20/08/2026
হ্যাঁ। মুতা বিবাহ ও হিল্লা বিবাহ—দুটিকে আলাদা করে দেখতে হবে। কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং শিয়া-সুন্নি ফিকহে এ দুটির অবস্থান এক নয়।
বিয়ে তালাক যৌতুক উত্তরাধিকার আইনি সমস্যা ও সমাধান ০১৭১১৯২১৪১৬
১. মুতা বিবাহ (نِكَاحُ الْمُتْعَةِ)
মুতা হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক বিবাহ—যেমন এক মাস, এক বছর ইত্যাদি—যেখানে মোহর নির্ধারিত থাকে। ইমামিয়া/দ্বাদশী শিয়া ফিকহে এটি বৈধ বিবাহের একটি ধরন।
কুরআনের প্রধান আয়াত: ৪:২৪
فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً
বাংলা উচ্চারণ:
ফামাস্তামতা‘তুম বিহি মিনহুন্না ফা-আতূহুন্না উজূরাহুন্না ফারীদাহ।
অর্থের মূল বক্তব্য: নারীদের সঙ্গে বৈধভাবে উপভোগ/সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের নির্ধারিত মোহর প্রদান করতে হবে।
শিয়া ব্যাখ্যা: ইমামিয়া শিয়ারা ৪:২৪-এর “ইস্তামতা‘তুম”-কে মুতা বিবাহের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন। আয়াতটি রহিত হয়েছে—সুন্নি মতের এই দাবিকে তারা গ্রহণ করেন না।
সুন্নি মত
সুন্নি ফিকহের চার মাযহাবের প্রচলিত অবস্থান হলো—মুতা প্রথমদিকে অনুমোদিত হয়েছিল, পরে রাসুল ﷺ তা নিষিদ্ধ করেন; তাই বর্তমানে মুতা হারাম।
সহিহ মুসলিমে একাধিক বর্ণনায় মুতা প্রথমে অনুমোদিত হওয়ার কথা এবং পরে নিষিদ্ধ হওয়ার কথা এসেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে: সহিহ মুসলিম ১৪০৫c-তে জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তারা রাসুল ﷺ-এর সময়ে এবং আবু বকর (রা.)-এর সময়ে, এমনকি উমর (রা.)-এর সময়েও মুতা করতেন; পরে উমর (রা.) তা নিষেধ করেন।
অর্থাৎ “কে কখন নিষেধ করলেন এবং নবী ﷺ-এর চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা কখন হয়েছিল”—এটি ঐতিহাসিক হাদিস-আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শিয়া অবস্থান
বর্তমান দ্বাদশী শিয়া ফিকহে, যেমন আয়াতুল্লাহ সিস্তানির ফতোয়ায়:
মুতা বৈধ, তবে নির্দিষ্ট সময় ও মোহর অবশ্যই চুক্তিতে নির্ধারিত হতে হবে।
মুতার কিছু ফিকহি বৈশিষ্ট্যও স্থায়ী বিবাহ থেকে আলাদা—যেমন সাধারণভাবে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক উত্তরাধিকার থাকে না এবং স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার স্থায়ী বিবাহের মতো নয়।
সংক্ষেপে
বিষয় দ্বাদশী শিয়া সুন্নি
মুতা জায়েজ হারাম
সময় নির্ধারণ আবশ্যক প্রযোজ্য নয়
মোহর আবশ্যক —
৪:২৪ মুতা বৈধতার দলিল মুতা নয়/পরবর্তী নিষেধাজ্ঞায় রহিত
---
২. হিল্লা বিবাহ
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
কুরআনে “হিল্লা বিবাহ” নামে কোনো বিবাহের বিধান নেই। কুরআনে বলা হয়েছে, কোনো নারীকে তার স্বামী তৃতীয়বার তালাক দিলে সে প্রথম স্বামীর জন্য আর বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিবাহ করে। তারপর দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক দেয় বা বিবাহটি স্বাভাবিকভাবে শেষ হয়, তখন প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহের সুযোগ হতে পারে।
সূরা আল-বাকারা ২:২৩০
فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنۢ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُۥ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَآ أَن يَتَرَاجَعَا
বাংলা উচ্চারণ:
ফা-ইন তাল্লাকাহা ফালা তাহিল্লু লাহু মিন বা‘দু হাত্তা তানকিহা যাওজান গাইরাহু; ফা-ইন তাল্লাকাহা ফালা জুনাহা ‘আলাইহিমা আইঁ ইয়াতারাজা‘আ।
অর্থ:
“অতঃপর সে যদি তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তাহলে সে তার জন্য বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে। অতঃপর সেই স্বামী যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে উভয়ের পুনরায় একত্রিত হওয়ার ব্যাপারে কোনো অপরাধ নেই…”
তাহলে “হিল্লা” কোথা থেকে এলো?
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
কুরআন স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহের কথা বলেছে; প্রথম স্বামীর কাছে ফেরানোর উদ্দেশ্যে সাজানো/চুক্তিবদ্ধ দ্বিতীয় বিবাহের কথা বলেনি।
অর্থাৎ—
প্রথম স্বামী → তৃতীয় তালাক → নারী অন্য পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিবাহ করল → প্রকৃত দাম্পত্য জীবন হলো → পরে দ্বিতীয় স্বামী নিজ ইচ্ছায় তালাক দিল/বিবাহ শেষ হলো → ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামীকে পুনরায় বিবাহ করা সম্ভব।
কিন্তু—
“তুমি শুধু কয়েকদিনের জন্য তাকে বিয়ে করবে, সহবাস করবে, তারপর তালাক দিয়ে দেবে, যাতে সে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারে”—এই পরিকল্পিত হিল্লা সুন্নি হাদিসে কঠোরভাবে নিন্দিত।
ইবন মাজাহ ১৯৩৪-এ রাসুল ﷺ-এর নামে মুহাল্লিল (যে ব্যক্তি হিল্লার জন্য বিয়ে করে) এবং মুহাল্লাল লাহু (যার জন্য হিল্লা করা হয়)—উভয়ের ওপর লানতের বর্ণনা রয়েছে।
আর নাসাঈ ৩৪১৬-তেও মুহাল্লিল ও মুহাল্লাল লাহুর ওপর লানতের বর্ণনা এসেছে।
---
৩. সুন্নি ও শিয়া মতের তুলনা
বিষয় সুন্নি মত দ্বাদশী শিয়া মত
মুতা ❌ বর্তমানে হারাম ✅ জায়েজ
মুতা ৪:২৪-এর মাধ্যমে প্রমাণিত? না হ্যাঁ
তৃতীয় তালাকের পর অন্য পুরুষকে বিয়ে প্রয়োজনীয় শর্ত প্রয়োজনীয় শর্ত
পরিকল্পিত হিল্লা ❌ হারাম/কঠোরভাবে নিন্দিত ❌ বৈধ শরিয়তসম্মত পদ্ধতি নয়
স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহের পর বিচ্ছেদ হলে প্রথম স্বামীকে বিয়ে ✅ সম্ভব ✅ সম্ভব
একটি সূক্ষ্ম বিষয়
“হিল্লা” এবং “দ্বিতীয় বিবাহ” এক জিনিস নয়।
কুরআন দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত বিবাহকে শর্ত করেছে; কিন্তু পূর্বপরিকল্পিত “হিল্লা করানোর ব্যবসা” বা সাময়িকভাবে বিয়ে করে তালাক দেওয়ার ব্যবস্থা কুরআনের বক্তব্য নয়। সহিহ বুখারিতে আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনায়ও দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
সুতরাং সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:
> মুতা: শিয়া ফিকহে জায়েজ, সুন্নি ফিকহে হারাম।
হিল্লা: কুরআনে “হিল্লা” নামে কোনো প্রথা নেই; কুরআন ২:২৩০-এ তৃতীয় তালাকের পর প্রকৃত দ্বিতীয় বিবাহের বিধান দিয়েছে। পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা—বিশেষ করে শুধু প্রথম স্বামীর কাছে ফেরানোর উদ্দেশ্যে—হাদিসে কঠোরভাবে নিন্দিত।