25/04/2026
ব্যাংক একাউন্ট-এর নম্বর জানেন কিন্তু নিজের বাড়ির দাগ নম্বর জানেন তো!? যারা নিজের জমির দাগ নম্বরের খবর রাথেন না তাদের জন্য চরম দুঃসংবাদ।
প্রথমেই বলে নিই, ভূমি বুঝতে গেলে তফসিল' (schedule) বুঝতে হয়। '
তফসিল' হলো একটি জমির পরিচয় বা ঠিকানা।যেখানে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং মৌজার নামসহ (জেএল নং) দাগ নম্বর (প্লট নম্বর), সংশ্লিষ্ট খতিয়ান নম্বর ওনারশিপ রেফারেন্স নম্বর) এবং জমির পরিমাণ থাকে। আপনি যদি এই 'ঠিকানা বা পরিচয়' না বুঝেন, তাহলে 'ভূমির মালিকানা নিরাপত্তা' নিয়ে সচেতনতা খুব কঠিন। আপনার ভূমি আদৌ আপনার আছে কি না, আপনি জানবেন না।
আপনার অজান্তেই সম্পত্তি প্রতারণামূলকভাবে বা ভুলক্রমে অন্য ব্যক্তির মালিকানায় চলে যেতে পারে। এজন্য দেশের সকল মানুষের তার মালিকানাধীন সম্পত্তির ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু, এই ন্যূনতম জ্ঞান বা জানার অভাবে অনেক বড় জটিলতার জন্ম হয়।
সবার বোঝার সুবিধার জন্য বলে রাখি, ভূমির সকল হিসাব, যেমন, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, জমির মালিকানার তথ্য-সব কিছুই মৌজাভিত্তিক হয়।
মৌজা হলো, ভূমি ব্যবস্থাপনার সর্বনিম্ন জুরিসডিকশনাল একক বা সহজ কথায় যখন CS জরিপ করা হয় তখন থানাভিত্তিক এক বা একাধিক গ্রাম, ইউনিয়ন, পাড়া, মহল্লা আলাদা করে বিভিন্ন এককে ভাগ করে ক্রমিক নাম্বার দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর ন্যূনতম পাঁচ শতাধিক প্লট নিয়ে গঠিত বিভক্তকৃত এই প্রত্যেকটি একককে মৌজা বলে।
খতিয়ান হল, মৌজা ওনারশিপ রেফারেন্স নম্বর বা এক থেকে শুরু করে যতজন একক বা যৌথ মালিক একটি মৌজায় আছে তার ক্রমিক নম্বর।দাগ নম্বর হল, একটি মৌজার আওতায় প্রতিটি প্লট এর রেফারেন্স নম্বর। যে কথা বলছিলাম, 'ভূমির মালিকানা নিরাপত্তা' ইস্যুটি নিয়ে ভাবনাটা বরাবরই আমাদের অধিকাংশ জনসাধারণের মধ্যে কম।বাস্তবতা হল, কোনো এক অজানা কারণে অনেক শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও ভূমির মালিক হিসেবে যতটুকু ন্যূনতম মৌলিক ধারণা রাখা দরকার, ততটুকু খুব কম মানুষের মধ্যে আছে।কেন মানুষ কম জানে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সাদা চোখে কিছু আর্থ- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যু খুঁজে পাওয়া যায়। অধিকাংশ মানুষের কাছে ভূমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো খুব জটিল ও দুর্বোধ্য মনে হয়।
ভূমির মালিকানা ও পরিচয় নিরূপণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, জরিপ কার্যক্রম এবং দলিল সম্পাদন প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত শব্দগুলো একটু জটিল ও দুর্বোধ্য।যেমন, তফসিল, তসদিক, খানাপুরী, আনা, নামজারি, তহশিল, মৌজা, পর্চা, খতিয়ান, জেএল প্রভৃতি। তাছাড়া, পাঠ্যপুস্তক এ ভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এগুলো নিয়ে অধিকাংশের ধারণা সীমিত। স্বাক্ষর জ্ঞানের অভাবে সিংহভাগ সাধারণ মানুষ অন্যের (মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি) উপর নির্ভরশীল হয়ে যেভাবে, যতটুকু বুঝেছে তাদের কাছে ভূমি সংক্রান্তধারণা ততটুকু এবং সেভাবেই বিদ্যমান।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় এমনটা প্রচলন যে, পরিবারের প্রধানগণ পরিবারের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার মূল ভূমিকায় থাকবেন; সংশ্লিষ্ট সকল দলিলাদি বড় কর্তার সংরক্ষণে থাকবে; এবং নিয়মিত দেখভাল করবেন। ফলে, পরিবারের অন্যদের মধ্যে ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে মাথাব্যথা, উৎসাহ, আগ্রহ খুব বেশি জন্ম নেয়নি। বিশেষ করে একান্নবর্তী পরিবারের ছোটরা বা কেউ যদি নিজেদের সম্পত্তির মালিকানা বা দলিলাদি প্রভৃতি নিয়ে কথা উত্থাপন করেন, তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে তিনি 'স্বার্থপর' বলে বিবেচিত হন।
তার সতর্কতা বা সচেতনতা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ভিন্ন ম্যাসেজ পৌঁছায়। এ কারণে, যৌথ পরিবারের অনেক সচেতন মানুষ প্রায়শ এই বিতর্কে জড়াতে চায় না বলেই, পরিবারের মধ্যে এগুলো, যেমন, মোট সম্পত্তি কতটুকু; পরিবারের কার সম্পত্তির অধিকার কতটুকু; খতিয়ান, দলিল,রেকর্ড প্রভৃতি কার সংরক্ষণে আছে প্রভৃতি নিয়ে কথা উত্থাপন করতে নারাজ।এখনো অনেক মানুষ বলে, ‘আমি আমার পিতার সম্পত্তি চিনি না, কখনই যাই নি।' যেন জমি না চেনা বা জমির বিষয়ে মাথাব্যথা না থাকা গর্বের বা উদারতার পরিচায়ক।
আসলে পিতার মৃত্যুর আগে সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হতে পারে না বলে তাদের মধ্যে তার প্রাপ্যতার বিষয়ে চিন্তাভাবনা কম থাকে। কিন্তু এই উদাসীনতাই পরবর্তী সময়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও ঝগড়া-বিবাদের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।তাছাড়া, নারীদের প্রাপ্যতার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে উদাসীনতা, নারীদের নিজেদের অধিকার বিষয়ে অসচেতনতা এমন আরো অনেক কারণ আছে ভূমির মৌলিক ধারণা বিষয়ে ঔদাসিন্যের পেছনে। ভূমির মালিকানা নিশ্চিতকরণের জন্য দখল অন্যতম প্রধান শর্ত বলে ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। ফলে, দখল থাকলেই সেই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার নিরাপত্তা ইস্যুটি সবার কাছে এতটা গুরুত্ব পায় না।
তাছাড়া, ভূমির বিষয়গুলোতে আদিকাল থেকেই খুব জটিল, দুর্বোধ্য, এবং সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহৃত হয়েছে। ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে, যেমন, তফসিল, তসদিক, খানাপুরী, আনা, নামজারি, তহশিল, মৌজা, পর্চা, খতিয়ান, জেএল প্রভৃতি বিদেশি শব্দ প্রবর্তন বিধায় এ বিষয়গুলো মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। আমি জানি না, আনা প্রবর্তনের কি প্রয়োজন ছিল।
ভূমির পরিমাণ নির্ধারণের ইউনিট একই রকম হয়নি বা করা হয়নি অনেক আগে থেকেই।কারণ, ভূমির হিসাবটাকে সাধারণের কাছে বোধগম্য করার বদলে গোপন করা হয়েছিল শাসনের স্বার্থেই। তখন কি ব্রিটিশরা আনা, কড়া প্রভৃতি দ্বারা ভূমির পরিমাপ করত? এমনকি সেই আনার হিসাবটাও লেখা হয়েছে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে। ফলে, ভূমি সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
তাছাড়া পাঠ্যবইয়ে ভূমির বিষয়ে মৌলিক ধারণাসংক্রান্ত কোনো কিছুই পড়ানো হয়নি। অধিকন্তু এমনও হতে পারে ব্রিটিশ শাসন থেকেই সমাজের নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী ছাড়া প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এটিকে দুর্বোধ্য করে রাখা হয়েছে একটি বিশেষ অভিপ্রায় নিয়ে। এ নিয়ে অন্যদিন না হয় আলোচনা করা যাবে।যা বলছিলাম, এমন অনেক কারণেই সাধারণ মানুষ ভূমির মালিকানা নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শেখেনি। তাই, অধিকাংশের অসচেতনতার কারণে আজ যত জটিলতা, লাখ লাখ মামলা; এত অন্যায়-অবিচার, দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রভৃতি। প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ মামলার মূল কারণ ভূমিকেন্দ্রিক।
আমরা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ই-মেইলের পাসওয়ার্ড, ফেসবুক, ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং বা ডেবিট কার্ড প্রভৃতির নিরাপত্তা বিষয়ে কিন্তু বেশ সচেতন! নিয়মিত ব্যবহার করি; নিয়মিত আপডেট রাখি এবং স্টেটমেন্ট তুলছি নিয়মিত। কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবেছি যে, আমাদের মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তির স্টেটমেন্ট আমরা জানি কি না।
আমার পরিবারের সম্পত্তি আমি চিনি কি না, অথবা অন্য কেউ এটি চুরি করে নিয়ে নিলো কি না? আমার পিতার সম্পত্তিতে আমার অংশ কতটুকু, আমার বোনের প্রাপ্য আমি মিটিয়ে দিচ্ছি কি না, উত্তরাধিকারদের প্রাপ্যতার নিরাপত্তার খাতিরে বিধি মোতাবেক ভাগ-বাটোয়ারা করছি কি না, নিয়মিত খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) পরিশোধ করছি কি না, ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে রেকর্ড সংশোধন (নামজারি/খারিজ) করছি কি না- এমন আরও অনেক বিষয়েই আমাদের মধ্যে সচেতনতা নেই।জরিপ কার্যক্রম চলাকালীন ভূমির মালিক হিসেবে অনেক কিছুই করনীয় থাকে। সেগুলো সময়মতো সম্পন্ন করতে না পারলে পরবর্তী কার্যক্রম এ আরো জটিলতা তৈরি হয়।
রেকর্ড বা জরিপ সঠিকভাবে প্রকাশিত না হলে, ট্রাইবুনালে মামলা বাড়তে থাকে; রেকর্ড সংশোধন বিষয়ে ভূমি অফিস গুলোতে অন্য মোকদ্দমা বাড়তে থাকে; দখল, স্বত্ব প্রভৃতি নিয়ে সিভিল আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়ে। এমন আরো অনেক জটিলতা।অস্বীকার করবো না, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, যেমন, সেটেলমেন্ট অফিস, সাব রেজিস্ট্রার অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রভৃতি, যারা কিনা ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেক দায় এ ক্ষেত্রে রয়েছে। কিন্তু আশার কথা হলো, ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভেতরে ভেতরে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। এর উন্নয়নকল্পে ডিজিটালই রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অনলাইন নামজারি আবেদন, অনেক জায়গাতে বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আরও অনেক বিষয়েই দেশব্যাপী ভালো ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।সেটেলমেন্ট, রেজিস্ট্রেশন এবং রেকর্ড সংশোধনের সমন্বয় করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলা ভূমি অফিস থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ অনেক ভূমি অফিসেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি।তবে নাগরিক হিসেবে আমাদের অসচেতনতার দায় এবং সচেতনতার দায়িত্বকে আমরা এড়াতে পারি না।
আমরা যখন নিজেরা জানি না, তখনই অন্যদের উপর নির্ভর করি। আর সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই সুযোগ নিয়েছে আবহমান কাল থেকে। তাহলে নাগরিক হিসেবে আমাদের করণীয় কী?আমাদের ভূমির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনা এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। অন্তত নিজের স্বার্থে নিজের মালিকানাধীন বা পিতার সম্পত্তির নিরাপত্তা বিষয়ে ভাবতে হবে। ভূমির স্বত্ব বা মালিকানা কিন্তু কাগজের ভিত্তিতে হয়। সুতরাং আপনি যে ভূমিতে অবস্থান করছেন সেটি অন্য কেউ চুরি করলো কি না সেটা নিয়ে চিন্তা থাকা দরকার। ব্যাংকের হিসাবে যত টাকা আপনার আছে, তার মূল্যের চেয়ে ঢের বেশি দাম আপনার সম্পত্তির, যেখানে আপনি জন্মেছেন বা ব্যবসা করছেন অথবা কৃষিকাজ করছেন বা অন্য কিছু।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর জানেন, কিন্তু নিজের জায়গার হিসাব তথা দাগ নম্বর জানেন না। কারণ, ওই অসচেতনতা। আপনি জেনে নিন আপনার খতিয়ান (মূল রেকর্ড-এসএ কিংবা আরএস রেকর্ড)। এটি অনেকটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টের মতো। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা রেকর্ড রুমে পাওয়া যাবে।
তাছাড়া, আপনার অধীনে থাকা দলিল, রেকর্ড, খাজনার রশিদ, খতিয়ান কপিসহ জমির মালিকানার প্রমাণ হিসেবে সব সহায়ক কাগজপত্র ঠিকমতো আছে কি না দেখে নিন এবং যত্ন নিয়ে সংরক্ষণে রাখুন। শেষ করছি প্রশ্ন দিয়ে, যেই ভূমিতে জন্ম নিয়ে এতবড় হয়েছেন, সেই বাড়িটির দাগ বা কত নম্বর খতিয়ান ভুক্ত আপনি জানেন তো?