07/09/2026
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ২০২৬
সম্পত্তি দিয়ে দিলেন, তবুও আপনাকে ঘর ছাড়তে হবে না। ১৪৪ বছরের পুরনো আইনে যা বদলানো হয়েছে।
------------------------------------------
একটি পরিচিত গল্প দিয়ে শুরু করা যাক নরসিংদীর আলহাজ্জ করিম সাহেব সারাজীবন পরিশ্রম করে একটা দোতলা বাড়ি বানিয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে ভাবলেন — ছেলে রাকিব তো সব দেখাশোনা করছে, ওকেই বাড়িটা হেবা করে দিই। দলিল হলো, রেজিস্ট্রি হলো। রাকিব মালিক হয়ে গেল।
দুই বছর না যেতেই ছেলের বউয়ের সাথে করিম সাহেবের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল। একদিন রাকিব বাবাকে ডেকে বলল — "আব্বা, আপনি বড় ভাইয়ের কাছে চলে যান।"
করিম সাহেব অবাক হয়ে ভাবলেন — "কিন্তু বাড়িটা তো আমি বানিয়েছি! আমার কি কোনো অধিকার নেই?"
আইনজীবীর কাছে গেলেন। আইনজীবী মাথা নিচু করে বললেন — "দুঃখজনক হলেও সত্য, আপনি যখন হেবা করেছেন, তখনই মালিকানা শেষ। আইনের চোখে এখন বাড়িটা রাকিবের।"
এই কষ্টের গল্পটা বাংলাদেশে হাজারবার ঘটেছে। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে এই গল্পের শেষটা বদলে যাবে।
Transfer of Property Act ১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা বানিয়েছিল। আইনটা খারাপ ছিল না — কিন্তু দানের ক্ষেত্রে একটাই নিয়ম ছিল: দিলে শেষ।
আইনের ধারা ১২২ বলতো — দান হলো স্বেচ্ছামূলক ও বিনামূল্যে সম্পত্তি হস্তান্তর। মানে একবার দিলে দাতার আর কিছু থাকে না। এটাই ছিল বিপদের গোড়া।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ সম্পত্তি বিরোধ মামলা হয় সম্পত্তির বণ্টন ও মালিকানা নিয়ে — এটা আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও সংসদে স্বীকার করেছেন। আর এই মামলাগুলোর বড় একটা অংশ আসে পিতামাতার সম্পত্তি দেওয়ার পরের পরিস্থিতি থেকে।
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদে Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026 পাস হয়েছে। এতে দুটো নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে — ধারা ১২২অ এবং ধারা ১২২ব।
এই দুটো ধারা একটা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। নাম হলো — "আজীবন ভোগস্বত্ব-সংরক্ষিত দান" বা Gift Reserving Usufruct।
সহজ বাংলায় বলতে গেলে এটা হলো এমন একটা দান — যেখানে আপনি সম্পত্তিটা দিচ্ছেন, কিন্তু যতদিন বাঁচবেন ততদিন সেটা ব্যবহার করার অধিকার আপনার থাকছে।
আর একটু বেশি সহজ করে বুঝুন ধরুন আপনার কাছে একটা আমবাগান আছে। আপনি ছেলেকে বললেন — "বাগানটা তোমার নামে লিখে দিচ্ছি। কিন্তু যতদিন বাঁচি, আমবাগানের আম আমি পাব, আমার জন্য থাকার জায়গা এখানে থাকবে।"
পুরনো আইনে এই কথাটার আইনি মূল্য ছিল না। এখন আছে।
করিম সাহেবের উদাহরণে ফিরে যাই। নতুন আইন থাকলে তিনি বলতে পারতেন — "রাকিব, বাড়িটা তোমার নামে লিখে দিলাম। কিন্তু ধারা ১২২অ অনুযায়ী যতদিন বাঁচি ততদিন এখানে থাকব। এই দলিলে সেটা লেখা আছে।" রাকিব আর তার বাবাকে বের করে দিতে পারবেনা।
প্রথমত — সম্পত্তি যাবে, ভোগ থাকবে। পিতামাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি বা স্বামী-স্ত্রী নির্দিষ্ট রক্ত সম্পর্কীয় ব্যক্তিদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন। কিন্তু দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগদখল করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত — দাতার আগে গ্রহীতা মারা গেলে কী হবে? ধরুন করিম সাহেব বাবা, রাকিব ছেলে। বাবা বাড়ি দিয়েছেন কিন্তু ভোগ রেখেছেন। বাবার আগে যদি রাকিব মারা যায় — তাহলে বাড়ির মালিকানা যাবে রাকিবের উত্তরাধিকারীদের কাছে। কিন্তু করিম সাহেবের আজীবন ভোগদখলের অধিকার তখনও বহাল থাকবে।
তৃতীয়ত — নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এই হস্তান্তর করতে হবে। মুখের কথায় হবে না।
চতুর্থত — বিক্রিতে দুজনের সম্মতি লাগবে। বাবা সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে ছেলের সম্মতি লাগবে। আবার ছেলে বিক্রি করতে চাইলে বাবার সম্মতি লাগবে। এটা একটা যৌথ লক।
পঞ্চমত — জরুরি চিকিৎসার বিশেষ বিধান। ধরুন বাবার হার্টের অপারেশন দরকার, টাকা নেই, সম্পত্তি বিক্রি করতে হবে — কিন্তু ছেলে সম্মতি দিচ্ছে না। তাহলে বাবা জেলা জজের কাছে যেতে পারবেন। জেলা জজ বিক্রির অনুমতি দিতে পারবেন।
ষষ্ঠত — সকল ধর্মের মানুষের জন্য। এই বিধান মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ — সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
সরকার Transfer of Property Act-এ দান সংক্রান্ত বিধান সম্প্রসারণ করেছে এবং এক্ষেত্রে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় থেকে নীতিগত অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে, যেখানে স্বীকার করা হয়েছিল যে দাতা ভোগদখল ধরে রেখেও দান বৈধ হতে পারে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টও ১৯৯৬ সালে Baby Ammal v. Rajan Asari মামলায় স্বীকার করেছে যে দাতা যদি সম্পত্তির মালিকানার সাথে জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার রাখেন, সেটা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
আইনজীবীদের এখনই যা ভাবতে হবে
নতুন আইনটা এসেছে, কিন্তু সহায়ক বিধিমালা এখনো আসেনি। তাই আদালতে এই আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে — এবং সেই প্রশ্নগুলো সুযোগও তৈরি করবে।
দলিলে কী কী লিখবেন? স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে এটি ধারা ১২২অ-এর অধীনে করা হচ্ছে। ভোগদখলের সুনির্দিষ্ট সীমা লিখুন — বাবা কি ভাড়া নিতে পারবেন? রক্ষণাবেক্ষণের দায় কার? কর কে দেবেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দলিলে না থাকলে পরে মামলা হবে।
সম্পত্তি বন্ধকের প্রশ্ন: ছেলে কি বাবার ভোগদখল চলাকালে সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক দিতে পারবেন? তৃতীয় পক্ষের ক্রেতার সুরক্ষা কী? এই প্রশ্ন গুলোর এখনো উত্তর নেই এবং নিশ্চই আদালতে আসবে।
শেষ কথা
Transfer of Property Act ১৮৮২ সালে যখন তৈরি হয়, তখন ব্রিটিশরা ভাবেনি বাংলাদেশের কোনো বৃদ্ধ বাবা সম্পত্তি দেওয়ার পর রাস্তায় বসবেন। ১৪৪ বছর পরে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সংসদ সেই ফাঁকটা বন্ধ করল। এটা একটা ভালো পদক্ষেপ — তবে এই আইনের মাঠ পর্যায়ের ব্যাখ্যা নির্ধারণে আইনজীবীদের ভূমিকাই হবে সবচেয়ে বড়।
লেখক: আমীরুল ইসলাম (খোকন), অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
সাবেক নির্বাহী সদস্য (২০২০-২১), সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ।