17/01/2026
এ বছর Code of Criminal Procedure (Amendment) Ordinance, 2025 এবং Code of Criminal Procedure (Second Amendment) Ordinance, 2025 প্রণয়নের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ কে যুগোপযোগী এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে উল্লেখযোগ্য সংশোধনী আনা হয়েছে।
১) ম্যাজিস্ট্রেটের সাজা দেওয়ার ক্ষমতা:
ধারা ৩২ সংশোধনের মাধ্যমে ম্যজিস্ট্রেট আদালতের অর্থদন্ড প্রদান করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এখন সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা; দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সর্বোচ্চ তিন লক্ষ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সর্বোচ্চ দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড প্রদান করতে পারবে।
২) গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিধান:
সাধারন গ্রেপ্তার:
গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নতুন ধারা ৪৬ক, ৪৬খ, ৪৬গ, ৪৬ঘ, ৪৬ঙ সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ধারাগুলোর গুরত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নীচে উপস্থাপন করা হলোঃ
• গ্রেপ্তার করার সময়, গ্রেপ্তাররকারী পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য যে কোনো ব্যক্তি তার পরিচয় প্রকাশ করবে।
• গ্রেপ্তার সময় গ্রেপ্তার স্মারক তৈরী করবে, যা একজন সাক্ষী দ্বারা সত্যায়িত হবে। (গ্রেপ্তার স্মারক সংক্রান্ত ফরম ৫ নং তফসিলে সংযুক্ত করা হয়েছে)
• বাসস্থান ছাড়া অন্য কোথাও থেকে গ্রেপ্তার করলে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির পরিবারকে যতদ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তার সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি ইচ্ছাপোষণ করলে, তাকে ১২ ঘন্টার মধ্যে তার পছন্দমতো আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার অথবা নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ প্রদান করতে হবে। [ধারা ৪৬ক]
• গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সরকারি রেজিস্টারে একটি এন্ট্রি লিপিবদ্ধ করা হবে, যেখানে গ্রেফতারের কারণ, তথ্যদাতা বা অভিযোগকারীর নাম ও বিবরণ, ক্ষেত্রমত যাকে গ্রেফতারের বিষয়ে অবহিত করা হইয়াছে সেই আত্মীয় বা বন্ধুর নাম ও বিবরণ, এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি যে কর্মকর্তার হেফাজতে আছেন তার নাম ও বিবরণ উল্লেখ থাকবে। [ধারা ৪৬খ]
ওয়ারেন্ট ব্যতীত গ্রেপ্তার: ধারা ৫৪ সংশোধন করে পূর্বে যেখানে ৯ টি ক্ষেত্রে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা যেত, সেখানে এখন ১১ টে ক্ষেত্রে করা যাবে। মূলত এই ধারার প্রথম ক্লজটাকে ভেঙে এখন তিনটি ক্লজ করা হয়েছে এবং এগুলোর বিস্তারিত প্রয়োগ আরো নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
ধারা ৫৪ক নতুন করে সংযুক্ত করা হয়েছে। এখন থেকে কাউকে বিনা ওয়ারেন্টে কাউকে গ্রেপ্তার করলে, গ্রেপ্তারের সময় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে অবশ্যই তার গ্রেপ্তারের কারন জানাতে হবে।
এরপর ধারা ৬৭-র পরে নতুন ধারা ৬৭ক সংযুক্ত করা হয়েছে। কোন কর্মকর্তা যদি কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিধানবলী ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবহেলাবশত মান্য না করে তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালত, যার সামনে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, উক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সার্ভিস রুলস অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
৩) সমন জারী:
ধারা ৬৯ সংশোধন করে প্রচলিত সমন জারির পদ্ধতির পাশাপাশি এসএমএস, ভয়েস কল এবং ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং সেবার মাধ্যমেও সমন জারি করার বিধান যোগ করা হয়েছে। ধারা ৭০ থেকে পুরুষ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরিবারের যেকোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিকট সমন জারি করা যাবে।
৪) আটক সংক্রান্ত বিধান: ধারা ১৬৭(২)-এ নতুন শর্ত সংযুক্ত করা হয়েছে। কোন ম্যাজিস্ট্রেট কোন নির্দিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বমোট পনেরো দিনের বেশি সময়ের জন্য পুলিশ হেফাজতে (police custody) আটক রাখার অনুমতি দিতে পারবেন না। এর বেশি কাউকে আটক রাখার প্রয়োজন হলে তাকে স্বশরীরে অথবা ইলেকট্রনিক ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করলে ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত ব্যক্তিকে বিচারিক হেফাজতে (judicial custody) আটকের আদেশ দিতে পারবেন। এখানে বিচারিক হেফাজত বলতে পুলিশ হেফাজত ব্যতিত অন্য যেকোনো হেফাজতকে বুঝাবে।
উপধারা ২ক সংযুক্ত করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে রিমান্ডে পাঠানোর আগে এবং পরে অভিযুক্ত ব্যক্তির মেডিকেল পরীক্ষার আদেশ দিতে পারে এবং মেডিকেল রিপোর্টে যদি অভিযুক্তকে নির্যাতন করার আলামত পাওয়া যায় তাহলে তিনি আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
ধারা ১৬৭ক সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্য কোন মামলায় আটক কাউকে shown arrest দেখাতে কি কি নিয়ম পালন করতে হবে তা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরো বলা হয়েছে যে, পুলিশ ফরোয়ার্ডিং দেখে যদি মনে হয় প্রতিরোধমূলক কোন আইনে আটক দেখানোর জন্যে আটক করা হয়েছে, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত ব্যক্তিকে বিচারিক হেফাজতে আটক রাখার আদেশ দিবে না।
৫) অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন:
পুলিশ প্রতিবেদন সংক্রান্ত ধারা ১৭৩-এর পর ধারা ১৭৩ক সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ধারামতে, কোন মামলার তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুলিশ কমিশনার বা জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট অথবা তদন্ত তত্ত্বাবধানকারী সমমর্যাদার অন্য কোনো কর্মকর্তা, তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিতে পারেন। দাখিলকৃত অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে যদি প্রকাশ পায় যে কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই, তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সেই প্রতিবেদন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দাখিল করতে নির্দেশ দিতে পারেন এবং এমন প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর ম্যাজিস্ট্রেট বা ট্রাইব্যুনাল, যদি সন্তুষ্ট হন, উক্ত অভিযুক্তকে অব্যাহতি প্রদানের আদেশ দিতে পারেন।
৬) তদন্তের সময়:
তথ্য প্রাপ্তির তারিখ হতে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। তা করা সম্ভব না হলে, তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার ডায়েরিতে বিলম্বের কারণ লিপিবদ্ধ করবেন, নির্দিষ্ট কারণ ও প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সময় উল্লেখ করে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করবেন। দাখিলকৃত আবেদন বিবেচনা করে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশের মাধ্যমে তদন্তের সময় যুক্তিসংগত বলে বিবেচিত পরিমাণে বৃদ্ধি করতে। [ধারা ১৭৩খ]
৭) মিথ্যা, তুচ্ছ বা হয়রানিমূলক অভিযোগ:
ধারা ২৫০ সংশোধন করে কেউ মিথ্যা, তুচ্ছ বা হয়রানিমূলক অভিযোগ করলে তার বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্ষতিপূরনের পরিমান ৫০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থদন্ডের পরিমান ও বৃদ্ধি করে ১ লক্ষ টাকা করা হয়েছে।
৮) অবৈধ সমাবেশের অপরাধ আপসযোগ্য:
ধারা ৩৪৫-এ সংশোধন করে দন্ডবিধির ১৪৩ ধারায় বর্ণিত অবৈধ সমাবেশের অপরাধকে আপসযোগ্য করা হয়েছে।
৯) জামিন সংক্রান্ত বিধান:
ধারা ৪৯৮-এ উপধারা ২ সংযুক্ত করা হয়েছে। যেকোনো আদালত অভিযুক্তকে জামিনে মুক্তি প্রদানকালে তার পলায়ন রোধ করা বা তার সদাচরণ নিশ্চিত করার জন্য যুক্তিসংগত ও ন্যায়সঙ্গত শর্ত আরোপ করতে পারবে মর্মে বিধান যোগ করা হয়েছে।
এখন থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বশরীরে, অথবা তার আইনজীবীর মাধ্যমে, অথবা অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে বেইল বন্ড দাখিল করতে পারবেন। [ধারা ৪৯৯(৩)]