25/09/2025
"আম্মা, শুধু শাক দিয়ে ভাত খাবো? সকালে না ডিম ভাজি করলে তুমি, আমার জন্য রাখোনি?"
"তোর জন্য রাখছিলাম আব্বা। কিন্তু, তোর ছোট ভাই কখন জানি খেয়ে ফেলছে। ও ছোট মানুষ বুঝেনি। ছোট ভাই-বোন থাকলে বড়দের একটু স্যাক্রিফাইস করতে হয়। বাসায় আর ডিম নেই, তুই শাক দিয়ে খেয়ে নে আব্বা।"
আম্মার কথা শুনে আর কথা বাড়ালাম না। চুপচাপ শাক দিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম। আমরা দুই ভাই, দুই বোন। আমি সবার বড়। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি আমি বড় ছেলে, এরপর থেকে সবকিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। অনেক সময় নিজ না খেয়ে, ভালো না পড়ে, ছোটদের দিয়ে দিতাম। আব্বা-আম্মা'কে নিয়ে ভালোই যাচ্ছিলো দিন। আমি এবার কলেজে ভর্তি হয়েছি। হঠাৎ ক্লাসে থাকাকালীন খবর এলো, আব্বা অসুস্থ।
আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। আব্বা'র হাত ধরে ভরসা দিয়ে বললাম,
"আব্বা আপনার কিছু হবে না, কিছু হবে না।"
আব্বা মৃ'ত্যু স'জ্জা'য় বসে আমার হাত ধরে বললো,
"আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে, মাহমুদ। তুই আমার বড় ছেলে, মাহমুদ। তুই কথা দে আব্বা, আমার অবর্তমানে তুই সবাই'কে দেখে রাখবি। তুই বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে আমার যত্নে গড়া সংসার আগলে রাখিস, আব্বা। তোর আম্মা, ছোট ভাই-বোনদের দেখে রাখিস।"
"ওমন কইরা বলবেন না, আব্বা। আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। আমি আজই আপনাকে বড় ডক্টরের কাছে নিয়া যাবো। আর আমি কথা দিলাম আব্বা, আমি সবাই'কে দেইখা রাখবো। আপনিও আমাদের সাথেই থাকবেন, আব্বা। আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন।"
কিন্তু, আব্বা আর কথা কইলো না। ম'ই'রা গেছে আমার আব্বা। আমরা আজ থেকে এতিম। লা'শে'র পাশে বসে আমার আম্মা, ছোট ভাই-বোনেরা কাঁদছে। আমি কাঁদতে গিয়েও কাঁদতে পারলাম না । আমি যে বড় ছেলে,সবাই ভেঙে পড়লে ওদের কে সামলাবে? আমি সবাইকে আগলে নিয়ে আশ্বাস দিয়ে বললাম, " আমি আছি।"
এরপর থেকে সবার দায়িত্ব এসে পড়লো আমার কাঁধে। বড় সংসার সামলাতে গিয়ে আমার আর লেখাপড়া হইলো না। আমি দিনরাত পরিশ্রম করে যখন ছোট ভাই-বোনের মুখে হাসি দেখি, আমি সব কষ্ট ভুইলা যাই। আমার একটা ভালোবাসা'র মানুষ ছিলো, বেলা। এতো দায়িত্বের ভিরে তারে আর সময় দেওয়া হয় না। কিছুদিন পর বেলা আইসা বললো,
"মাহমুদ, আব্বা বিয়া ঠিক করছে আমার। চলো আমরা অনেক দূর পালাইয়া যাই।"
মুহূর্তেই আম্মার অসহায় মুখটা, ভাই-বোনের দায়িত্বের কথা মনে পড়ে গেলো আমার। আমি নিজের ভালোবাসা নিয়া পালিয়ে গেলে, এদের কি হবে? আমি যে আব্বারে কথা দিছি, সবাইকে ভালো রাখবো। ওদের কথা চিন্তা কইরা আমি নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়া কইলাম,
"তুমি বাপের পছন্দের ছেলেকে বিয়া কইরা নেও, বেলা। নিজের সুখের জন্য আমি এতো বড় স্বার্থপর হতে পারবো না, আমার কাঁধে অনেক দায়িত্ব।"
সেদিন বেলা অনেক কেঁদেছে। আমি তবুও পারিনি তাকে আমার করে রাখতে। আমি অশ্রু টলমল চোখে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছি। বেলা নিরুপায় হয়ে বিয়ে করে নিলো। দুই বছর পর আমার আম্মাজান ও আমাদের একেবারে এতিম কইরা চইলা গেলো। এবার রান্না থেকে শুরু করে সবার দেখাশোনা একা হাতে সামলাতে হলো। যত কষ্ট করার আমি করেছি, নিজে এক জোড়া জুতো কিনতে গেলেও হিসাব করেছি। শখ করার বয়সে সংসারর দায়িত্ব পড়েছে কাঁধে।
বহু কষ্টে ভাই-বোনদের লেখাপড়া করাচ্ছি। আব্বার বড় ইচ্ছে ছিলো, ছোট ভাইকে ডক্টর বানানোর। আব্বার সব স্বপ্ন আমি পূরণ করবো।
ছোট বোন দু'টো কলেজ অবধি পড়িয়ে ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছি। ছোট ভাই এখন ডক্টর। সবার সংসার হয়েছে। বউ নিয়ে শহরে থাকছে ছোট ভাই। আমি আবারো একা হয়ে গেলাম। আব্বার ঘরখানায় একা পড়ে আছি।
আমার বয়স হয়েছে, বিয়ে করার বয়সে ভাই-বোনের দায়িত্ব ছিলো। নিজের কথা ভাবার সময় হলো না। অথচ, এখন আর কেউ আমাকে চিনে না।
আমি নিজের সাধ্য মতো ওদের ভালো রাখার চেষ্টা করে আসছি। তবুও ভাই-বোনে'র কত আক্ষেপ! বলে,
"আমাদের এটা দেওনি, ওটা দেওনি। তুমি কি এমন করছো আমাদের জন্য?"
হাহা..! আমি এসবে কিছু মনে করি না। আমি মুচকি হাসি। আমি আব্বার বড় ছেলে, ওরা ছোট! ওদের কথা গায়ে মাখতে নেই।
আজকাল বুকে'র ব্যথাটা বেড়েছে। কাজ করতে আর আগের মতো পারি না। পাড়া-পড়শীরা বলে, ডক্টরের কাছে যাও। ডক্টর ভাইয়ের কাছে টাকা চাও। আমি হেসে বলি,
"এসব ঠুনকো ব্যথায় বড় ছেলেদের কিছু হয় না। আমার এখনো অনেক দায়িত্ব রয়ে গেছে!"
কিন্তু, শরীর! আজকাল কথা শুনে না। সেদিন পড়শীরা বেহুঁশ অবস্থায় ঘরে পেয়েছে আমাকে। কয়েকজন মিলে হসপিটালে নিয়ে গেলো। উনারা ছোট ভাইকে খবর দিয়ে বললো,
"তোমার বড় ভাই অসুস্থ, হসপিটালে ভর্তি করেছি আমরা। একবার এসে দেখে যাও।"
ভাই ব্যস্ত কণ্ঠে বললো, "আমার হাতে সময় নেই। হসপিটালে ডিউটি আছে আমার।আজ কিছু টাকা পাঠিয়ে দিবো, আপনারা সামলে নিন।"
উনার কঠিন কিছু বলতে গেলো, থামিয়ে দিলাম আমি। ওরা ছোট, বুঝেনি। উনারাও চলে গেলো। হসপিটালের বেডে সুয়ে, একা আমি। ডক্টর এসে বললো,
"আপনার কেউ নেই? স্ত্রী-সন্তান কেউ আসেনি সাথে?"
আমি মুচকি হেসে বললাম, "বিয়ে করিনি তো। আমার অনেকেই আছে। ডক্টর ভাই আছে, দুই বোন। তারা আগে দাদা'র জন্য পাগল থাকলেও এখন নিজেদের সংসার হয়েছে। আজকাল বড় ব্যস্ত থাকে সবাই। আজ আসছি ডক্টর..."
"সে-কি আপনি তো এখনো অসুস্থ..! আপনার রেস্ট প্রয়োজন। "
"হাহা! এতটুকু ব্যথায় কি আসে যায় ডক্টর? আমি ঘরের বড় সন্তান, অনেক দায়িত্ব আমার। "
হসপিটাল থেকে বের হয়ে, আমি হিসাব কষি .! সামনে ঈদ। বোনদের শ্বশুর বাড়িতে উপহার পাঠাতে হবে। অনেক টাকার দরকার..... আজ থেকে আবারও কাজে যেতে হবে।
(সমাপ্ত)
ছোটগল্পঃ আমি_বড়_ছেলে
লেখনীতে ঃ সুমাইয়া_আফরিন_ঐশী
[কেমন লাগছে গল্পটি? সবাই রেসপন্স করবেন পেজে। ভালো লাগলে শেয়ার করুন। নিজদের মতামত জানাবেন আশা করি]