07/03/2026
৭ই মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব কি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের তাঁর ব্যবহৃত শব্দের কৌশলী প্রয়োগ বুঝতে হবে। তিনি ভাষণের শেষে বলেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" । ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল একটি "কৌশলগত অস্পষ্টতা" (Strategic Ambiguity)। তিনি একদিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যের কথা স্পষ্ট করেছেন, অন্যদিকে সরাসরি 'ইউনিলেটারাল ডিক্লারেশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স' (UDI) বা একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা এড়িয়ে গেছেন ।
সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করার পেছনে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও সামরিক কারণ ছিল। প্রথমত, তিনি যদি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তবে ইয়াহিয়া খান তাঁকে "বিচ্ছিন্নতাবাদী" হিসেবে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক বিশ্বে কোণঠাসা করতে পারতেন । দ্বিতীয়ত, রেসকোর্স ময়দানের ওপর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বোমা হামলার প্রস্তুতি ছিল, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে পারত । তৃতীয়ত, নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা এবং রোডেশিয়ার ব্যর্থ একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণার উদাহরণ তাঁর সামনে ছিল । তাই তিনি আইনিভাবে আলোচনার পথ খোলা রেখেও কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেন।
তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত বিদেশি মিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শেখ মুজিবের প্রতিটি শব্দ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করেছিল। মার্কিন সিআইএ (CIA), ব্রিটিশ ফরেন অফিস এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নথিতে এই ভাষণের বিভিন্ন রূপ ধরা পড়েছে।
মার্কিন সিআইএ-এর গোপন তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ মুজিবুর রহমান ও বাঙালিরা এমন এক পর্যায়ের স্বায়ত্তশাসন দাবি করছে যা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না । সিআইএ-এর ৫ই মার্চের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শেখ মুজিব সম্ভবত স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন না, বরং স্বায়ত্তশাসনের চরম সীমা পর্যন্ত গিয়ে চাপ সৃষ্টি করবেন । তবে ৭ই মার্চের পর মার্কিন দূতাবাস মন্তব্য করে যে, মুজিব অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন কিন্তু দায়ভার পাকিস্তানের ওপর রেখেছেন । তৎকালীন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড তাঁর ডেসপ্যাচে উল্লেখ করেছিলেন যে, মুজিব তাঁর জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন ।
ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভের PREM 15/567 ক্যাটালগের নথিতে ৮ই মার্চ সকালে পাঠানো একটি পরিস্থিতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, শেখ মুজিব ইয়াহিয়া খানের প্রস্তাবিত ২৫শে মার্চের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য ৫টি শর্ত দিয়েছেন । এই শর্তগুলো ছিল: ১. সামরিক আইন প্রত্যাহার করা। ২. সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া। ৩. গুলিবর্ষণের তদন্ত করা। ৪. ক্ষমতা জনপ্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা। ৫. সেনাবাহিনী থেকে সিভিল প্রশাসনে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা ।
ব্রিটিশ নথিতে আরও বলা হয়েছে, যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত ঘোষণা ছিল না, তবে বাঙালিদের কাছে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত দিক-নির্দেশনা । ব্রিটিশরা মনে করেছিল, শেখ মুজিব কার্যত স্বাধীনতার পথেই হাঁটছেন কিন্তু তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হতে দিতে চান না ।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের (Self-Determination) প্রয়োগ হিসেবে ৭ই মার্চের ভাষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইউনেস্কো ২০১৭ সালে এই ভাষণটিকে "মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার"-এ অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে এর ঐতিহাসিক ও বিশ্বজনীন গুরুত্বকে চিরস্থায়ী করেছে ।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভাষণটি ছিল একটি "Charter of Liberation" বা মুক্তির সনদ 。 ভাষণটিতে শেখ মুজিব জনগণের প্রতি ১০টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করেছিলেন, যা কোনো দেশের শাসকের নির্দেশের সমতুল্য । তিনি বলেছিলেন: ১. গরিব মানুষের কষ্ট না হওয়ার জন্য রিকশা, ট্রেন এবং লঞ্চ চলবে কিন্তু অফিস-আদালত বন্ধ থাকবে। ২. খাজনা ও ট্যাক্স পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ৩. রেডিও ও টেলিভিশনে বাঙালিদের বক্তব্য প্রচার না করলে বাঙালিরা সেখানে যাবে না। ৪. প্রতিটি গ্রামে ও মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে "সংগ্রাম পরিষদ" গঠন করতে হবে। ৫. যার যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে ।
এই নির্দেশগুলো কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ হতে পারে না। এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপরেখা এবং একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে বাঙালির আত্মপ্রকাশ।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা (MI) এবং আইএসআই (ISI) শেখ মুজিবের গতিবিধি সম্পর্কে সব সময় সজাগ ছিল। সিদ্দিক সালিক তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াহিয়া খানের গোয়েন্দারা মুজিবের ব্যক্তিগত আলাপচারিতাও রেকর্ড করতেন । একটি গোপন রেকর্ডিংয়ে মুজিব তাঁর সহকর্মীদের বলেছিলেন, "আমার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচনের পর আমি এলএফও (Legal Framework Order) ছিঁড়ে ফেলব" । এই তথ্যটি ইয়াহিয়া খানকে ক্ষুব্ধ করেছিল এবং ৭ই মার্চের ভাষণের সময় সেনাবাহিনী কামানের গোলা তাক করে রেখেছিল যাতে সরাসরি কোনো ঘোষণা এলেই অ্যাকশন নেওয়া যায় ।
৭ই মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে প্রচুর বিদেশী সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তাদের মাধ্যমে এই ভাষণ মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে । নিউজউইক (Newsweek) পত্রিকা শেখ মুজিবুর রহমানকে "Poet of Politics" বা রাজনীতির কবি হিসেবে আখ্যায়িত করে । বিদেশী গণমাধ্যমগুলো এই ভাষণটিকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার শেষ সুযোগ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন হিসেবে চিত্রিত করেছিল ।
শ্রীনাথ রাঘবন তাঁর "1971: A Global History of the Creation of Bangladesh" গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের জন্ম কেবল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ফল ছিল না । এটি ছিল একটি বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলাফল। ৭ই মার্চের ভাষণটি সেই বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে ঢাকাকে নিয়ে আসে। রাঘবনের মতে, এই ভাষণটি ছিল একটি "Charter for Liberation", যা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকেও পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে সাহায্য করেছিল ।