19/05/2026
এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার, ভূমি) অফিসে কোনো জমির অবৈধ খারিজ (নামজারি) বাতিলের আবেদন করার পরও যদি তা বাতিল না করা হয়, তাহলে জমির প্রকৃত মালিক বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কিছু আইনগত ও প্রশাসনিক করণীয় রয়েছে। নিচে ধাপে ধাপে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—
১. প্রথমে বুঝতে হবে “অবৈধ খারিজ” বলতে কি বোঝায়
যেসব ক্ষেত্রে খারিজ অবৈধ হতে পারে, যেমনঃ
জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি করা
ভুয়া ওয়ারিশ দেখিয়ে খারিজ করা
প্রকৃত মালিককে না জানিয়ে খারিজ করা
আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও খারিজ করা
ভুল দাগ, খতিয়ান বা মালিকানা দেখিয়ে খারিজ করা
প্রতারণা বা তথ্য গোপন করে নামজারি নেওয়া
এসব ক্ষেত্রে খারিজ বাতিলের দাবি করা যায়।
২. এসি ল্যান্ড অফিসে লিখিত আবেদন করতে হবে
প্রথমে সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড অফিসে লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে।
আবেদনের সাথে যেসব কাগজ লাগবে
দলিলের কপি
খতিয়ানের কপি
পর্চা
খাজনার রসিদ
আদালতের আদেশ (যদি থাকে)
জালিয়াতির প্রমাণ
জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
আবেদনে যা উল্লেখ করবেন
কেন খারিজ অবৈধ
কিভাবে প্রতারণা হয়েছে
কোন আইনের লঙ্ঘন হয়েছে
খারিজ বাতিলের আবেদন
৩. শুনানিতে উপস্থিত থাকতে হবে
এসি ল্যান্ড সাধারণত উভয় পক্ষকে নোটিশ দিয়ে শুনানি করে।
শুনানিতে—
সব মূল কাগজ দেখাবেন
সাক্ষী থাকলে উপস্থাপন করবেন
জাল দলিল হলে তা উল্লেখ করবেন
আদালতে মামলা থাকলে জানাবেন
৪. এসি ল্যান্ড খারিজ বাতিল না করলে কি করবেন
যদি এসি ল্যান্ড অন্যায়ভাবে আবেদন খারিজ করে দেয় বা দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখে, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
৫. উচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল বা অভিযোগ
ক) ইউএনও (UNO) বরাবর অভিযোগ
এসি ল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযোগ করা যায়।
অভিযোগে উল্লেখ করবেন—
এসি ল্যান্ড আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়নি
শুনানিতে অনিয়ম হয়েছে
দুর্নীতি বা পক্ষপাতের অভিযোগ (প্রমাণ থাকলে)
খ) জেলা প্রশাসক (DC) বরাবর আবেদন
জেলা প্রশাসক ভূমি প্রশাসনের প্রধান হওয়ায় তার কাছে লিখিত অভিযোগ করা যায়।
ডিসি যা করতে পারেন
তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন
নথি তলব করতে পারেন
পুনঃশুনানির নির্দেশ দিতে পারেন
গ) বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগ
যদি জেলা প্রশাসনও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর অভিযোগ করা যায়।
৬. ভূমি আপিল বোর্ড বা রাজস্ব আদালতে প্রতিকার
যদি খারিজের আদেশ আইনবহির্ভূত হয়, তাহলে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল/রিভিশন করা যায়।
এক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া ভালো।
৭. দেওয়ানি আদালতে মামলা করা
অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রশাসনিক আবেদন যথেষ্ট হয় না। তখন দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হয়।
যেসব মামলা করা যেতে পারে
ঘোষণামূলক মামলা
দলিল বাতিলের মামলা
স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা
স্বত্ব ঘোষণা মামলা
দখল পুনরুদ্ধার মামলা
৮. জাল দলিল থাকলে ফৌজদারি মামলা
যদি জালিয়াতির মাধ্যমে খারিজ করা হয়ে থাকে, তাহলে ফৌজদারি মামলাও করা যায়।
প্রযোজ্য অপরাধ
জালিয়াতি
প্রতারণা
ভুয়া কাগজ তৈরি
সরকারি রেকর্ডে মিথ্যা তথ্য প্রদান
৯. দুর্নীতির প্রমাণ থাকলে দুদকে অভিযোগ
যদি প্রমাণ থাকে যে—
ঘুষ নিয়ে খারিজ করা হয়েছে
ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে
ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ খারিজ বহাল রাখা হয়েছে
তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা যায়।
১০. তথ্য অধিকার আইনে তথ্য সংগ্রহ
অনেক সময় অফিস নথি গোপন করে। তখন তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে সংগ্রহ করা যায়—
যেমনঃ
নামজারির আবেদনপত্র
শুনানির নোটিশ
আদেশের কপি
তদন্ত প্রতিবেদন
১১. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
💥শুধু খারিজ থাকলেই মালিকানা প্রমাণ হয় না
খারিজ বাতিল করতে হলে মূল মালিকানা প্রমাণ জরুরি।
💥দলিল, রেকর্ড ও দখল—সব মিলিয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দেয়।
💥দালাল বা ভুয়া কাগজ থেকে সতর্ক থাকতে হবে
মৌখিক অভিযোগ না করে সবসময় লিখিত আবেদন করবেন।
💥 পরামর্শ : যদি দেখেন—
১। এসি ল্যান্ড ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে না,
২। প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী,
৩। জাল দলিল রয়েছে,
৪ জমির মূল্য বেশি,
তাহলে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া নিরাপদ।
💥 সংক্ষেপে করণীয়-
১. এসি ল্যান্ড অফিসে লিখিত আবেদন
২. শুনানিতে প্রমাণ উপস্থাপন
৩. আবেদন খারিজ হলে ইউএনও/ডিসির কাছে অভিযোগ
৪. প্রয়োজনে আপিল/রিভিশন
৫. দেওয়ানি আদালতে মামলা
৬. জালিয়াতি হলে ফৌজদারি মামলা
৭. দুর্নীতি হলে দুদকে অভিযোগ
এভাবে ধাপে ধাপে এগোলে অবৈধ খারিজের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।