08/06/2026
বাংলাদেশে দণ্ডবিধির আওতায় মানহানির অপরাধ, এর সংজ্ঞা, শাস্তি এবং এর আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৪৯৯ থেকে ৫০২ ধারায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। নিচে এই ধারাগুলো এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ধারা ৪৯৯: মানহানি (Defamation) এর সংজ্ঞা:
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির সুনাম বা সম্মান নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা এমন সম্ভাবনা আছে জেনেও কোনো মিথ্যা অপবাদ প্রচার করেন, তবে তাকে মানহানি বলা হয়।
মানহানি কিভাবে সংঘটিত হতে পারে? মানহানি নানাভাবে হতে পারে, যেমন:
মুখের কথার মাধ্যমে: কাউকে নিয়ে কোনো কথা বলা, যা তার সুনাম নষ্ট করতে পারে।
লিখিতভাবে: কোনো চিঠি, মেসেজ বা পোস্টে কাউকে নিয়ে অপবাদ দেওয়া।
চিহ্ন বা দৃশ্যমান প্রতীকের মাধ্যমে: কার্টুন বা ছবির মাধ্যমে কাউকে অপমানজনকভাবে উপস্থাপন করা।
২. ব্যতিক্রম: সব সমালোচনা কিন্তু মানহানি নয়:
সব সমালোচনা কিন্তু মানহানি হিসেবে গণ্য হয় না। কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন:
আদালতের রায়ের ওপর মন্তব্য করা: আদালতের কোনো রায়ের ওপর যুক্তিপূর্ণ আলোচনা বা সমালোচনা করা মানহানি নয়।
সরকারি কর্মচারীর কাজের সমালোচনা করা: সরকারি কর্মচারীদের কাজের সমালোচনা করা, যদি তা জনস্বার্থে হয়, তবে তা মানহানি নয়।
জনস্বার্থে সত্য কথা প্রকাশ করা: জনস্বার্থে সত্য কথা প্রকাশ করা মানহানি হিসেবে গণ্য হয় না, এমনকি যদি তা কারো সুনাম নষ্ট করে।
৩. ধারা ৫০০: মানহানির শাস্তি:
মানহানির অপরাধ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা হয়। এই শাস্তির পরিমাণ হচ্ছে:
সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা
অর্থদণ্ড, অথবা
উভয় দণ্ড।
৪. ধারা ৫০১ ও ৫০২: মানহানিকর বিষয় ছাপানো বা বিক্রি:
ধারা ৫০১: যদি কেউ জানেন যে কোনো তথ্য মানহানিকর, তবুও সেটি কোনো পত্রিকা বা বইয়ে ছাপান, তবে তার শাস্তিও ৫০০ ধারার মতো (২ বছর জেল/জরিমানা)।
ধারা ৫০২: মানহানিকর লেখা সংবলিত কোনো বই বা কাগজ বিক্রি করাও একটি অপরাধ, যার শাস্তিও একই।
৫. একটি সহজ উদাহরণ:
ধরা যাক, 'ক' একজন সৎ ব্যবসায়ী। 'খ' তার সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে ফেসবুক বা লোকসমাজে রটিয়ে দিল যে, 'ক' একজন চোর এবং সে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করেছে (অথচ কথাটি মিথ্যা)। এক্ষেত্রে 'খ' জেনে-বুঝেই 'ক'-এর সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
এই ক্ষেত্রে 'ক' যদি আদালতে মামলা করেন এবং প্রমাণ করতে পারেন যে তথ্যটি মিথ্যা ছিল, তবে 'খ'-এর ৫০০ ধারা অনুযায়ী ২ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
৬. গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:
মামলা কে করতে পারে? মানহানির মামলা কেবল সেই ব্যক্তিই করতে পারেন যার মানহানি হয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে (যেমন মৃত ব্যক্তির মানহানি হলে তার পরিবার) মামলা করা যায়।
ডিজিটাল মাধ্যম: বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব বা অনলাইনে মানহানি করলে দণ্ডবিধির পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইন (পূর্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) অনুযায়ীও ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যার প্রক্রিয়া ও শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে।
মৃত ব্যক্তির মানহানি: কোনো মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন কিছু বলা যা জীবিত থাকলে তার মানহানি হতো, সেটিও এই আইনের আওতায় অপরাধ।
অ্যাডভোকেট ইমরুল শেখ
জেলা ও দায়রা জজ আদালত,ঢাকা