05/10/2026
ভূমিকা
————
চেকের প্রতি আস্থা রক্ষার জন্য চেক ডিজঅনারকে ফৌজদারি অপরাধ করা এক বিষয়, আর দণ্ডিত ব্যক্তির আপিলের অধিকার অর্থ জমার ওপর নির্ভরশীল করা অন্য বিষয়। বাংলাদেশে নেগোশিয়াবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ক ধারা দ্বিতীয়টি করেছে। এই লেখায় বিধানটির ইতিহাস, উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রয়োগ ও ভারত-পাকিস্তানের তুলনা দেখিয়ে সংশোধনের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হলো।
আইনটি শুরুতে ছিল না
———————————
১৮৮১ সালের মূল আইনে চেক ডিজঅনার ফৌজদারি অপরাধ ছিল না, প্রতিকার ছিল দেওয়ানি। বাংলাদেশে ১৩৮ ও ১৩৯ ধারা নিয়ে ফৌজদারি অধ্যায় যুক্ত হয় ১৯৯৪ সালের সংশোধনীতে; ২০০০ সালের সংশোধনীতে জরিমানার সীমা দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ করা হয়, এবং ২০০৬ সালের সংশোধনীতে আরও পরিবর্তন আনা হয়। ২০০৬ সালের ৩ নং আইনের ৩ ধারায় ১৩৮ক যুক্ত হয়েছে, যা বলে ১৩৮(১) ধারার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল চলবে না, যদি না আপিলের আগে সাজা প্রদানকারী আদালতে ডিজঅনারড চেকের অঙ্কের অন্তত ৫০% জমা দেওয়া হয়। বিধানটি কার্যকর হয় ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ থেকে।
কোন প্রয়োজনে, কাদের স্বার্থে
——————————————
আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের পূবালী ব্যাংক মামলায় (সিপিএলএ ১০৫৯–১০৬১/২০২৪) বলেছেন, চেকের অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং চেক নিয়ে লেনদেনে প্রতারণা ঠেকানোর জন্য আইনপ্রণেতারা ৫০% জমার শর্ত রেখেছেন। আদালতের মতে, শর্তটি বাধ্যতামূলক এবং আপিলের প্রস্তুতির জন্য সাময়িক জামিনের (ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬(২ক) ধারা) মাধ্যমেও এটি এড়ানো যাবে না।
২০০৬ সালের বিলের উদ্দেশ্য-বিবরণী বা সংসদীয় আলোচনা আমি খুঁজে পাইনি; তাই "কেন" প্রশ্নে নথিভিত্তিক ভিত্তি আপাতত আপিল বিভাগের এই ব্যাখ্যাই। "কাদের স্বার্থে" প্রশ্নের উত্তর ফলাফলভিত্তিক বিশ্লেষণ: বিধানটির প্রকাশিত লক্ষ্য অর্থ আদায়, আর এর প্রধান সুবিধাভোগী পাওনাদার, বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ওপরের মামলাতেই দেখা যায়, একটি ব্যাংক ১৮ কোটি টাকার ঋণের অংশ হিসেবে দেওয়া তিনটি চেকে আলাদা তিনটি মামলা করেছে। আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার হয়ে প্রতিটিতে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৬০ লাখ টাকার বেশি জরিমানা হয়েছে। অথচ ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর মতো বিশেষ দেওয়ানি ব্যবস্থা আছে। ফৌজদারি মামলা সেখানে পরিপূরক না হয়ে প্রায়ই আদায়ের চাপের কাজ করছে, বিশেষত ঋণের জামানত হিসেবে রাখা ফাঁকা চেক বা ঋণের পুরো অঙ্কের চেকে।
আপিল দায়েরে ৫০% জমা কেন ন্যায়বিচারের পরিপন্থী
————————————————————————
১. আপিলের অধিকারই কেড়ে নেওয়া: আপিলের উদ্দেশ্যই রায়ের পুনর্মূল্যায়ন। কিন্তু ১৩৮ক ধারা শুনানির আগেই চেকের অর্ধেক জমা চায়, না দিলে আপিলই চলে না। এতে সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদের সমতা, আইনের আশ্রয় ও ন্যায্য বিচারের চেতনা ক্ষুণ্ণ হয়।
২. অর্থের সামর্থ্যে বিচার: জমা দিতে না পারলে আপিল হয় না; ফলে কারাদণ্ড কার্যকর হয় কোনো বিচারিক পুনর্বিবেচনা ছাড়াই।
৩. বিচারিক বিবেচনার সুযোগ নেই: আপিল আদালত কারণ লিখে জমা কমাতে, কিস্তিতে নিতে বা মওকুফ করতে পারেন না; আর ওপরের রায়ে সাময়িক জামিনের পথও বন্ধ।
৪. অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভিত্তি: শর্তের ভিত্তি চেকের অঙ্ক, জরিমানা বা প্রকৃত ক্ষতি নয়। যেখানে চেকের অঙ্কই বিতর্কিত (যেমন—ফাঁকা চেক, ঋণ পরিশোধ হয়ে যাওয়া), সেখানেও ওই অঙ্কের অর্ধেক জমা দিতে হয়।
৫. দ্বৈত চাপ: একই ঋণে অর্থঋণ মামলা ও ১৩৮ ধারার মামলা চলে, আর ১৩৮ক-এর জমা অন্য মামলার পরিশোধের সঙ্গে সমন্বিত হয় না।
বিধানটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে রিট হয়েছে (যেমন—রিট পিটিশন নং ৬৭৫৬/২০০৭), এবং একটি সেকেন্ডারি সূত্র অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ বিধানটিকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেননি। তবে বৈধতা আর যৌক্তিকতা আলাদা প্রশ্ন। সংস্কারের দায়িত্ব মূলত আইনসভার।
ভারত: একই আইন, নমনীয় কাঠামো
——————————————————
ভারতেও ১৩৮ ধারা আছে এবং ২০১৮ সালে তারা আপিল-পর্যায়ে নতুন বিধান যুক্ত করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো আপিলের দরজা বন্ধ করেনি।
১৪৮ ধারায় আপিল আদালত আপিলকারীকে নিম্ন আদালতের নির্ধারিত জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের সর্বনিম্ন ২০% জমার নির্দেশ দিতে পারেন, যা ১৪৩ক ধারায় দেওয়া অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত। ভিত্তি চেকের অঙ্ক নয়, জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ। জমা আপিল দাখিলের শর্ত নয়; আপিল চলাকালে দণ্ড স্থগিতের (সিআরপিসি ৩৮৯ ধারা) শর্ত হিসেবে কাজ করে।
১৪৩ক ধারায় বিচার চলাকালে অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ চেকের অঙ্কের ২০%-এর বেশি হতে পারে না।
সুরিন্দর সিং দেসওয়াল (২০১৯) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ১৪৮ ধারার "may" শব্দটিকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখেছেন, তবে জমা না চাইলে আপিল আদালতকে কারণ লিখতে হবে। জাম্বু ভাণ্ডারি মামলায় আদালত বলেছেন, ২০% জমা অলঙ্ঘনীয় নিয়ম নয় এবং ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে তা শিথিল করা যায়। ২০২৪ সালের রাকেশ রঞ্জন শ্রীবাস্তব মামলায় আদালত বলেছেন, ১৪৩ক ধারায় প্রতিটি মামলায় চেকের অঙ্কের ২০% অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় না।
এসব বিধানের লক্ষ্য ঋণগ্রহীতার সময়ক্ষেপণ ঠেকানো, আপিলের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়।
পাকিস্তান: ভিন্ন কাঠামো
————————————
পাকিস্তানের নেগোশিয়াবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টে ১৩৮ ধারা নেই। সেখানে ২০০২ সালের ২৫ অক্টোবর দণ্ডবিধিতে ৪৮৯-এফ ধারা যুক্ত হয়। ধারাটি ঋণ পরিশোধ বা দায় মেটানোর জন্য অসৎভাবে ইস্যু করা চেক ডিজঅনার হলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখে, এবং ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবস্থা ছিল বলে প্রমাণের দায় অভিযুক্তের। তবে পাকিস্তানের আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু চেক ডিজঅনার হলেই অপরাধ হয় না, ইস্যুর সময় অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আপিলের জন্য চেকের অর্থের শতাংশ জমার কোনো পূর্বশর্ত আমি খুঁজে পাইনি।
তুলনা
————
আপিলের অধিকার: বাংলাদেশে ৫০% টাকা জমা না দিলে আপিল চলে না। ভারতে আপিল চলে এবং জমা দণ্ড স্থগিতের সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তানে সাধারণ ফৌজদারি আপিল।
জমার ভিত্তি: বাংলাদেশে চেকের অঙ্ক, ভারতে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ।
হার: বাংলাদেশে ৫০%, ভারতে ২০% (সর্বনিম্ন)।
বিচারিক বিবেচনা: বাংলাদেশে নেই, ভারতে কারণ লিখে ব্যতিক্রম করা যায়।
ভারত বা পাকিস্তানে বাংলাদেশের মতো আপিল দায়েরের পূর্বশর্ত হিসেবে এত বড় অঙ্কের জমার বিধান নেই। এই কঠোরতা আঞ্চলিক কমন ল চর্চার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রস্তাবিত সংশোধন
—————————-
১. আপিল দায়ের জমার ওপর নির্ভর করবে না। জমা চাওয়া হবে দণ্ড স্থগিত বা জামিনের শর্ত হিসেবে, ভারতের ১৪৮ ধারার আদলে।
২. জমার ভিত্তি হবে আরোপিত জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ, চেকের অঙ্ক নয়; এবং হার ২০%-এর কাছাকাছি থাকবে।
৩. আপিল আদালত লিখিত কারণ দেখিয়ে জমা কমাতে, কিস্তিতে নিতে বা মওকুফ করতে পারবেন—বিশেষত ফাঁকা চেক, ঋণ পরিশোধের দাবি বা একই ঋণে অর্থঋণ মামলা বিচারাধীন থাকলে।
৪. জমা আদালতের হেফাজতে থাকবে। চাইলে আদালত শর্তসাপেক্ষে পাওনাদারকে অংশত দিতে পারবেন; আপিলে আসামি জিতলে তা সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে।
৫. ৪২৬(২ক) ধারার সাময়িক জামিন সচল থাকবে।
৬. অর্থঋণ আদালতে একই ঋণে পরিশোধিত বা জমাকৃত অর্থ ১৩৮ক-এর জমার বিপরীতে সমন্বয় করা হবে।
উপসংহার
—————
চেকের প্রতি আস্থা রক্ষা ও পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষা জরুরি, কিন্তু তা আপিলের অধিকারের বিনিময়ে হতে পারে না। ভারত দেখিয়েছে, আপিলের দরজা খোলা রেখেও আনুপাতিক জমা ও বিচারিক বিবেচনার মাধ্যমে পাওনাদারকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের উচিত ১৩৮ক ধারার বাধ্যতামূলক ৫০% শর্ত বাদ দিয়ে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গ্রহণ করা।