28/08/2026
মাদক উদ্ধারের পর মামলা কেন আদালতে টিকে না? জানুন ভেতরের আইনি সত্য!
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মাদক মামলা আদালতে ওঠে। কিন্তু একটি মামলা শুধু "মাদক উদ্ধার হয়েছে" বললেই আসামি দোষী প্রমাণিত হয়ে যান না — ফৌজদারি আইনের চিরন্তন নীতি হলো, রাষ্ট্রপক্ষকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে আসামিই অপরাধটি করেছেন। আজকের এই লেখায় ২০১৮ সালের একটি ইয়াবা উদ্ধার মামলার প্রকৃত ঘটনা ও আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখানো হলো, কীভাবে একটি মামলা শুরুতে "শক্তিশালী" মনে হলেও তদন্ত ও সাক্ষ্যের ঘাটতির কারণে তা আদালতে টিকতে পারে না।
২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকায় পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করে। অভিযোগ, তাদের পকেট থেকে ১০ পিস করে মোট ২০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। মামলাটি প্রমাণের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে। কিন্তু তদন্ত করে দেখা যায়, এই মামলার ভিত্তি প্রথম থেকেই দুর্বল।
কেন এই মামলা প্রশ্নবিদ্ধঃ
ঘটনাস্থলটি ছিল একটি জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকা — একটি দোকানের সামনের পাকা রাস্তা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী তল্লাশি ও জব্দের সময় স্থানীয় অন্তত দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক। অথচ এই মামলায় প্রকৃত স্বাধীন স্থানীয় সাক্ষী নেই বললেই চলে। অধিকাংশ সাক্ষীই অভিযানকারী পুলিশ দলের সদস্য, অর্থাৎ তারা মামলার ফলাফলে স্বার্থযুক্ত পক্ষ। উচ্চ আদালত বারবার বলেছেন, শুধু পুলিশ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া নিরাপদ নয়।
২. আলামতের হেফাজতে সন্দেহ
উদ্ধারকৃত ইয়াবা ট্যাবলেট সিলগালা করে নিয়মমাফিক মালখানায় জমা দেওয়া হয়েছিল কি না, রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো আলামতের ওজন-বর্ণনার সাথে জব্দ তালিকার মিল ছিল কি না — এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো স্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি। ফলে আলামত হাতবদল বা পরিবর্তনের (Tampering) আশঙ্কা থেকে যায়।
৩. গোপন সংবাদের সত্যতা যাচাই হয়নি
"গোপন সংবাদ পেয়ে অভিযান" — এই দাবির স্বপক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত করার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ফলে এই সংবাদ প্রকৃতই গোপন সূত্র থেকে এসেছিল, নাকি পূর্ব শত্রুতাবশত কেউ ভুল তথ্য দিয়েছিল, তা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
৪. পাবলিক সাক্ষীরাই মামলার বিপক্ষে
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো — জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে থাকা সাধারণ (পাবলিক) সাক্ষীরা আদালতে এসে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য সমর্থন করেননি। তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেননি। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাবলিক সাক্ষী যখন প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন না, তখন সেই ঘাটতি শুধু পুলিশ সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিয়ে পূরণ করা যায় না — কারণ পুলিশ নিজেই এই মামলায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ (২০ বিএলডি ৪২৬; ৫ বিএলসি ৫১৪)।
এমনকি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা একজন হোটেল মালিক বা রেলগেটের দারোয়ানের মতো সহজলভ্য সাক্ষীদেরও আদালতে হাজির করা হয়নি। আদালত বলেছেন — সাক্ষীরা হলেন ন্যায়বিচারের চোখ ও কান; গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের পরীক্ষা না করানো হলে মামলার সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে (৫৭ ডিএলআর (এইচসি) ৫১৩)।
৫. বাদী নিজেই সাক্ষ্য দিতে পারেননি
মামলার বাদী দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করায় তিনি নিজে সাক্ষ্য দিতে পারেননি। ফলে উদ্ধারকৃত মালামাল তিনি নিজে শনাক্ত করে যাননি — যা রাষ্ট্রপক্ষের মামলাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
৬. তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে বলা বক্তব্যে গরমিল
প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা তদন্তের সময় (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী জবানবন্দিতে) যেসব কথা বলেননি, আদালতে এসে ঠিক সেই কথাগুলোই নতুন করে বলেছেন। আইনের ভাষায় এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বাদ পড়া তথ্য (omission) বক্তব্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক (contradiction) হিসেবে গণ্য হয়, যা সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দেয়।
৭. তদন্তকারী কর্মকর্তার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ৩৯(২) ধারা অনুযায়ী মাদক মামলার তদন্তের ক্ষমতা মূলত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অধীনস্থ কর্মকর্তার। পুলিশ বা র্যাবের কোনো কর্মকর্তা, যিনি ওই অধিদপ্তরের অধীনস্থ নন, তার তদন্ত পরিচালনার এখতিয়ার নিয়ে আইনি প্রশ্ন থেকেই যায় (১৪ বিএলসি ৬৭৭)।
আইনি নীতি: সন্দেহের সুবিধা আসামির অধিকার, দয়া নয়
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বারবার একটি কথাই বলে এসেছে — যতক্ষণ না দোষ প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ আসামিকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)। ফৌজদারি বিচারে আবেগ বা অনুভূতির কোনো স্থান নেই; আদালতকে চলতে হয় শুধু প্রমাণ ও আইনের আলোকে (১০ বিএলটি ৫২)।
যখন কোনো মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে এত বেশি অসঙ্গতি, গরমিল ও ঘাটতি থাকে যে গোটা মামলাটিই সন্দেহজনক হয়ে ওঠে, তখন সেই সন্দেহের সুবিধা আসামির প্রাপ্য অধিকার — এটি কোনো দয়া বা করুণা নয় (৫৬ ডিএলআর ৩৫; ৭ বিএলটি ৩; ৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)। আসামিপক্ষের বক্তব্য পুরোপুরি সত্য প্রমাণিত না হলেও, তা যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে সত্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে এবং রাষ্ট্রপক্ষের মামলাকে দুর্বল করে দেয়, তাহলেও আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী।
শেষ কথা
এই মামলার পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় — শুধু "মাদক উদ্ধার হয়েছে" বলাটাই যথেষ্ট নয়। নিরপেক্ষ সাক্ষী না থাকা, আলামতের হেফাজতে সন্দেহ, তদন্তে ত্রুটি, পাবলিক সাক্ষীদের অসমর্থন এবং সাক্ষ্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা — এই সবকিছু মিলিয়ে একটি মামলা যখন সন্দেহের ঊর্ধ্বে ওঠে না, তখন আইন অনুযায়ী তার সুবিধা পাওয়ার অধিকার আসামির। এটাই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি — প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করাই আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।