্রার্থী দীর্ঘক্ষণ লাইন ধরে ঘুরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন এবং বারবার তাদের অফিসে চক্কর কাটতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, লিগ্যাল এইড থেকে যে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে, তা অনেক সময় ধার্য তারিখের পূর্বে বিবাদীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আর পৌঁছালেও অনেক ক্ষেত্রে বিবাদীপক্ষ তা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, এভাবে লিগ্যাল এইডের বারান্দায় ছয় মাস থেকে এক বছর ঘুরেও যদি সুরাহা না মেলে এবং পরবর্তীতে নিয়মিত আদালতে যেতে হয়, তবে বিচার প্রাপ্তির পথ শুধু দীর্ঘই হবে না, বরং তা প্রহসনে রূপ নেবে। নাটোরের সাতটি থানার আমলি আদালতগুলোতে প্রতিদিন গড়ে যে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা ফাইলিং হয়, তার বিপরীতে লিগ্যাল এইডের এই বর্তমান সক্ষমতা সম্পূর্ণ অপ্রতুল।
#তাছাড়া, এই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত সকল মামলাকে লিগ্যাল এইডের আওতাভুক্ত করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে আইন অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ—কেউ মারধরের শিকার হয়ে হাত-পা ভেঙে লিগ্যাল এইডের দপ্তরে বসে থাকবেন, আর অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে এ ধরনের বিধান ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার পরিপন্থী। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে, যা আইনি দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে।
#অন্যদিকে, নিগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট বা চেক ডিজঅনারের মামলার ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতার শেষ নেই। এনআই অ্যাক্টের ১৪১ ধারার বিধান অনুযায়ী চেক ডিজঅনারের অপরাধ দায়রা আদালত কর্তৃক বিচার্য। ইতিপূর্বে এএএম জিয়াউর রহমান বনাম বাংলাদেশ (৭৩ ডিএলআর ২০২১) মামলায় মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ এবং হাইকোর্টের ২/২০২১ সালের সার্কুলার অনুযায়ী, চেকের মামলার বিচার কেবল যুগ্ম দায়রা জজ কর্তৃক করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, কারণ যুগ্ম দায়রা জজের সাজার বিরুদ্ধে আপিল দায়ের হয় দায়রা জজের কাছে। অথচ সম্প্রতি পাঁচ লক্ষ টাকার নিচের মোকদ্দমা দায়রা আদালত বিচার করবে না মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি করে তা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রেরণ করা হয়েছে। অথচ যেখানে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির স্বার্থে দায়রা আদালতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে, সেখানে এই ধরনের আদেশ এক যেমন দায়রা আদালতগুলোকে বিচারকশূন্য বা কার্যহীন করে তুলছে, তেমনি তা উচ্চ আদালতের নির্দেশনার সাথেও সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ আইনজীবী মহল।
#আইন বা বিধান তৈরি হয় জনকল্যাণের জন্য, জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু যখন সেই আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং আইনি মারপ্যাঁচ তৈরি হয়, তখন বিচারপ্রার্থী জনগণই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। নাটোরসহ সারাদেশের বিচারপ্রার্থীদের এই যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট মহলের এখনই দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। লিগ্যাল এইড অফিসগুলোর জনবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধি করা, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রি-লিটিগেশন বাধ্যতামূলক হবে তার বাস্তবসম্মত পুনর্বিবেচনা এবং আদালতের এখতিয়ার সংক্রান্ত জটিলতাগুলো দূর করা সময়ের দাবি। পরিশেষে, আইনি জটিলতার বেড়াজাল ভেঙে দ্রুত, সহজ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত না হলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার উভয়ই হোঁচট খাবে বারবার।