07/04/2024
আইনি-গল্প!
শ্রম আইন চর্চা নিয়ে কথা
ড. উত্তম কুমার দাস, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
সম্প্রতি (০২/০৪/২০২৪) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউএনওডিসি’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় অংশ নিলাম। এতে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় ছিল বিদ্যমান শ্রম আইন চর্চার (প্র্যাকটিসের) ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা (চ্যালেঞ্জ) এবং তার থেকে উত্তরণের পথ বাতলানো।
উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধানতঃ শ্রম আইন চর্চা (প্র্যাকটিস) করেন এমন আইনজীবী, বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শ্রম আইন পড়ান কিংবা পড়াতে ইচ্ছুক এমন শিক্ষক এবং শ্রম বিষয়ে কাজ করে এমন কিছু এনজিওতে চাকুরীরত ব্যক্তিরা অংশ নেন।
আমি যেহেতু মূলতঃ শ্রম আইন এবং চাকুরী সংক্রান্ত আইন চর্চা (প্র্যাকটিস) করি, তাই যখন প্রশ্ন করা হ’ল- শ্রম আইন চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ কি, আমি তখন প্রথমেই বলি- একজন আইনজীবী হিসাবে নিজের উত্তরণ ঘটানো (Transformation)।
আইনজীবী বলতে আমি যা বুঝাচ্ছি তা হ’ল- যিনি নিয়মিত চেম্বার করেন, ক্লায়েন্ট ব্রিফ নেন ও আইনি পরামর্শ দেন, এবং মাননীয় শ্রম আদালত, শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনাল কিংবা সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানি করেন ইত্যাদি। (চেম্বারে বসে আইনি মতামত প্রদান কিংবা ট্রেনিং কার্যক্রমকে এই বিবেচনায় নিচ্ছিনা)।
আমার সৌভাগ্য হ’ল আমি আইন বিষয়ে দেশের এক সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে (যা হ’ল- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) এলএল. বি. (অনার্স), এলএল. এম. (১৯৯৪) এবং পিএইচ. ডি. (আইন, বছর-২০০২) পর্যায়ের পড়াশুনা এবং গবেষণা করেছি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার আইন বিভাগে থেকে ফুল ব্রাইট বৃত্তির অধীন (হিউবারট হামফ্রি ফেলোশিপ) আইনে দ্বিতীয় মাস্টার্স (২০০৯-২০১০) করেছি।
পেশাগত পর্যায়ে সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষকতা এবং ইন্টারন্যাশনাল সিভিল সার্ভেণ্ট হিসাবে বছর কুড়ি ব্যয় করেছি। তারপর এসেছি সার্বক্ষণিক আইনপেশায়; এবং তা শ্রম আইন নিয়ে।
এত কথা বলার মানে হ’ল- আমাকে অনেক আইনের শিক্ষার্থী কিংবা নবীন আইনজীবী প্রশ্ন করেন, শ্রম আইন চর্চায় ভাল করার উপায় কি। আমার উত্তর হয়- শ্রম আইন হ’ল এক বিশেষ আইন। তার জন্য বিশেষ আগ্রহ, মনোযোগ ও চর্চা দরকার। যাতে লেগে থাকতে হবে।
এযেন অনেকটা শুধুমাত্র গণিত (অংক) শিখলে চলবে না (যা বলতে সাধারণ আইন চর্চা বুঝাচ্ছি)! ঐকিক নিয়মে পারদর্শী হতে হবে!
আমি একটি বিষয় নিয়ে গর্ব করি। দেশের শিল্প, বাণিজ্য, রপ্তানি, অর্থনীতি ইত্যাদি যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে তাতে করে শ্রম ও চাকুরী সংক্রান্ত আইনের চর্চা ও কাজের সুযোগও বিস্তৃত হচ্ছে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে কাজের সুযোগ হয়েছে। শ্রম আইনে নিয়ে আমার যে কাজ তা এখন বিস্তৃত।
সেদিনের কর্মশালায় দল-ভিত্তিক কার্যক্রম থেকে শ্রম আইন চর্চার ক্ষেত্রে যেই যেই চ্যালেঞ্জের বিষয় তুলে ধরা হ’ল তার মধ্যে অন্যতম হ’ল- শ্রম আইনে বিদ্যমান শ্রমিকের সংজ্ঞা।
এক আর এক যোগ করলে যেমন দুই হয়, অনেকে শ্রমিকের সংজ্ঞা তেমন করে চান। তা তো আর হবার নয়! এইক্ষেত্রেই দরকার একজন চর্চাকারীর পারদর্শিতা।
শ্রম আইনের ২(৬৫) ধারার শ্রমিকের যেই সংজ্ঞা তা হ’ল এক মৌলিক সংজ্ঞা; তা প্রযোজ্য শ্রমিক-কর্মচারী নির্বিশেষে সকলের জন্য।
তবে এখানে কোন মানদণ্ড দেওয়া হয়নি। যা অনেক দেশ তাদের সংশ্লিষ্ট আইনে করেছে।
আমাদের শ্রম আইনের বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকের যেই সংজ্ঞা [যেমন- ধারা ২(৬৫), ১৭৫, ১৫০ ইত্যাদি) তা পূর্বে বলবৎ বিভিন্ন আইন থেকে নেওয়া; যেমন- The Payment of Wages Act, 1936, the Shops and Establishment Acts, 1965, the Employment of Labour (Standing Order), 1965, the Industrial Relations Ordinance, 1969, Workman’s Compensation Act, 1923 ইত্যাদি।
ফলে বর্তমান শ্রম আইনের বিভিন্ন অধ্যায়ে উক্ত সংজ্ঞার যেই সুবিন্যাস দরকার ছিল তা করা হয়নি।
শ্রমিকের সংজ্ঞা বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের (মাননীয় আপীল বিভাগ) অবস্থান হ’ল- কোন ব্যক্তির পদবী বিবেচনায় বলা যাবেনা কে শ্রমিক, আর কে শ্রমিক নয়। তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত থেকেও একজন শ্রমিক হতে পারেন। একক্ষেত্রে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যেই পদগত ক্ষমতা তার ব্যপ্তি এবং তা বাস্তবায়নে তার স্বাধীনতা। আর এইক্ষেত্রে প্রত্যেকের বিষয় আলাদা-আলাদা।
শ্রম বিধিমালা (২০১৫) করে “তদারকি কর্মকর্তা” এবং “প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি”-এর যেই সংজ্ঞা আনা হয়েছিল এক মামলার রায়ে মাননীয় শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনাল তাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। যার বিরুদ্ধে কেউ উচ্চ আদালতে যাননি।
(চলবে)।
(এখানকার মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। এই বিষয়ে কারো কোন প্রশ্ন কিংবা মতামত থাকলে তা আমাদের জানাতে পারেন। ই-মেইলঃ [email protected]; ফোনঃ ০১৭৫৬৮৬৬৮১০)।
Call now to connect with business.