Barrister Quazi Maruful Alam

Barrister Quazi Maruful Alam Barrister at Law, Advocate, Adjunct Associate Professor, Consultant, Human Rights & Policy Activist

14/04/2026

--------------বেওয়ারিশ কবর আর হিমুর দর্শন----------

হলুদ পাঞ্জাবিটা আজ একটু বেশিই হলদেটে লাগছে। বৃষ্টি নামবে নামবে করেও নামছে না। আকাশে মেঘেদের প্রচণ্ড ভিড়, ঠিক যেন নিউ মার্কেটের মোড়ের জ্যাম। মহাপুরুষদের মেঘ দেখে সময় কাটাতে হয়, আমি তা-ই করছি।
খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দেয়াল ঘেঁষে চলে এসেছি। এখানে এক সারিতে বেশ কিছু বেওয়ারিশ কবর। এদের ওপর কোনো নেমপ্লেট নেই, পরিচয়ের বালাই নেই। শুনলাম এরা সবাই 'জুলাই'-এর শহীদ। কারও কারও শরীরের রক্ত তখনো মাটি পুরোপুরি শুষে নিতে পারেনি। আজও তাদের আত্মীয়রা পাগলের মতো এক কবর থেকে অন্য কবরে প্রিয়জনের চিহ্ন খুঁজে ফিরছে।
আমি হাঁটছি, কিন্তু হঠাৎ কানে এল ফিসফাস শব্দ। শব্দটা বাতাস থেকে আসছে না, আসছে নিচ থেকে—ভিজে মাটির গভীর থেকে। কবরের লাশগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
একটা কণ্ঠ বলল, "কিরে ভাই, তুইও কি ভুল করে ফেললি? পরিবারকে ভুলে এই দেশের কথা ভেবে, পরিবর্তনের কথা ভেবে জীবনটা দিয়ে দিলাম। আমাদের জীবনের দাম যে রাষ্ট্রের কাছে এত সস্তা, সেটা আগে জানলে এই স্যাঁতসেঁতে মাটির নিচে শুতে আসার আগে দুইবার ভাবতাম।"
দ্বিতীয় কণ্ঠটা একটু ভারী। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "বাজারে নাকি এখন যুক্তি বিক্রি হয়? খুব সস্তায়? আমাদের বুকের রক্ত দিয়ে কেনা যুক্তিগুলো কি তবে নিলামে উঠে গেল? 'জান দেব কিন্তু জুলাই দেব না'—বলার মানুষগুলোও কি তবে হারিয়ে গেল?"
আমি শুনলাম। কিন্তু মহাপুরুষদের কানে কম শুনতে হয়। শুনলেও না শোনার ভান করতে হয়। গুম অধ্যাদেশ বাতিল, মানবাধিকারকে বস্তাবন্দি করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ কিংবা ব্যাংক ডাকাতির বৈধতা—এসব নিয়ে মাথা ঘামানো সাধারণ মানুষের কাজ। হিমু জগতের ঊর্ধ্বে।
আমি আকাশের দিকে তাকালাম। এক টুকরো ছাইরঙা মেঘ কেমন করে যেন একটা বিশাল ভাঙা দাঁড়িপাল্লার রূপ নিল। পাল্লাটা একদিকে হেলে আছে। বাহ্, কী চমৎকার! প্রকৃতির মধ্যেও কি তবে ইনসাফের অভাব দেখা দিল?
আমার পেছনে পেছনে একটা নেড়িকুকুর হাঁটছে। কুকুরটার নাম দিয়েছি 'লজিক'। সে বারবার কবরের দিকে তাকাচ্ছে আর অবাক হচ্ছে। তার চোখে একরাশ বিস্ময়। সে বোধহয় ভাবছে, এই দ্বিপদী প্রাণীগুলোর সমস্যাটা কী? কয়েকটা হাড় আর একবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পেলেই তো লেজ নেড়ে সুন্দর জীবন কাটানো যায়। অথচ এরা কেন যেন 'বাক-স্বাধীনতা', 'ইনসাফ' আর 'শিক্ষা' নামের কিছু বিমূর্ত জিনিসের জন্য জীবন দিয়ে দেয়! শেষমেশ পায় এই এক হাত মাটির অন্ধকার ঘর।
আমি পকেটে হাত দিলাম। একটা দশ টাকার নোট ছাড়া আর কিছুই নেই। লজিককে বললাম, "কী রে লজিক, লজিক খুঁজছিস? এই দেশে লজিক এখন কোল্ড ড্রিঙ্কসের চেয়েও সস্তা। যত্রতত্র পাওয়া যায়, আবার চাইলে ভ্যানিশও করে দেওয়া যায়।"
কবর থেকে আবার শব্দ এল। খুব ক্ষীণ।
"ভাই, আমাদের কেউ কি মনে রাখবে? নাকি আমরাও স্রেফ একটা সংখ্যা হয়ে ফাইলবন্দি হয়ে যাব?"
আমি উত্তর দিলাম না। মহাপুরুষরা উত্তর দেয় না, তারা রহস্যময় হাসি হাসে।
আমি হাঁটতে থাকলাম। আমার পেছনে লজিক, আর পেছনে পড়ে রইল একগুচ্ছ নিভৃত অভিমান, যা মাটির নিচ থেকে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। কেউ দেখছে না, আমি ছাড়া। কিন্তু আমি তো মহাপুরুষ, আমার দেখা না দেখা সমান কথা।
আশেপাশে কোথাও থেকে কদম ফুলের গন্ধ আসছে। অথচ এখন কদমের সময় না। হিমুর জগতে অসময়ে ফুল ফোটে, আর সময়ে মানুষ ঝরে যায়। অদ্ভুত এই দেশ, অদ্ভুত এর মানুষ। মহাপুরুষের কি খুব মন খারাপ করা উচিত? পকেটে হাত দিয়ে মনে হলো, মন খারাপ করার চেয়ে এক কাপ কড়া চা পাওয়া গেলে মন্দ হতো না। কিন্তু লজিক এখন চা বানাতে পারে না, সে কেবল কবরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

Address

House-10, Road-10, Block-H, Banani
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Barrister Quazi Maruful Alam posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share