28/08/2026
২০০৬ সালে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন বন্ধক বিষয়ক একটি বিষয় যুক্ত করে একটি মাত্র ধারা (ধারা ৫৯) সর্বশেষ সংশোধিত হয়েছিল। তার আগে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সংশোধনী এসেছিল ২০০৪ সালে। সেই বার আইনটিতে ধারা ৫৩ বি, ৫৩ সি, ৫৩ ডি, ৫৩ ই, ৫৪এ প্রথম বারের মতো সংযুক্ত করা হয় এবং ধারা ৫৯ এর মধ্যে সরকার, তফশীল ভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বত্বের দলিল জমা রেখে বন্ধকের বিধান (Mortgage by deposit of title-deeds) সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করা হয়।
আজ আবার প্রায় ২০ বছর পর ২০২৬ সালে এসে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি পুনরায় সংশোধিত হলো।
মূল আইনটিতে ১৩৭টি ধারা আছে এবং এই আইনের মূল বিষয়বস্তু মূলত সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া (Modus Operandi of Transfer of Property)। এই আইনের বাইরেও বিভিন্ন আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া বলা আছে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন অনুযায়ী ০৫ ভাবে মূলত সম্পত্তি হস্তান্তর করা যায়। সম্পত্তি হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া গুলোর মধ্যে আছে বিক্রয়, বন্ধক, ইজারা, বিনিময় এবং দানপত্র।
বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় দেখা যেত রক্ত সম্পর্কের ব্যক্তিদের মধ্যে Doctrine of Three Degree অনুযায়ী যখন তিনটি প্রজন্মের মধ্যে সম্পত্তি দান করা হতো পরবর্তীতে সম্পত্তি দানকারী ব্যক্তি দানগ্রহনকারী ব্যক্তি কর্তৃক হেনস্তার স্বীকার হতেন এবং সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় পতিত হতেন। তাই বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় আইনে এমন একটি নিয়ম করা প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল যেন সম্পত্তিটি যিনি দান করছেন তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন তিনি ততদিন যেন সম্পত্তিটি ভোগ করতে পারেন এবং তিনি সম্পত্তি হস্তান্তর করে যেন জীবিত অবস্থায় নিঃস্ব অবস্থায় পতিত না হন এবং তার প্রয়োজন হলে তিনি যেন এই হস্থান্তর ও বাতিল করতে পারেন।
এবার ২০২৬ সালে এসে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ১২২ক এবং ১২২খ নামে দুইটি নতুন বিধান যুক্ত হলো। সম্পত্তি দান (Gift) করার সময় দাতা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার রেখে দিতে পারবেন কি না এবং সেই দান পরে বাতিল বা পরিবর্তন করা যাবে কি না এবং বাতিল করা গেলে বাতিল করার নিয়ম কি হবে সেই বিষয়গুলো এবার আইনটিতে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশ হাইকোর্টের Civil Revision No. 3313 of 2005 মামলার মূল ঘটনাটি এ রকম ছিলো যে সম্পত্তির দাতা হেবা করার পর জীবিত অবস্থায় পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার বা বাতিল করে সম্পত্তি অন্যভাবে হস্তান্তরের চেষ্টা করেছিলেন। আদালত সেই পরবর্তী হেবা প্রত্যাহার বা বাতিল করার সুযোগ দেন নি কেননা হেবা দলিল নিবন্ধন হওয়ার হওয়ার পর আইনে আর নতুন ভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের নিয়ম ছিলো না কিন্তু
আমরা চিন্তা করি যদি এই মামলাটি যদি এই সময় দায়ের হতো তাহলে ফলাফল কিন্তু অন্য রকম আসতে পারতো যেহেতু আইনে সংশোধনী হয়েছে।
এবার ২০২৬ সালে কি সংশোধনী আসলো ?
ধারা ১২২ক ভোগের অধিকার রেখে সম্পত্তি দান
🟥 সম্পত্তির দাতা নিজের জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগের অধিকার রেখে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। অর্থাৎ সম্পত্তির মালিকানা অন্যকে দান করলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তিটি ব্যবহার বা ভোগ করতে পারবেন।
🟦 এই বিশেষ সুবিধাটি প্রযোজ্য হবে যখন দানটি বাবা বা মা তার সন্তান বা সন্তানদের,
দাদা বা দাদী বা নানা বা নানী তার নাতি নাতনিদের, সন্তান তার বাবা-মা বা দাদা-দাদী বা নানা-নানী অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে করা হয়। এই বিষয়টি মুসলিম আইনের সুপ্রাচীন বিখ্যাত বই Mulla's Principles of Mahomedan Law বইয়ে Doctrine of Three Degree হিসেবে কিছুটা আলোচনা আছে।
🟥 স্থাবর সম্পত্তি (যেমন জমি/বাড়ি / Immovable Property) হলে এই ধরনের দান রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ঘোষণাও দিতে হবে।
🟪 দানগ্রহীতা (Donee) দাতার জীবদ্দশায় মারা গেলে, সম্পত্তি তার আইনগত উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যাবে। তবে দাতা যে জীবনকালীন ভোগের অধিকার রেখে গিয়েছিলেন, সেটি দাতার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই বিধানটির মধ্যে আমরা Muslim Family Laws Ordinance 1961 এর ধারা ০৪ এর Doctrine of Spes Succession এর কিছুটা ছোয়া দেখতে পাই তবে ২০২৬ সালের সংশোধনীটিকে MFLO 1961 এর প্রভাবমুক্ত বলতে হবে।
🟦 এই পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরকে আইনে একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হবে। এর ফলে প্রচলিত হেবা (Heba) বা অন্য বৈধভাবে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি বাতিল বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এই বিধানটি লেখার প্রয়োজন পড়েছে কেননা মুসলিম আইনেও হেবা সম্পর্কিত বিশেষ নিয়ম আছে। The Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937এর ০২ ধারা অনুযায়ী আমাদের পারিবারিক জীবনের অনেক গুলো ক্ষেত্রে শরীয়া আইন আমাদের জন্য প্রযোজ্য। Gift (Heba) কিন্তু তার মধ্যেই পড়েছে। তাই Gift (Heba) এর ক্ষেত্রে মুসলিম আইন ও প্রযোজ্য হবে।
ধারা ১২২খ দান বাতিল বা পরিবর্তন
সাধারণ নিয়ম হলো ১২২ক এর অধীনে দান রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে তা বাতিল করা যাবে না।
তবে দুটি বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আছে -
⬛ দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতি থাকলে ( Mutual Consent)
দাতা ও গ্রহীতা উভয়ে সম্মত হয়ে রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে দানটি পরিবর্তন, বাতিল বা দানের মাধ্যমে তৈরি অধিকার নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন যদি এর কারণ হয় প্রকৃত আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো বাস্তব প্রয়োজন।
🟦 একজনের সম্মতি পাওয়া সম্ভব না হলে
(Where consent of one party cannot be obtained)
যেমন - কেউ অপ্রাপ্ত বয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিক ভাবে অক্ষম, আইনগতভাবে অক্ষম বা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণে সম্মতি দিতে পারছেন না।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক বিষয়ক পড়তে চাইলে The Contract Act 1872 এর ধারা ১০, ১১ এবং The Majority Act 1875 এর ধারা ০৩ এখানে পড়া যেতে পারে।
নিখোঁজ ব্যক্তি বিষয়ক পড়তে চাইলে The Evidence Act 1872 এর ধারা ১০৭, ১০৮ পড়া যেতে পারে।
মানসিক ভাবে অক্ষম, আইনগতভাবে অক্ষম বিষয়ে পড়তে চাইলে The Limitation Act 1908 এর ধারা ০৬ - ০৯ আইনগত অপারগতা (Legal Disability) বিষয়ে পড়া যেতে পারে।
১২২খ ধারার দ্বিতীয় পরিস্থিতি উদ্ভুত হলে
অন্য পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে জেলা জজ দানটি পরিবর্তন, বাতিল বা সংশ্লিষ্ট অধিকার নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন তবে জেলা জজ এই ১২২খ এর অধীন আদেশ প্রদানের পূর্বে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলকে নোটিশ প্রদান করবেন। তিনি প্রয়োজন মনে করলে এই বিষয়ে অনুসন্ধান ও করতে পারেন এবং দেখতে পারেন দরখাস্তটি সৎ বিশ্বাসে দায়ের করা হয়েছে কি না। এখানে ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতি No person shall be condemned unheard অনুসরন করা হয়েছে।
তাই এই সংশোধনীর ফলে যা হলো বাবা-মা বা সন্তান বা নাতি-নাতনী বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার সময় দাতা সম্পত্তির মালিকানা দান করেও নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেটি ভোগ করার অধিকার রেখে দিতে পারবেন।
আর রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে সাধারণভাবে দান বাতিল করা যাবে না, তবে প্রকৃত প্রয়োজন ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সম্মতিতে বা আদালতের অনুমতিতে পরিবর্তন বা বাতিল করা সম্ভব।