24/04/2026
অদৃশ্য দেয়াল ও হৃদয়ের নিঃশব্দ প্রস্থান: একজন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারের পর্যবেক্ষণ
==================
আইন পেশায় আমরা প্রতিনিয়ত সত্য আর প্রমাণের ব্যবচ্ছেদ করি। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের অপরাধ বা গুণাবলি যখন বিচার করা হয়, তখন আমাদের প্রধান মানদণ্ড থাকে সেই ব্যক্তির নিজস্ব কাজ এবং তার ব্যক্তিগত শুদ্ধতা। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর আদালতে যখন কোনো মানুষের ‘যোগ্যতা’ বিচার করা হয়, তখন আমি অবাক হয়ে দেখি সেখানে যুক্তির চেয়ে ‘সামাজিক সমীকরণ’ আর ‘পূর্বনির্ধারিত ছক’ প্রাধান্য পায়। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় বলতে গেলে, একটি সুস্থ সমাজ তখনই গড়ে ওঠে যখন একজন মানুষ তার নিজস্ব অর্জন এবং চারিত্রিক সৌন্দর্যে মূল্যায়িত হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন; আমরা মানুষের ব্যক্তিগত গুণাবলির চেয়েও তার ‘পারিপার্শ্বিক মোড়ক’ দেখতে বেশি পছন্দ করি।
এই বিচারিক ত্রুটির কারণে অনেক সময় ঘরের ভেতরের মানুষগুলোও একে অপরের কাছে অদৃশ্য হয়ে যায়। একই ডাইনিং টেবিলে বসে হাসি মুখে খাবার শেয়ার করা হয়, পালিত হয় যাবতীয় সামাজিক দায়বদ্ধতা; কিন্তু টেবিলের ওপাশে থাকা মানুষটার মনের গহীন অরণ্যে যে কতটা হাহাকার জমে আছে, তা বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয় না। যখন কিছু অদৃশ্য সামাজিক প্রথার দোহাই দিয়ে কারোর ব্যক্তিগত স্বপ্ন বা পছন্দের ওপর নিয়ন্ত্রণের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই মানুষটি প্রতিদিন বেঁচে থেকেও এক ধরণের ‘মৃত অনুভূতি’ নিয়ে বাঁচে। তার হাসিটা তখন কেবল একটি সামাজিক মুখোশ হয়ে দাঁড়ায়। সে তর্কে জড়ায় না, অবাধ্য হয় না; কেবল ভেতর থেকে নিঃশব্দে দূরে সরে যায়।
আভিজাত্য কি কেবল বংশের তালিকায় বা বাহ্যিক জৌলুসে থাকে? আভিজাত্য তো মানুষের চিন্তায় এবং তার মননশীলতায়। অথচ আমরা প্রায়ই মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কিছু পারিপার্শ্বিকতাকে—যেমন কারোর জন্মগত প্রেক্ষাপট বা তার পূর্বপুরুষের কোনো সীমাবদ্ধতা। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সততা যখন কেবল তার পারিবারিক ইতিহাসের কারণে অবমূল্যায়িত হয়, তখন সেটা শুধু সেই ব্যক্তির ওপর নয়, বরং মানবিকতার ওপর এক ধরণের ‘মানসিক জুলুম’। আইন বলে, অপরাধের বিচার অপরাধীর হয়, তার পরিবারের নয়; ঠিক তেমনি মানুষের মূল্যায়ন তার নিজের আলোয় হওয়া উচিত, তার বংশের ছায়ায় নয়।
অভিভাবকদের ‘ভালো চাওয়া’র আড়ালে যদি সন্তানের ‘ভালো থাকা’টা লোকলজ্জার বলি হয়, তবে সেই সম্পর্কের সার্থকতা ম্লান হয়ে যায়। সন্তানের নিঃশব্দ হয়ে যাওয়া অনেক সময় তার অহংকার নয়, বরং তার অপার্থিব কষ্টের প্রকাশ। আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি, “সন্তান কেন বদলে যাচ্ছে?” কিন্তু খুব কম সময়ই ভেবে দেখি, আমাদের তৈরি করা সামাজিক দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই কি তার এই নীরব প্রস্থান? আভিজাত্যের চেয়ে মানসিক শান্তি আর সততাকে বড় করে দেখা কি খুব অসম্ভব?
আসুন, আমরা মানুষকে তার নিজের কাজ আর মূল্যবোধ দিয়ে বিচার করতে শিখি। অন্যথায়, আমরা কেবল সুন্দর সুন্দর ঘরই গড়ব, কিন্তু সেই ঘরে শান্তির মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। দিনশেষে, কোনো সম্পর্ক বাহ্যিক সামঞ্জস্যে টিকে থাকে না; সেটি টিকে থাকে ভেতরের সত্য আর অনুভূতির স্বচ্ছতায়।
Jamal Naser Mustakim
Advocate
01835-047808