25/03/2025
কেইস নং -১
"""""""""""""""
সাল ২০০৪।
তখন আমি সিনিয়র থেকে আলাদা হয়ে প্র্যাকটিস করছি। তারিখটা ঠিক মনে নেই। আমাদের একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট, তিনি আমাকে একটি মেয়ের পক্ষ হয়ে মামলা করতে বলেন।আমি সেই অ্যাডভোকেট সাহেব কে জিজ্ঞেস করলাম যে,আপনি কেন করছেন না। তিনি আমাকে বললেন যে, মেয়েটির বাবা সেই এলাকার চেয়ারম্যান এবং ওনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হন কিন্তু মেয়েটির সাথে অন্যায় হয়েছে। তাই তিনি আমাকে বলছেন মেয়েটির পক্ষে মামলা করতে। আমি পরবর্তীতে মেয়েটির সাথে কথা বলি এবং মেয়েটির স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতক এর মামলা দায়ের করি বিনা ফি তে। যথারীতি আসামীর বিরুদ্ধে সমন ইস্যু হয়। পরবর্তীতে হঠাৎ একদিন মেয়েটি আমার বাসায় আসে তার কোলের বাচ্চা কে নিয়ে আমার বাসায় আশ্রয় দেয়ার জন্য কিন্তু সে সময় তাকে আমার বাসায় আশ্রয় দেয়ার মত বা তার থাকার মত কোন ব্যবস্থা করতে না পেরে তার কাছ থেকে আমি বিস্তারিত জানতে চাইলাম। তখন সে আমাকে বলল যে, সে তার বাবার বাড়ি থেকে বিতাড়িত এবং সে তার বান্ধবীর বাড়িতে থেকে মামলা দায়ের করেছিল। এখন তার বাবা এবং তার স্বামী একত্রিত হয়ে তার বান্ধবীর বাড়িতে এসে তার বান্ধবীকে এবং তার পরিবারকে চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে মেয়েটিকে তার বাসা থেকে বের করে দেয়। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে এবং বিভিন্নভাবে তাদেরকে ভয় দেখায়। ফলে বান্ধবীর মেয়েটিকে তাদের বাসা থেকে অন্যত্র চলে যেতে বলে। এখন মেয়েটির যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমার মোবাইল থেকে তার অন্য এক বান্ধবীর নিকট ফোনে কথা বলে। সে তখন সেই বান্ধবীর বাসায় চলে যায়। পরবর্তীতে যথারীতি ধার্য তারিখে মেয়েটির স্বামী উপস্থিত হয় এবং আদালত তাকে আপোষের শর্তে জামিন প্রদান করেন। জামিন হওয়ার পরে মেয়েটির বাবা এবং মেয়েটির স্বামী আমার সঙ্গে কথা বলতে আসে আমার চেম্বারে। সেখানে কথাবার্তা বলার সময় মেয়েটির বাবা মেয়েটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে মেয়েটি পাগল, তার মাথার ঠিক নেই। মেয়েটির স্বামী অত্যন্ত ভালো কিন্তু মেয়েটি শুধু শুধু স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এইসব ঘটনা দেখে আমার পাশাপাশি যে সকল আইনজীবীরা ছিলেন তারাও বুঝতে পারে যে, কোন বড় ধরনের ঘটনা এটার মধ্যে লুকিয়ে আছে। মেয়েটির সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলি। তখন মেয়েটি জানায় যে, মেয়েটি তার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে যায় এবং তার ঘরে ছিল সৎ মা। তার আপন মা মারা যাবার পরে তার বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করেছিল। তো যখন সে তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে যায় তার সৎ মা ওনার বাবার বাড়িতে বেড়াতে যায়। মেয়েটি তখন বাড়িতে একা ছিল এবং বাড়িতে কাজের লোকজন ছিল। তার সৎ মায়ের অনুপস্থিতিতে একদিন রাতে মেয়েটি দেখতে পায় যে, তাদের কাজের এক মহিলার সঙ্গে তার বাবা কে অপ্রীতিকর অবস্থায়। মেয়েটি তখন তার সৎ মাকে উক্ত বিষয়টি ফোন করে জানায় কিন্তু তার বাবা মেয়েটাকে পাগল এবং উন্মাদ বলে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকার করে। পরবর্তীতে মেয়েটি তার শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। উল্লেখ্য যে মেয়েটির বাবা যথেষ্ট টাকা-পয়সার মালিক ছিলেন এবং কুমিল্লা শহরে উনার নিজের একটি ফ্ল্যাট ছিল। মেয়েটির স্বামী প্রায় সময় মেয়েটিকে উক্ত ফ্ল্যাট টি তার বাবাকে বলে তার স্বামীর নামে লিখিয়ে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করত এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করত। কিন্তু মেয়েটির উক্ত বিষয় তার বাবাকে এবং তার সৎ মাকে অবহিত করলেও তার বাবা কখনো সেটা বিশ্বাস করত না যে তার স্বামী এমন প্রস্তাব দিতে পারে কারণ সবার সামনে মেয়েটির স্বামী খুব ভদ্র এবং খুব ভালো ব্যবহার করত। মেয়েটি কিছুতেই তার স্বামীর উক্ত প্রস্তাব সম্পর্কে তার পরিবারকে বোঝাতে পারত না। যার ফলশ্রুতিতে সে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয় এবং সে মামলার দায়ের করবে বলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। তার বাবার বাড়িতেও তাকে ঠাই দেয়া হয়নি। উক্ত বিষয়ে আইনজীবীগণ শোনার পরে মেয়েটির বাবাকে এবং মেয়েটির সৎ মায়ের নিকট জিজ্ঞাসাবাদ করি। মেয়েটির সৎ মা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এবং এও বলে যে তিনি নিজেও জানেন যে তার স্বামী কাজের মহিলার সাথে সম্পর্কে জড়িত আছে।
পরবর্তীতে অনেক আইনজীবীর সহযোগিতায় এবং মেয়েটির বাবা চেয়ারম্যান সাহেবকে উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি ঘটনা অস্বীকার করেন তবে মেয়েটিকে আর কখনো নির্যাতন করবে না এবং তার স্বামীকে উক্ত ঘটনা জিজ্ঞাসা করে ঘটনার সত্যতা সে স্বীকার করে এবং মুচলেকা দিয়ে মেয়েটিকে আদালত থেকে তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যায়। আসলে একটা মেয়ে অসহায় হয় তখনই যখন তার পরিবার তার সমস্যার দিনে তার পাশে না থাকে। একজন বাইরের লোক বা অপরিচিত বা কম পরিচিত আত্মীয় সবাই একটা মানুষকে দোষারোপ করতে পারে অথবা তার প্রতি অসহযোগিতা করতে পারে কিন্তু যদি নিজের পরিবারের লোক সহযোগিতা না করে, তার বিপদে পাশে না থাকে তাহলে এর চেয়ে অসহায় অবস্থা মনে হয় আর নেই।
আমি আইনজীবী হিসেবে এখনো সেই ঘটনাটি আমার মনে দাগ কাটে এবং মনে পড়ে। মেয়েটি তার বাবার অনৈতিক ঘটনা দেখে ফেলায় একটি মেয়ে পাগল বলে সাব্যস্ত হয় বাবার দ্বারা এবং এই সুযোগে তার স্বামী তার উপরে নির্যাতন করে। আসলে মেয়েরা যদি অসহায় হয় তাহলে সর্ব ক্ষেত্রেই অসহায় হয়।