07/06/2026
আইনজীবীদের “বিজ্ঞ” সম্বোধনের ইতিহাস, দায়বদ্ধতা ও আইনি ভিত্তি !
বিজ্ঞ আদালতে আইনজীবীরা কেন একে অপরকে “বিজ্ঞ বন্ধু” বা “Learned Friend” বলে সম্বোধন করেন? তাদেরকে কেন “দক্ষ বন্ধু”, “অভিজ্ঞ বন্ধু” কিংবা “পরিশ্রমী বন্ধু” বলা হয় না?
এর উত্তর অহংকারে নয়; এর উত্তর ইতিহাসে, দায়িত্বে এবং একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যে নিহিত। মধ্যযুগীয় ইউরোপে তিনটি পেশাকে “Learned Professions” বা “বিদ্বৎপেশা” বলা হতো— ধর্মতত্ত্ব (Theology), চিকিৎসাবিজ্ঞান (Medicine) এবং আইন (Law)। ধর্মতাত্ত্বিকদের দায়িত্ব ছিল মানুষের আত্মার মুক্তি, চিকিৎসকদের দায়িত্ব মানুষের শারীরিক সুস্থতা এবং আইনজীবীদের দায়িত্ব ছিল ন্যায়বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা। “Profession” শব্দটির উৎস ল্যাটিন “Professio”, যার অর্থ একটি গুরুতর অঙ্গীকার বা solemn vow। অর্থাৎ, এসব পেশা কেবল জীবিকা ছিল না; বরং ছিল নৈতিক দায়িত্ব ও সামাজিক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একেকটি ব্রত।
প্রাচীন যুগে আইনি জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত। কারণ লেখালেখি ছিল দুর্লভ এবং বই তৈরি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে সাধারণ মানুষ আইন জানত মূলত অলিখিত প্রথা কিংবা শাসকদের ঘোষণার মাধ্যমে। প্রকৃত আইনি জ্ঞান সংরক্ষিত থাকত পুরোহিত, রাজা এবং ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে, যারা সেই জ্ঞানকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার উপায় হিসেবেও ব্যবহার করত। প্রাচীন ভারত, ব্যাবিলন ও মিশরের মতো সভ্যতাগুলোতে আইন ধর্মের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল। পুরোহিত ও রাজারা ছিলেন চূড়ান্ত বিচারক। প্রাচীন রোমে তো আইনকে একসময় “রহস্যময় বিদ্যা” (mysterious science) হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা পন্টিফদের (College of Pontiffs) নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখা হতো। এমনকি হাম্মুরাবির বিধান (Code of Hammurabi) কিংবা রোমান Twelve Tables-এর মতো আইনসংহিতা প্রকাশিত হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের সাক্ষরতা প্রায় ছিল না বললেই চলে। ফলে জনগণ নিজেরা আইন পড়ে জানার সুযোগ পেত না; বরং স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক যা বলতেন, তাকেই আইন হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হতো।
যে যুগে সাধারণ মানুষের সাক্ষরতা ছিল বিরল, সে সময়ে এই পেশাগুলো মর্যাদা পেয়েছিল সম্পদ বা ক্ষমতার কারণে নয়, বরং জ্ঞানচর্চা ও শাস্ত্রজ্ঞতার কারণে। আইন, ধর্মগ্রন্থ ও চিকিৎসাবিদ্যার জটিল পাঠ আয়ত্ত করা ছিল তাদের বিশেষত্ব। “Learned” হওয়া মানে কেবল চৌকস হওয়া নয়; বরং ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা।
আইন কেবল “কি আছে” তা নিয়ে কাজ করে না; বরং “কি হওয়া উচিত” তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আইন প্রায়ই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে পথ খোঁজে। এখানে সব উত্তর সরল নয়, অনেক সময় জনপ্রিয়ও নয়। একজন আইনজীবী কেবল আইন মুখস্থ করেন না; তিনি আইন ব্যাখ্যা করেন, প্রশ্ন তোলেন, পার্থক্য নির্ণয় করেন এবং আদালতকে কোনো আইনি অবস্থানের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে যুক্তি দিয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। কখনও কখনও তাঁকে তাঁর মক্কেলকেও বুঝিয়ে বলতে হয় যে, আপাতদৃষ্টিতে “সহজ” বা “স্পষ্ট” মনে হওয়া অবস্থানটি বাস্তবে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে টেকসই নয়। এ কাজের জন্য প্রয়োজন বিশেষ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা। জটিলতাকে ভয় না পেয়ে ধারণ করার ক্ষমতা। একজন আইনজীবীকে অল্প হলেও প্রায় সবকিছু সম্পর্কে জানতে হয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে হয়তো বিষবিদ্যা, কর্পোরেট অর্থনীতি, সাংবিধানিক তত্ত্ব, ভূমি-ব্যবস্থা কিংবা খনিশিল্পের প্রযুক্তিগত কাঠামো সম্পর্কে ধারণা নিতে হতে পারে। তিনি হয়তো প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা অর্থনীতিবিদ নন; কিন্তু তাঁদের বক্তব্য বুঝে প্রশ্ন করার মতো জ্ঞান তাঁকে অর্জন করতেই হয়। অন্য পেশাগুলো যেখানে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়, আইনজীবীর বিশেষত্ব সেখানে সংঘাত, যুক্তি ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে।
এটাই “Learned” হওয়ার দায়। এটি কেবল সম্মানের বিষয় নয়; এটি এক গভীর বৌদ্ধিক দায়িত্ব। কখনও কখনও বিপজ্জনক দায়িত্বও। কারণ “বিজ্ঞ” বলা মানে প্রশংসা নয়; বরং একটি প্রত্যাশা। তাই যখন আমরা একে অপরকে “বিজ্ঞ বন্ধু” বলে সম্বোধন করি, তখন তা নিছক সৌজন্য নয়। আমরা স্বীকার করি যে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও আমরা একই বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলার রক্ষক যেখানে যুক্তি, সংযম ও পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য। “Learned” হওয়া মানে সব জানা নয়; বরং কথা বলার আগে চিন্তা করা, অভিযোগ তোলার আগে যুক্তি খোঁজা এবং বিচার করার আগে বোঝার দায়িত্ব বহন করা। আমরা সবসময় সেই মর্যাদার উপযুক্ত হতে পারি কি না সেটিই আসল প্রশ্ন, এবং সেটিই আমাদের প্রকৃত কাজ।
আইনজীবীদের “Learned” বা “বিজ্ঞ” বলে সম্বোধনের কোনো আনুষ্ঠানিক আইন বা বিধিবদ্ধ ভিত্তি নেই। এটি মূলত কমন ল’ বিচারব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের পেশাগত রীতি, সৌজন্য ও ঐতিহ্য।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালা এর অধ্যায় এক এর অনুচ্ছেদ ১ অনুসারে, "প্রত্যেক আইনজীবীর কর্তব্য হলো সর্বদা তাঁর পেশার মর্যাদা ও উচ্চ অবস্থান সমুন্নত রাখা, একই সঙ্গে সেই পেশার একজন সদস্য হিসেবে নিজের মর্যাদা ও সম্মান বজায় রাখা।" এছাড়াও, যুক্তরাজ্যের Bar Standards Board (BSB) Handbook অনুযায়ী, ব্যারিস্টারদের অবশ্যই অন্যান্য আইন পেশাজীবীদের প্রতি সর্বদা সৌজন্য, সম্মান ও সততার সঙ্গে আচরণ করতে হবে বলে নির্দেশনা আছে।
“বিজ্ঞ” সম্বোধন মূলত বিদ্বৎচর্চা ও বৌদ্ধিক সক্ষমতার স্বীকৃতি। ঐতিহাসিকভাবে আইনকে এমন একটি বিদ্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, যা মানুষের জীবন ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আইনজীবী ও বিচারকদের এমন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যাঁদের সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবজীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতা সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান রয়েছে। সেই কারণেই তাঁদের “Learned” বা “বিজ্ঞ” বলা হতো।
একই সঙ্গে আদালতের ভাষা ও আচরণে এই সম্বোধনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্য বজায় রাখা। আদালতে আইনজীবীরা একে অপরের যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করলেও ব্যক্তিগত অসম্মান এড়িয়ে চলেন। “My learned friend” বা “বিজ্ঞ বন্ধু” বলে সম্বোধন করা সেই বিরোধিতাকে শালীন ও পেশাগত সীমার মধ্যে রাখে। এটি বিরোধপূর্ণ বিচারিক পরিবেশেও পারস্পরিক সম্মান ও ভদ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আইনের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদ মতে, 'আইন' বলতে যেকোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি বা অন্যান্য আইনি দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের বলবৎযোগ্যতা সম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতিকে বোঝায়।
আদালত ও আইনাঙ্গনে আইনজীবীদের বিজ্ঞ বলে সম্বোধন করা শত শত বছরের পুরনো রীতি-রেওয়াজ বিধায় কোনো আইনে সরাসরি বিজ্ঞ বলার তাগিদ না থাকলেও এটার ঐতিহ্যগত আইনি ভিত্তি রয়েছে।
তবে বিজ্ঞতা কেবলই সম্বোধনসূচক হতে পারেনা। চলনে-বলনে কাজে-কর্মে ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে যেসকল আইনজীবীরা বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারবে না তাদের নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে পারে।
©
Copy post