24/02/2026
মামলা করার ভয় দেখিয়ে অস্বাভাবিক দেনমোহর বসিয়ে জোরপূর্বক কাবিননামা সম্পাদন করান স্ত্রী। এরপর টাকা দিতে বাধ্য করতে স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। আইন ও আদালত অপব্যবহার করার এক পরিচিত দৃশ্য এটা। সম্প্রতি এমন একটা মামলায় আসামী পক্ষে আইনী লড়াই করেছি আমরা। আজ আদালত আমাদের মক্কেলকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন। ভীষণ আনন্দের এই অর্জন!
পটভূমিঃ
আমাদের মক্কেলের স্ত্রী আমাদের মক্কেলের বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য মারধর করার অভিযোগ তুলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায় একটি মামলা দায়ের করে এবং উক্ত মামলায় ঢাকার একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আজ যুক্তিতর্ক শুনানীর জন্য দিন ধার্য হয়। মামলাটিতে আমি আসামী পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করি।
যুক্তিতর্কঃ
আমি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারাটি বিশ্লেষণ করে অপরাধ সংগঠনের উপাদানগুলো (যথাঃ (১) ভিকটিমের নিকট আসামী কর্তৃক যৌতুকের দাবী, এবং (২) যৌতুকের কারণে বাদীকে সাধারণ জখম করার ঘটনা) বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনালের নজরে নিয়ে আসি।
এরপর সেই উপাদানগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে প্রসিকিউশনপক্ষ কিভাবে ব্যার্থ হয়েছে তা সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনালের কাছে তুলে ধরি।
যেমনঃ যৌতুক দাবী করার বিষয়টি প্রসিকিউশনপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। এজাহারের কোথাও যৌতুক শব্দটির উল্লেখ নেই। এজাহারকারী তার সাক্ষ্যতে এসে যৌতুকের কথা উল্লেখ করলেও সমর্থনযোগ্য সাক্ষ্য দিয়ে তা প্রমাণ করতে পারেনি। যেমনঃ এজাহারকারী বলেছে, "ঘটনার দিন আসামী ফার্নিচার কেনার জন্য যৌতুক চেয়েছে।" এজাহারকারীর বাবা বলেছে, "ঘটনার দিন আসামী বিদেশ যাবার জন্য যৌতুক চেয়েছে।" আবার আরেক সাক্ষী বলেছে, "ঘটনার দিন আসামী নেশা করার টাকার জন্য যৌতুক চেয়েছে।" পরস্পর সাংঘর্ষিক এই সাক্ষ্যগুলো যৌতুক চাওয়ার ঘটনার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের সৃষ্টি করে।
আসামী এজাহারকারীকে যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম করেছে বলে যে অভিযোগ এজাহারকারী করেছেন তিনি তাও প্রমাণ করতে পারেননি। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে আমি কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করি। যেমনঃ কোন ধরণের জখমের মেডিকেল সার্টিফিকেট ছাড়াই মামলা দায়ের করার ঘটনা, মামলা দায়েরের ছয় বছর পর একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট জমা দেয়া, মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদানকারী ডাক্তারকে সাক্ষী হিসেবে পরীক্ষা না করা। এছাড়াও জখমের ব্যাপারে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগুলো ছিলো বিভ্রান্তিকর, যেমনঃ- ভিকটিম তার সাক্ষীতে বলেছে, আসামী তার কপালে আঘাত করেছে অথচ তার বাবা বলেছে আসামী তার মেয়ের চোখে আঘাত করেছে।
একটি ফৌজদারী মামলায় সময় (Time), ঘটনাস্থল (Place), ঘটনার ধরণ (Manner) প্রমাণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমি বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনালের নিকট প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করে সে বিষয়ে তাদের ব্যর্থতা দেখাতে সমর্থ হই; যেমনঃ- এজাহারকারী তার সাক্ষ্যতে বলেছে ঘটনা ঘটেছে সকালঃ ৯:০০ টায়। অথচ তাদের বাসার কেয়ারটেকার বলেছে, ঘটনা ঘটেছে রাতঃ ৯:০০ টায়।
ঘটনাস্থল সম্পর্কে এজাহারকারী বলেছে, ঘটনা ঘটেছে বর্ণিত ভবনের সাত তলায়। আবার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছে, ঘটনা ঘটেছে বর্ণিত ভবনের তিন তলায়।
ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে এজাহারকারী তার সাক্ষ্যতে বলেছে, ঘটনার দিন প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।কিন্তু দাড়োয়ান বলেছে, ঘটনার দিন এজাহারকারীকে তার বড় বোনের বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।
প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করে আমি বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনালকে দেখাই প্রসিকিউশন পক্ষ ফৌজদারী মামলা প্রমাণের নীতিতে (Beyond any reasonable doubt) মামলাটি প্রমাণ করতে কিভাবে ব্যার্থ হয়েছে।
বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল আমাদের যুক্তিতর্ক আমলে গ্রহণ করে আসামীকে বেকসুর খালাস প্রদান করে ন্যায়বিচার করেছেন।