26/03/2025
২৬ মার্চ ২০২৫ ডঃ ইউনূসের চীন সফর সফল হোক
বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস প্রথম দ্বিপাক্ষিক সরকারি সফরে ২৬ মার্চ ২০২৫ চীন যাচ্ছেন। চীন বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতমধ্যেই অনেক ভালো। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগ, জ্বালানি ব্যবস্থা উন্নয়ন, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে। ’৭৫ পরবর্তী সময় থেকেই চীনা বাংলাদেশের উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখে চলেছে। এবছর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা আশা করি এই সফরটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে, অভিন্ন উন্নয়নের কাজকে এগিয়ে নিবে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য আরও সুবিধা বয়ে আনবে। আমরা এই সফর থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে সহযোগিতার বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত আশা করি:
১। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
সরঞ্জাম সংগ্রহ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী চীনা VT-5 লাইট ট্যাংক দিয়ে সজ্জিত, নৌবাহিনী চীনা ফ্রিগেট (যেমন C13B) ক্রয় করেছে এবং বিমান বাহিনী J-7 ফাইটার এবং K-8W প্রশিক্ষক বিমান ক্রয় করেছে।
কৌশলগত চুক্তিঃ চীনের সাথে বাংলাদেশের এমন একটি সামরিক কৌশলগত চুক্তি করা হোক, যেখানে বাংলাদেশকে সকল ধরণের সামরিক সহযোগিতা প্রদান করবে, আকাশে ও বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে। চুক্তির একটি বিশেষ অংশ এমন হোক যে, চীন কখনও বাংলাদেশকে আক্রমন করবে না আবার বাংলাদেশও চীনকে আক্রমন করবেনা, একই সাথে বাংলাদেশকে কোন বহিঃরাষ্ট্র আক্রমন করলে সেটা চীনকে আক্রমন করা হয়েছে বলে গণ্য হবে, চীনকে কেউ আক্রমন করলে তা বাংলাদেশকে আক্রমন করেছে বলে গণ্য করা হবে। তাহলে উভয় দেশ উভয় দেশকে সরাসরি সামরিক সহযোগিতা করতে পারবে।
২। অবকাঠামো নির্মাণ
ইতমধ্যেই চীনা আমাদের দেশে রাস্তা, ব্রিজ, টানেল প্রভৃতি নির্মাণে অনেক সহযোগিতা করেছে। কিন্তু তিস্তা নদীতে বাঁধ নির্মাণ, তিস্তা পাড়ের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাংলাদেশে ৬ টি মডেল শহর নির্মাণ এবং ৪টি আঞ্চলিক টিভি ষ্টেশন নির্মাণ কাজ বহুদিন থেকেই শুধু স্বপ্নই রয়ে গেছে। এছাড়াও দেশের সকল কৃষি খামার, গ্রাম ও শহর পুনঃনির্মাণে চীন রোল মডেল হিসাবে সহযোগিতা করতে পারে। এবার আমরা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করি।
৩। বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ
বাণিজ্য স্কেল: চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, ২০২২ সালেই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ US$25 বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ প্রধানত চীনা যন্ত্রপাতি ও টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি করে এবং তৈরি পোশাক, কাঁচা চামড়া, কাঁচা পাট রপ্তানি করে (বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যের উপর চীনের শূন্য-শুল্ক নীতির সুবিধা আছে)।
বাংলাদেশের ৩০ টি রপ্তানি প্রকৃয়াকরণ অঞ্চল এবং ১০০ টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের ব্যাবসায়িদের টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, জুতা তৈরি, সিরামিকসহ নানা বিষয়ে শিল্প কারখানা স্থাপনের বিষয়ে চীন ও বাংলাদেশ সরকার সুনির্দিষ্ট প্যাকেজ সুবিধা প্রদান করুক। যাতে চীনা কোম্পানিগগুলো এখানে বিনিয়গের জন্য আকৃষ্ট হয়।
৪। জ্বালানী এবং শক্তি সহযোগিতা
পায়রা ও মাতারবাড়ি কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ কেন্দ্র, দেশের বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ২০% পূরণ করতে পারে। কিন্তু এখানকার কয়লা আমদানি সব সময়ই রাজনীতির শিকার। জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কয়লা আমদানির বিষয়ে চীনের সাথে সমঝতা করা হোক।
নবায়নযোগ্য সবুজ শক্তিঃ জ্বালানী সাশ্রয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবেলায় চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। কিন্তু সোলার প্যানেল তৈরির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেয়া হোক। এতে ব্যক্তি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সহজ করবে একই সাথে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও মেটাবে।
৫। ডিজিটাল প্রযুক্তিগত সহযোগিতা
5G এবং যোগাযোগ: বাংলাদেশের 5G নেটওয়ার্ক নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত করা, মহাকাশে ইন্টারনেট, রেডিও, টেলিভিশন যোগাযোগ সক্ষমতা আরও বাড়াতে বাংলাদেশের সহযোগিতা করুক। প্রস্তাবিত ৪টি আঞ্চলিক টিভি ষ্টেশন নির্মাণ ও পরিচালনার কাজে গতি আসুক।
৬। শিল্প আপগ্রেডিং:
গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পে চীন বাংলাদেশে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি স্থানান্তর বাড়াতে পারে। চীন বাংলাদেশে শিল্প যন্ত্রাংশ তৈরির মাদার ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করার মাধ্যমে এই সহযোগিতা পূর্ণতা পেতে পারে। এব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করি।
৭। ঋণ সমস্যা:
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬% মাত্র আসে চীন থেকে। আমাদের জাতীয় উন্নয়নে এটি একেবারেই নগণ্য। আমরা আশা করি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য নানা স্থায়ী প্রকল্পে চীন তার ঋণ সহায়তা বাড়াবে।
৮। রোহিঙ্গা সমস্যা ৪ দেশীয় করিডোর নির্মাণঃ
রোহিঙ্গা সমস্যা যা শুরু থেকেই চীনের সহযোগিতায় সমাধান করা যেত, কিন্তু অনেক সময় চলে গেলেও সমাধান হয় নাই। এব্যাপারে আমরা চীনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করি।
বাংলাদেশের সাথে চীনের ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সর্বোচ্চ মাত্রায় নিতে চাইলে আমাদের অবশ্যই স্থল যোগাযোগ থাকতে হবে। "বেল্ট অ্যান্ড রোড" প্রকল্পের আওতায় মিয়ানমার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত’ স্থলপথ (অর্থনৈতিক করিডোর) নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত হতে পারে। এব্যাপারে আমরা চীনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করি।
৯। চিকিৎসা সহযগিতাঃ
আমরা বহুদিন থেকে বলে আসছি, চীন বাংলাদেশে একটি বড় আকারের বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করুক, চীনও তা চাচ্ছে। কন্তু কোন এক অদৃশ্য হাতের ছোঁয়াই তা হচ্ছে না। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে বাংলাদেশি রোগীদের প্রথম ব্যাচ গিয়েছে। তারা চিকিৎসাসেবায় সন্তুষ্ট।
আমাদের প্রত্যাশা, এবার আমাদের প্রধান উপদেষ্টার সফরের মাধ্যমে এসংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধান হবে এবং চীন বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করবে, যেন চীনের চিকিৎসাসেবা সেবা বাংলাদেশে থেকেই আমরা পেতে পারি।
১০। শিক্ষা সহযোগিতাঃ
বর্তমানে চীন শিক্ষা বিশ্বের এক উচ্চতম পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে অনেক ছাত্র চীনে লেখাপড়া করতে যাচ্ছে। চীন অনেক স্কলারশিপও দিয়ে থাকে। কিন্তু বহুবছর ধরে মাত্র ৫০/৫৫ জন ছাত্র সরাসরি স্কলারশিপ নিয়ে চীনে পড়তে যেতে পারে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও চীনের ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে লক্ষ্য রেখে এইসংখ্যা এখন নুন্যতম ২৫০ জন হওয়া উচিৎ। সেই সাথে বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে চীন আমাদেরকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করতে পারে। এমনকি বাংলাদেশে চীনাভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণে চীন বিশেষ প্যাকেজ সহযোগিতা দিতে পারে।
আমরা বিশ্বাস করি যে উভয় পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় এই সফর সফল হবে এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করবে। দুই দেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়বে। আমরা নতুন নতুন ক্ষেত্র সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করব।