13/08/2026
#যৌতুকের_মামলায়_কী_শাস্তি_মিথ্যা_যৌতুক_মামলা_হলে_আইনে_কী_প্রতিকার_আছে?
যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কঠোর আইন রয়েছে। একইভাবে, কাউকে হয়রানি বা ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে জেনেশুনে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ করাও আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই যৌতুকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি আইনের অপব্যবহার রোধ করাও জরুরি।
যৌতুক বলতে কী বোঝায়?
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বিবাহের কোনো এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষের কাছে বিবাহের সময়, বিবাহের আগে বা বৈবাহিক সম্পর্ক চলাকালে বিবাহের শর্ত হিসেবে বা বিবাহ অব্যাহত রাখার শর্ত হিসেবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্থ, সম্পদ বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিস দাবি, প্রদান বা প্রদানের জন্য সম্মত হওয়া নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যৌতুকের আওতায় পড়ে।
তবে আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীন দেনমোহর বা মোহরানা যৌতুক নয়। আইনে নির্ধারিত বৈধ বিবাহকালীন উপহারের বিষয়ও আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।
যৌতুক দাবি বা গ্রহণের শাস্তি কী?
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩ ও ৪ অনুযায়ী যৌতুক দাবি করা এবং যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ, এতে সহায়তা করা বা এ উদ্দেশ্যে চুক্তি করা অপরাধ।
এর জন্য হতে পারে:
১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।
আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী এই আইনের অধীন অপরাধগুলো আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য।
স্বামীও কি যৌতুকের মামলা করতে পারেন?
যৌতুক নিরোধ আইন শুধু নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন নয়। আইনের সংজ্ঞায় বিবাহের এক পক্ষ ও অন্য পক্ষের মধ্যে যৌতুক দাবি বা লেনদেনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট দাবি আইনগত অর্থে যৌতুক কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে ঘটনার বাস্তবতা ও আইনের সংজ্ঞা বিবেচনা করে।
দেনমোহর বা মোহরানা এবং আইনগত অধিকার হিসেবে প্রাপ্য কোনো অর্থকে শুধু অর্থ দাবি করা হয়েছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌতুক হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
মিথ্যা যৌতুক মামলা করলে কী শাস্তি হতে পারে?
এখানে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৬ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ করার কোনো ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও এই আইনের অধীনে মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা বা করানো হলে হতে পারে:
সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:
মামলা প্রমাণিত হয়নি বা আসামি খালাস পেয়েছেন মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি মিথ্যা মামলা হয়ে যায় না।
ধারা ৬ প্রযোজ্য হওয়ার জন্য আইনে নির্ধারিত শর্ত, বিশেষ করে ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায় এবং ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ না থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
দণ্ডবিধির ২১১ ধারাও প্রাসঙ্গিক
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ২১১ অনুযায়ী, কাউকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এবং কোনো ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করা বা মিথ্যা অপরাধের অভিযোগ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আর মিথ্যা অভিযোগটি যদি এমন অপরাধের হয় যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ৭ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড, তাহলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
দণ্ডবিধির ২০৯ ধারা কী বলে?
দণ্ডবিধির ২০৯ ধারাকে সরাসরি “মিথ্যা মামলা করার ধারা” বলা ঠিক নয়।
এই ধারা মূলত আদালতে জেনেশুনে মিথ্যা দাবি করার বিষয়ে। কেউ প্রতারণামূলকভাবে বা অসৎ উদ্দেশ্যে, অথবা কাউকে ক্ষতি বা বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে আদালতে মিথ্যা দাবি করলে এই ধারা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
মিথ্যা মামলার শিকার হলে কী করবেন?
মিথ্যা মামলার শিকার হলে আত্মগোপন করা বা মামলা এড়িয়ে যাওয়া সমাধান নয়।
মামলার ধরন অনুযায়ী দ্রুত আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে:
১) প্রয়োজন হলে জামিনের আবেদন করুন।
২)অভিযোগ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করুন।
৩) আইনগতভাবে প্রযোজ্য হলে অব্যাহতি বা অন্যান্য উপযুক্ত প্রতিকারের আবেদন করুন।
৪)প্রয়োজন হলে উচ্চ আদালতে প্রতিকার চান।
৫) নিজের পক্ষে থাকা বৈধ দলিল, নথি ও অন্যান্য প্রমাণ আইনজীবীর মাধ্যমে যথাযথ পর্যায়ে উপস্থাপন করুন।
জামিন হবে কি না, তা মামলার ধারা, অভিযোগের প্রকৃতি এবং আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।
মিথ্যা মামলায় ক্ষতিপূরণের সুযোগও থাকতে পারে
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৫০ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মিথ্যা, তুচ্ছ বা হয়রানিমূলক অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখে।
বর্তমান সংশোধিত বিধানে সাধারণ ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে প্রতিটি মিথ্যা মামলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। আইনের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হতে হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মিথ্যা মামলার শাস্তি
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ১৭ মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের বিষয়ে বিশেষ বিধান দিয়েছে।
কারও মর্যাদাহানি বা ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে, ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ না থাকা জেনেও এই আইনের অধীনে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের বা করানো হলে অনধিক ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়া মূল মামলার বিচার শেষে অভিযোগটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক প্রমাণিত হলে, আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত শাস্তিও দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
আসামি খালাস পেয়েছেন মানেই অভিযোগকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা মামলার অপরাধী হয়ে যান না।
আবার কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে ক্ষতি বা হয়রানির উদ্দেশ্যে জেনেশুনে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ করেন এবং আইনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রকৃত যৌতুকের অভিযোগ হলে অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে হবে।
একই সঙ্গে নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করার জন্য মিথ্যা অভিযোগ বা মামলা করাও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
আইন কারও হয়রানির হাতিয়ার নয়।
আইন হোক প্রকৃত ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং নির্দোষ ব্যক্তির অধিকার রক্ষার মাধ্যম।
যৌতুকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হোক, আইনের অপব্যবহারও বন্ধ হোক।
#যৌতুক মিথ্যা_মামলা #মিথ্যা_যৌতুক_মামলা #আইনি_সচেতনতা