10/12/2018
আত্মহত্যায় প্ররোচনা
দণ্ডবিধিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনা (Abetment) দান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিষয়ে দু’টি ধারা রয়েছে। ধারা ৩০৫ - নাবালক, নির্বোধ লোককে এ প্ররোচনা দিলে তার শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত। আর, ধারা ৩০৬ - সুস্থ স্বাভাবিক লোককে এ প্ররোচনা দিলে তার হতে পারে ১০ বছর পর্যন্ত জেল (বোধ হয় প্ররোচিত হবার দায় আত্মহত্যাকারীর ওপরও কিছুটা দেয়া হয়েছে যে কারণে এক্ষেত্রে শাস্তি কিছুটা কম!) প্রসঙ্গক্রমে বলি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে সফল হলে মরে বেঁচে যাবেন। কিন্তু, ডাক্তারী খপ্পরে পড়ে ব্যর্থ হলে বিপদ ভারি, তখন পুলিশি চক্করে ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টার (ব্যর্থ!) দায়ে ১ বছরের ঘানি (জেল)।
২০০৮ সালে একটি জেলায় গিয়ে আমার আদালতে বেশ কয়েকটি দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারার (মানে সুস্থ স্বাভাবিক লোককে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দান) মামলা চার্জ শুনানীর অবস্থায় পাই। সব গুলো মামলার ঘটনার প্রকৃতি মূলগতভাবে প্রায় একই ধরনের – কেবল স্থান কাল পাত্র বদল করে ভিন্ন কাহিনী মাত্র। একটির কথা বলি। ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। আত্মহত্যাকারীর ছেলে গ্রামের দরিদ্র ভ্যান-চালক কিছু টাকা ধার নিয়েছিল অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল আসামীর কাছ থেকে। কিন্তু, দীর্ঘ দিন ধরে তাগাদা দিয়েও সে টাকা শোধ না পেয়ে আসামী যায় ভ্যান-চালকের বাড়ী এবং তাকে না পেয়ে তার পিতাকে গালমন্দ করে ছেলের এই ঠকবাজি আচরণের জন্য। তার কয়েক দিন পরে ভ্যান-চালকের পিতা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মামলা হয়। তদন্তে পুলিশ আবার একটি ডায়রীর পাতাও উদ্ধার করে, হ্যাঁ ভ্যান-চালকের পিতার লেখা! যেখানে সে তার আত্মহত্যার জন্য আসামীর ঐ গালমন্দের যাতনা উল্লেখ করে গেছে! কিন্তু, আমার মনে প্রশ্ন, এই গালমন্দ প্ররোচনা হয় কিভাবে? আসামী তো দড়ি এগিয়ে দেয় নি। গালমন্দের কারণে আর কোন বিকল্প পথ কি তার ছিল না? আত্মহত্যার মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবনা এল। দু’এক ছত্র জীবনানন্দ পড়া ছিল, তাইই মনে পড়ল –
‘‘তবুও তো প্যাঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায় – অনুমেয় উষ্ঞ অনুরাগে।
টের পাই যুঁথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।”
প্রকৃতির যেখানে অবস্থা এই যে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও কীট পতঙ্গদের বাঁচার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। সেখানে একজন মানুষকে একদিনের কিছু বাক্যবাণের কারণের একগাছা দড়ি হাতে নিয়ে অশ্বথ্থের কাছে যেতেই হবে! একি প্ররোচনা নাকি এক বিপন্ন বিষ্ময়!
দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা দেখলাম, না কোনভাবেই এটা প্ররোচনা বা সহযোগীতার পর্যায়ে পড়ে না। কিছু গালমন্দের অনিবার্য ও একমাত্র পরিণতি আত্মহত্যা হতে পারে এটা আসামী কেন অন্য সকলেরই ধারণাতীত।
এইসব যুক্তি দিয়ে আমি সবগুলো মামলার আসামীদের ডিসচার্জ করেছিলাম।
২০১৬ সালে আপীল বিভাগ কী বলছেন দেখুন – “Uttering of abusive language will not amount to provocation to commit su***de and does not constitute abetment unless something more is done in pursuance of the said utterance of abuses.” [APM Sohrab-uz-zaman vs State, 68 DLR (AD) 331]
গুঢ় কথা : কোথাও একটি লাশ পাওয়া গেলে কিছু দালাল পুলিশ মিলিয়ে মামলার ব্যবসা হয়। এগুলো প্রথমেই বিচক্ষণতার সাথে চিহ্নিত করা বিচারকের দায়িত্ব।
সতর্কবার্তা: স্ত্রীর আত্মহত্যার ক্ষেত্রে স্বামীর কিন্তু রেহাই নেই, ক্ষেত্র বিশেষে প্ররোচনার দায়ে স্বামী দোষী হতে পারেন। “The attending circumstances show that the husband created a situation for which the wife was compelled to commit su***de and thus the husband committed the offence of abetment of su***de which falls within the mischief of section 306 of the Penal Code.” [The State vs Md. Golam Sarwar @ Ripon, 35 BLD 159] একই কথা অন্য প্রেক্ষিতে আত্মহত্যার ঘটনার বেলায়ও প্রযোজ্য হতে পারে।
লেখকঃ মুঈদ ইসলাম, জেলা জজ। বর্তমানে মহাপরিচালক, দুর্নিতি দমন কমিশন