19/06/2026
কমলাপুর রেল স্টেশনে ১৮-১৯ বছরের দুই তরুণ, সুজন ও রাকিব ধরা পড়ে একটি বাজারের থলিতে থাকা এক শিশুর রক্তাক্ত মাথাসহ। পুলিশের অকথ্য নির্যাতন ও প্রলোভনের মুখে তারা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয় যে, তারা চাঁদা আদায়ের জন্য শিশুটিকে খুন করেছে এবং ধড়টি গাজীপুরের শালবনে পুঁতে রেখেছে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে শালবন থেকে একটি কঙ্কাল উদ্ধারও করা হয়।
অতঃপর শুরু হয় বিচার ব্যবস্থার এক অন্ধকার অধ্যায়। এই সাজানো মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত সুজন ও রাকিবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। আসামীদের নিজস্ব উকিল না থাকায় স্টেট ডিফেন্স লয়ার মামলাটি পরিচালনা করেন, যার চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণে আসামীদের প্রতি হওয়া নির্যাতনের কথা আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়নি। জেলখানায় বিচারের অপেক্ষায় ১০ বছর এবং ফাঁসির আদেশে ডেথ সেলে আরও ১০ বছর—মোট ২০টি বছর বিনা অপরাধে পার করে দেয় এই দুই নিরীহ তরুণ।
অবশেষে ত্রাতা হয়ে আসেন হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চের এক সিনিয়র বিচারপতি। নিজের ৪১ বছরের কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার মাত্র চারদিন আগে তিনি এই মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের মামলার নথিটি পর্যালোচনার জন্য বাড়িতে নিয়ে যান। রাত জেগে প্রতিটি পাতা খুঁটিয়ে পড়ার পর তিনি ভয়ংকর কিছু অসামঞ্জস্য খুঁজে পান। প্রথম পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা ছিল বিচ্ছিন্ন মাথাটি ৮ বছরের এক সদ্য মৃত ছেলে শিশুর, অথচ শালবন থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি ছিল ১৪-১৫ বছরের এক অজ্ঞাত ব্যক্তির, যার লিঙ্গও শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না!
মামলার নথিতে থাকা একটি পুরনো খবরের কাগজের ক্লিপ থেকে বিচারপতি জানতে পারেন, ঘটনার দিন কমলাপুরে ট্রেন দুর্ঘটনায় কাটা পড়ে এক বালকের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।অর্থাৎ, সুজন ও রাকিব কোনো খুন করেনি! শুধুমাত্র পুলিশ নিজেদের পদোন্নতি এবং কোটা পূরণের লোভে এই সাজানো মামলা ও ভুয়া চার্জশিট তৈরি করেছিল। এই মামলায় ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৮ জনই ছিল পুলিশের লোক, কিন্তু ৮ বছর পর শুধুমাত্র তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাড়া আর কেউই সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত হয়নি।
বিচারপতি দ্রুত একজন 'অ্যামিকাস কিউরি' (আদালতের বন্ধু) হিসেবে অ্যাডভোকেট মিস্টার মনিরুজ্জামানকে নিয়োগ দেন। তিনি আদালতে ২০ বছর আগের ১০টি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার শিরোনাম উপস্থাপন করে কমলাপুরের সেই ট্রেন দুর্ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করেন। অবশেষে নিজের বিদায়ী কর্মদিবসে সিনিয়র বিচারপতি সুজন ও রাকিবকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন এবং মিথ্যা সাক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলও জানান যে তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করবেন না।
গল্পের শেষটা কান্নার, তবে আশারও। ৪০ বছর বয়সে যেদিন এই দুজন জেল থেকে মুক্তি পায়, তাদের স্বাগত জানাতে কোনো পরিবার জেলগেটে ছিল না। কিন্তু সেই অ্যামিকাস কিউরি মিস্টার মনিরুজ্জামান নিজে জেল গেটে উপস্থিত হন। তাঁকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ওঠে সুজন আর রাকিব, যাদের যৌবনের সেরা ২০টি বছর কেড়ে নেওয়া হয়েছে কেবল কিছু মানুষের লোভের কারণে। মিস্টার মনিরুজ্জামান তাদের নিজ বাড়িতে নিয়ে যান এবং দুটি সেলাই মেশিন কিনে দেন। আজ তারা সেই অন্ধকার অতীত ভুলে দর্জির কাজ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে।
( সাবেক বিচারপতি Krishna Debnath ম্যাডামের প্রমাণিত - অপ্রমাণিত অনুষ্ঠান থেকে নেয়া)
আইনের মজাটাই এখানে। চাইলেই আপনি সত্যিটা উৎঘাটন করতে পারবেন।