22/05/2026
খুন বা ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধের বিচার জজকোর্টে ট্রায়াল, হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগে আপীল, রিভিউ শেষ হতে হতে যুগ যুগ পার হয়ে যায় কেনো জানেন?
এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে সাক্ষী ঠিকমতো আসেনা।
সাক্ষী ঠিকমতো আসেনা কেনো জানেন?
আমাদের দেশে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৫৪৪ ধারার অধীনে ১৯৮২ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করে মামলাতে আসা সাধারণ সাক্ষীদের ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছিলো -
দৈনিক হোটেল ভাড়া ১০(দশ) টাকা,
দৈনিক খাবার খরচ ২০(বিশ) টাকা।
২০ মাইলের চাইতে বেশী দূর থেকে আসলে যাওয়া এবং আসার জন্য ১৫(পনেরো) টাকা করে পাবেন।
-- Reference: Establishment Division Memo Number. AD (IV)-25/81-277 dated 27.09.1982 and Memo Number. AD (IV)-25/81-280 dated 06.10.1982.
এই নিয়ম এখনো বহাল আছে।
বাই দা ওয়ে, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হলেও এসবের জন্য বাজেট না থাকায় এই টাকাও সাক্ষীরা পাননা।
☠️💀
ধরেন,
আপনার নিজের চোখের সামনেই একজন সন্ত্রাসীকে ধর্ষণ বা খুন করতে দেখে ফেললেন।
আপনি সাক্ষী হবার আগেই আপনাকে সাবধান করা হলো যেনো জীবনের মায়া থাকলে সাক্ষী হবার কথা কল্পনাও না করেন।
বাংলাদেশে ভারত, থাইল্যান্ড বা ইউরোপ আমেরিকার মতো কোনো Witness Protection Law বা সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই, যার মাধ্যমে সরকার আপনাকে সুরক্ষা বা প্রটেকশন দেবে।
বুকে হাত দিয়ে বলেন তো,
আপনি বা আমি কি আসলেই সাক্ষী হতে রাজী হবো?
যদি ভুলেভালে সাক্ষী হয়েও যাই বা সাক্ষী হিসেবে নাম ঢুকিয়ে দেয়, সাক্ষী দিতে কি আমরা আসলেই সাহস করবো?
দেশের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র।
আর কোনো দরিদ্র মানুষ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে দিনের পর দিন আদালতে সাক্ষী দিতে আসবেন?
ধরলাম আপনি স্বচ্ছল।
আসামীও হয়তো এতো বিপজ্জনক না।
কিন্তু দিনের পর দিন নিজের অফিস, ব্যবসা বা জরুরী কাজকর্ম রেখে আদালতে যাবেন?
"আজ সাক্ষী হবেনা" একথা শুনেও নিয়মিত আদালতে হাজির হবেন?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে আপনি ব্যতিক্রম।
অথচ অনলাইনে সাক্ষী নেবার বিষয়টা শুধুমাত্র খাতাকলমে বা রেয়ার অকেশনে করার জন্য না রেখে টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও ট্রেনিং দেবার যথাযথ সিস্টেম তৈরি করে ব্যাপকভাবে প্রচলনের মাধ্যমে সহজেই সমাধান ও সম্পন্ন করা সম্ভব।
মনে রাখতে হবে যে অনেকের জন্য জুম, গুগল মিট বা মাইক্রোসফট টিম অনলাইনে ব্যবহার করা সহজ হলেও, দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ এগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে এখনো জানেননা।
🌲🌳🌴🪴🌿🌳🌲
আগে সুপ্রিম কোর্টের নেয়া মহৎ উদ্যোগে ন্যায়কুঞ্জ নাম দিয়ে দেশের বিভিন্ন আদালতের ভেতরে কিছু জায়গাকে বিচার প্রার্থী সাধারণ মানুষ আর সাক্ষীদের বসার, ওয়াশ রুম করার এবং পানি খাবার জন্য তৈরী করা হয়েছিল।
খবরে দেখলাম সেগুলোও ব্যবসা করার জন্য টাকা নিয়ে দোকান হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়ে গেছে।
এখন এর অনেকগুলোতেই আর কেউ টাকা খরচ না করে বসতে বা ঢুকতে পারেন না।
বিচার কেনো এতো দীর্ঘসূত্রী এটার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এগুলো খুব সামান্য অংশ।
আর, আদালতে বিচারক স্বল্পতা মামলাজট এবং দীর্ঘসূত্রীতার অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলেও একমাত্র কারণ না।
বিচার ব্যবস্থায় সরকারী আইনজীবীরা ভিকটিমের পক্ষে থাকেন।
দূর্ভাগ্যবশত, সরকারী আইনজীবী নিয়োগ হয় সাধারণত রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায়।
এসব নিয়োগে মেধা ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা, আইন বা বিধি নেই।
স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং মেধাতান্ত্রিক প্রসিকিউশন সার্ভিস এই দেশে এখনো অলীক কল্পনা মাত্র।
এর ফলে ওনাদের অনেকের গুণগত মান কি হয় বুঝতেই পারছেন।
এমন সরকারী আইনজীবীদের চিনি যারা ওকালতির সনদ নেবার পর কখনোই ওকালতি করেননি বা আদালতের ধারেকাছেও যাননি।
অন্য পেশা, রাজনীতি এবং ব্যবসায় থেকে পরে হঠাৎ রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আইনজীবী হয়ে গেছেন।
এখন ওনাদের ওপর খুন ধর্ষণের ভিকটিমদের পক্ষে আইনগত লড়াইয়ের গুরুদায়িত্ব।
ওনাদের কারো কারো বিরুদ্ধে আসামীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মামলার দফারফা করার কথাও হরহামেশাই শোনা যায়।
এদিকে ধনবান আসামীরা শীর্ষ আইনজীবীদের অহরহই নিয়োগ করেন।
ভিকটিমের পরিবার যদি পছন্দমতো কোনো বেসরকারী আইনজীবী নিয়োগ করেন, তবে সেই আইনজীবীকে থাকতে হয় সরকারী আইনজীবীদের সহায়ক ভূমিকায়, সাইডলাইনে।
কারণ এটাই নিয়ম।
যদিও এইসব প্রশ্নাতীতভাবে মেনে চলা নিয়ম আর বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষাবিহীন রাজনৈতিক নিয়োগ চিরকাল এভাবেই রাখা উচিত কিনা এটা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।
সুতরাং, বিচার নিয়ে অসংখ্য মানুষ হতাশাগ্রস্থ আর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে অবাক হবার কিছু নেই।
সরকার এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আশাহীনতা আর ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েই বাংলাদেশে জুলাই আগস্টের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলো।
তিউনিশিয়া এবং পাশের দেশ নেপালে এর চাইতেও বেশী হতাশা আর ক্ষোভ সরকার আর তাদের দলীয়করণকৃত বিচার বিভাগকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছিলো।
নিরুপায় মানুষ যখন বিচার পাবেনা বলে সত্যি সত্যি বিশ্বাস করা শুরু করে, অন্তঃসারশূন্য মৌখিক আশ্বাসের ফুলঝুরি যখন বহু বছর অপেক্ষা করার পরেও বাস্তবের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলেনা, তখনই সে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া শুরু করে।
শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।
🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿
- লেখা:
ব্যারিস্টার মুসতাসীম তানজীর,
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ।
🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥
ছবি: অনলাইন থেকে সংগৃহীত।
ক্ষুব্ধ জনতা নেপাল সুপ্রিম কোর্ট মাটিতে মিশিয়ে দেবার আগের দৃশ্য।