26/12/2025
পিআর (PR) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে প্রার্থী নির্বাচন এবং এটি বিশ্বের কোথায় কোথায় কার্যকর রয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে তুলে ধরছি:
১. পিআর পদ্ধতিতে প্রার্থী তালিকা কীভাবে তৈরি হয়?
এই পদ্ধতিতে নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীদের একটি অগ্রাধিকার তালিকা (Party List) নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেয়।
তালিকা তৈরি: ধরুন, একটি দল ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৩০০ জন প্রার্থীর একটি ক্রমানুসার তালিকা (১, ২, ৩...) তৈরি করল।
আসন প্রাপ্তি: নির্বাচনের পর দলটি সারা দেশে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে যদি ১০০টি আসন পায়, তবে তাদের জমা দেওয়া তালিকার প্রথম ১০০ জন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন।
যোগ্যতার মূল্যায়ন: এই পদ্ধতিতে দলগুলো সাধারণত বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের তালিকার উপরের দিকে রাখার চেষ্টা করে, যাতে ভোটাররা আকৃষ্ট হয়। এতে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় জনপ্রিয় না হয়েও যোগ্য ব্যক্তিরা সংসদে যাওয়ার সুযোগ পান।
২. কোন কোন দেশে এই পদ্ধতি চালু আছে?
বিশ্বের অনেক উন্নত ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশে এই পদ্ধতি সফলভাবে কাজ করছে।
যেমন:
জার্মানি মিশ্র পদ্ধতি (Mixed-Member Proportional)
নিউজিল্যান্ড মিশ্র পদ্ধতি (MMP)
সুইডেন ও নরওয়ে পূর্ণ আনুপাতিক পদ্ধতি
ইসরায়েল সম্পূর্ণ দেশব্যাপী তালিকা পদ্ধতি
দক্ষিণ আফ্রিকা ক্লোজড লিস্ট (Closed List) পদ্ধতি
৩. বাংলাদেশে এই পদ্ধতির সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে এই পদ্ধতি চালু হলে কিছু বড় ধরণের পরিবর্তন আসবে:
সুবিধা:
আঞ্চলিক প্রভাবের অবসান: কোনো এলাকার 'মাস্তান' বা 'প্রভাবশালী' ব্যক্তি জোর করে জেতার সুযোগ পাবেন না, কারণ ভোট হবে দলের প্রতীকে।
সংখ্যালঘু ও ছোট দলের প্রতিনিধিত্ব: সমাজের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা ছোট দলগুলো যারা সারা দেশে ছড়িয়ে আছে কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট আসনে সংখ্যাগুরু নয়, তারাও সংসদে কথা বলার সুযোগ পাবে।
চ্যালেঞ্জ:
জনগণের সাথে দূরত্ব: ভোটাররা সরাসরি তাদের এলাকার প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন না বলে সাংসদদের সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
দলের অভ্যন্তরীণ একনায়কতন্ত্র: দলীয় প্রধান যদি তালিকায় নিজের পছন্দের অযোগ্য লোক রাখেন, তবে জনগণের কিছু করার থাকে না (যদি না 'ওপেন লিস্ট' পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়)।
একটি আকর্ষণীয় তথ্য: জার্মানিতে মানুষ দুটি ভোট দেয়—একটি নিজের এলাকার প্রার্থীর জন্য এবং অন্যটি পছন্দের দলের জন্য। একে বলা হয় মিশ্র পদ্ধতি। বাংলাদেশেও এমন মিশ্র পদ্ধতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
"মিশ্র পদ্ধতি" বা জার্মানির মডেলটি কীভাবে কাজ করে:
জার্মানির মিশ্র পদ্ধতি বা Mixed-Member Proportional (MMP) ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা নির্বাচনী মডেল বলা হয়। এটি মূলত প্রচলিত পদ্ধতি এবং আনুপাতিক (PR) পদ্ধতির একটি চমৎকার সমন্বয়।
বাংলাদেশে এই পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাবনা অনেকে দিচ্ছেন কারণ এটি এলাকাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব এবং দলের জনপ্রিয়তা—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেয়।
জার্মানির মডেলটি যেভাবে কাজ করে:
এই পদ্ধতিতে একজন ভোটার ব্যালট পেপারে দুটি ভোট দেন:
প্রথম ভোট (Direct Candidate): ভোটার তার নিজ এলাকার একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেন। এখানে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনি সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। (এটি আমাদের বর্তমান পদ্ধতির মতো)।
দ্বিতীয় ভোট (Party List):
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটার তার পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। এই ভোটের শতাংশ ঠিক করে দেয় সংসদে ওই দলটি মোট কতটি আসন পাবে।
কেন এটি সেরা পদ্ধতি বলে গণ্য হয়?
এলাকার প্রতিনিধি নিশ্চিত করা: ভোটাররা জানেন তাদের এলাকার সমস্যার কথা সংসদে বলার জন্য একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি আছেন।
ভোটের সঠিক প্রতিফলন: ধরুন, একটি দল সারা দেশে অনেক ভোট পেয়েছে কিন্তু কোনো এলাকাতেই তাদের প্রার্থী জিততে পারেনি। বর্তমান পদ্ধতিতে তারা একটি আসনও পায় না। কিন্তু জার্মানির পদ্ধতিতে, দ্বিতীয় ভোটের শতাংশ অনুযায়ী তারা সংসদে আসন পাবে। এতে মানুষের একটি ভোটও বিফলে যায় না।
ভারসাম্য রক্ষা: সরাসরি জয়ী প্রার্থী এবং দলীয় তালিকার প্রার্থীদের সমন্বয়ে সংসদ গঠিত হয়, যা গণতন্ত্রকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশে এটি প্রয়োগ করলে যা ঘটবে:
যদি বাংলাদেশে ৩০০ আসনের জন্য এই পদ্ধতি নেওয়া হয়:
১৫০ জন নির্বাচিত হবেন সরাসরি এলাকাভিত্তিক ভোটে।
বাকি ১৫০ জন নির্বাচিত হবেন রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া ভোটের শতাংশের ভিত্তিতে (দলীয় তালিকা থেকে)।
এতে যেমন যোগ্য সংসদ সদস্য পাওয়া যাবে, তেমনি ছোট দলগুলোর অবদানও মূল্যায়িত হবে।