05/11/2025
‘সন্তানের জিন্মাদারী’ এবং ‘সন্তানের ভরণপোষণ’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে সম্প্রতি লক্ষ্য করলাম, বেশিরভাগ মানুষই একটি গুরুতর ভুল করছেন। তারা সন্তানের 'জিম্মাদারী' (Custody) এবং 'ভরণপোষণ' (Maintenance)- এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি ধারণাকে গুলিয়ে ফেলছেন।
জিম্মাদারী মানেই কি তার ভরণপোষণের পুরো দায়িত্ব? আবার, জিম্মাদারী না পেলে কি সন্তানের প্রতি আর কোনো দায়িত্ব থাকে না? প্রতিদিন প্রচুর ফোন, মেসেজ এবং পোস্টগুলোর কমেন্টেও পাচ্ছি একই ধরণের প্রশ্ন।
আসলে, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্ব শুধু আবেগ বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না, এটি সুনির্দিষ্ট আইনের দ্বারা নির্ধারিত। যখন একটি দম্পতির বিচ্ছেদ হয় বা তারা বিচ্ছেদে বাধ্য হন, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের সন্তান।
এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তৈরি হওয়া ভুল ধারণাগুলো দূর করা জরুরি। আপনার সন্তানের সঠিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে হলে, চলুন এই দুটি আইনি ধারণা একদম সহজ সরল ভাষায় পরিষ্কার করে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা:
জিম্মাদারী বনাম ভরণপোষণ-
বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আইন ও অভিভাবক এবং প্রতিপাল্য আইন অনুযায়ী, সন্তানের জিম্মাদারী ও ভরণপোষণ দুটি স্বতন্ত্র বিষয়:
সন্তানের জিম্মাদারী (Custody)-
জিম্মাদারী হলো সন্তানের দৈনন্দিন দেখাশোনা, লালন-পালন ও তার শারীরিক পরিচর্যার অধিকার। সাধারণত, শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণ (Welfare of the Child) নিশ্চিত করার জন্য আদালত এই সিদ্ধান্ত নেন।
জিম্মাদারীর বয়স সীমা (Hizanat):
মায়ের অধিকার: ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মা প্রাথমিক জিম্মাদারী বা 'হিজানত' পাওয়ার অধিকারী।
বাবার অধিকার: এই সময় (অর্থাৎ ছেলে সন্তানের সাত বছর ও মেয়ে সন্তানের বয়ঃসন্ধিকাল) পার হলে সাধারণত বাবা জিম্মাদারী পান।
তবে আদালত সব সময় সন্তানের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, তাই সন্তানের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য মাকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য জিম্মাদারী দিতে পারেন।
সন্তানের ভরণপোষণ (Maintenance)-
ভরণপোষণ হলো সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ইত্যাদির মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর জন্য আর্থিক সহায়তা।
ভরণপোষণের সয়স সীমা: জিম্মাদারী যার কাছেই থাকুক না কেন, বাবা সন্তানের সাবালকত্ব (১৮ বছর) অর্জন না করা পর্যন্ত বা সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত সন্তানের ভরণপোষণ দিতে আইনত বাধ্য। মেয়ের ক্ষেত্রে বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত বাবা ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। অর্থাৎ
ছেলে: সাবালক না হওয়া পর্যন্ত (১৮ বছর বয়স পর্যন্ত)।
মেয়ে: বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত।
কোন সন্তান প্রতিবন্ধী হলে, আদালত এ সময়সীমা আরও বর্ধিত করে নির্ধারণ করবেন।
ভুল ধারণা নিরসন: সন্তানের জিম্মাদারী মা পেলেও, বাবা ভরণপোষণের আর্থিক দায় থেকে মুক্ত হন না। ভরণপোষণ একটি অবিচ্ছেদ্য আইনি দায়িত্ব।
আবারও শুনুন, জিম্মাদারী হলো সন্তানের লালন-পালনের অধিকার আর ভরণপোষণ হলো সন্তানের আর্থিক নিরাপত্তা। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় এবং দুটি নির্ধারণের বয়সও সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আপনার করণীয়:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আইনি পদক্ষেপও ভিন্ন হবে। সন্তানের কল্যাণের জন্য জিম্মাদারী সংক্রান্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত খুবই সংবেদনশীল। সঠিক আইনি পদক্ষেপ নিতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অতি প্রয়োজনীয় আইনকানুন জানতে এবং আরও আইনি পরামর্শ পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
সম্ভব হলে শেয়ার করে আপনার বন্ধু-স্বজনদেরও এ বিষয়ে সচেতন করুন।
#তালাক_আইন #পারিবারিক_আইন #জিম্মাদারী #ভরণপোষণ