07/09/2026
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর আইনি-ফিকহি বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। এই বিলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা স্বামী-স্ত্রী কর্তৃক নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দান করলেও দাতা তার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার বজায় রাখতে পারবেন। বিলটি পাসের সময় বিরোধী দল একে “কুরআন-সুন্নাহবিরোধী” ও “ইসলামিক উত্তরাধিকার বিধানের পরিপন্থী” আখ্যায়িত করে তীব্র আপত্তি জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন যে নতুন আইনের সাথে শরিয়াহ আইনের কোনো সংঘাত নেই।
প্রশ্ন হলো—আসলেই কি এই বিলটি ইসলামিক আইনের মূল বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক? নাকি এটি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের পাশাপাশি একটি ঐচ্ছিক, স্বতন্ত্র সিভিল মডেল মাত্র? এই আর্টিকেলে আমরা বিলটির মূল বিধান, ইসলামিক হিবায় কবজা শর্ত, সংসদীয় বিতর্ক এবং আইনি-ফিকহি সমাধানের পথ খুঁজে দেখব।
#বিলটির মূল বিধান কী?
১৮৮২ সালের Transfer of Property Act-এ নতুন ধারা ১২২এ ও ১২২বি যুক্ত করার মাধ্যমে এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
#ধারা ১২২এ এর মূল বক্তব্য:-
- দাতা সম্পত্তির **আজীবন ভোগাধিকার (usufruct)** সংরক্ষণ করে সচল বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করলে তা বৈধ হবে।
- এই সুযোগ কেবল পিতা-মাতা/দাদা-দাদি সন্তান/নাতি-নাতনি অথবা স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মধ্যেই প্রযোজ্য।
- অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ১৭(১)(ক)অনুযায়ী রেজিস্টার্ড দলিল সম্পাদন বাধ্যতামূলক।
- দাতা জীবিত থাকাকালীন গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে, তবে দাতার ভোগাধিকার বহাল থাকবে।
- এটি একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর পদ্ধতি; প্রচলিত হিবা/গিফট বা অন্য কোনো হস্তান্তরকে এটি বাতিল বা সীমিত করবে না।
#ধারা ১২২বি তে বলা হয়েছে যে, রেজিস্ট্রেশনের পর এই দান সাধারণত অবাতিলযোগ্য; তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে অথবা জেলা জজের অনুমোদনে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা বা পারিবারিক প্রয়োজনে পরিবর্তন/বাতিল সম্ভব।
#ইসলামিক হিবায় কবজা শর্ত: মূলনীতি ও নজির
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে হিবা (gift) বৈধ হওয়ার তিনটি অপরিহার্য শর্ত:
(১) দাতার ঘোষণা (ইজাব),
(২) গ্রহীতার গ্রহণ (কবুল),
(৩) সম্পত্তির দখল/কবজা হস্তান্তর (কবজা)। বাংলাদেশ ও উপমহাদেশীয় নজিরে এই তিন শর্ত বারবার স্বীকৃত হয়েছে।
#কবজা সম্পর্কে মূলনীতিগুলো হলো:
- কবজা বাস্তব (actual) অথবা গঠনমূলক (constructive) হতে পারে; মিউটেশন, টাইটেল ডিড হস্তান্তর, ভাড়াটিয়ার attornment ইত্যাদি constructive possession হিসেবে গণ্য হতে পারে।
- দাতা ও গ্রহীতা একই বাড়িতে বসবাসরত হলে শারীরিক প্রস্থান/প্রবেশের প্রয়োজন নেই; মিউটেশন, ইউটিলিটি বিল, ভাড়া সংগ্রহের অধিকার হস্তান্তর ইত্যাদি প্রমাণ যথেষ্ট।
- দলিলে “কবজা দেওয়া হয়েছে” মর্মে ঘোষণা একটি prima facie presumption তৈরি করে, তবে প্রেক্ষাপটভেদে আদালত ভাড়া সংগ্রহ, মিউটেশন, দখলের প্রকৃত পরিবর্তন ইত্যাদি “acting under the gift” প্রমাণ খোঁজে।
- হিবা মৌখিক হতে পারে; লিখিত দলিল বা রেজিস্ট্রেশন আবশ্যক নয়, যদি তিন শর্ত প্রমাণিত হয়। Transfer of Property Act-এর ধারা ১২৯ মুসলিম হিবার ক্ষেত্রে ধারা ১২৩-এর (রেজিস্টার্ড ইনস্ট্রুমেন্ট) বাধ্যবাধকতা থেকে ব্যতিক্রম স্বীকার করে।
#সংসদীয় বিতর্ক: দুই মেরু অবস্থান
#বিরোধী দলের আপত্তি
সংসদীয় বিতর্কে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য বিলটিকে "কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট পরিপন্থী”"উল্লেখ করে এটি পাস না করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। বিরোধী দল একে বিদ্যমান মুসলিম পারিবারিক আইন, শরীয়তের ফারায়েজ, হেবা ও উত্তরাধিকার বিধির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক দাবি করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে।
#সরকারি অবস্থান
অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন যে নতুন আইনের সাথে শরিয়াহ আইনের কোনো সংঘাত নেই। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে কার্যকর হবে; প্রচলিত হিবা, সাধারণ দান বা অন্য কোনো শরিয়াহভিত্তিক হস্তান্তর ব্যবস্থা এটি দ্বারা বাতিল, সীমিত বা প্রভাবিত হবে না।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃদ্বয় বিলটি চূড়ান্ত করার পূর্বে দেশের বরেণ্য মুফতি, ফকিহ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
#বিশ্লেষণ: সাংঘর্ষিক কি না?
#১. সরাসরি সাংঘর্ষ নেই—কেন?
- বিলটি হিবাকে বাতিল বা পরিবর্তন করছে না: ১২২এ(৪)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই ধারার হস্তান্তর একটি "স্বতন্ত্র মডেল"এবং এটি প্রচলিত হিবা/গিফট বা অন্য কোনো হস্তান্তর পদ্ধতিকে সীমিত, খণ্ডন বা অবৈধ করবে না।
- এটি উত্তরাধিকার (ফারায়েজ) আইনকে রদ করছে না:ইসলামিক উত্তরাধিকার বিধান মূলত মৃত্যুপরবর্তী সম্পদ বণ্টনের নিয়ম; আর হিবা বা ১২২এ মডেল হলো মৃত্যুপূর্ব আন্তঃজীবন হস্তান্তর। বিলটি ফারায়েজের অঙ্ক, অংশীদার বা বণ্টনের নিয়ম পরিবর্তন করছে না।
- সরকারি অবস্থান: সর্বধর্মীয়, ঐচ্ছিক বিকল্প: সংসদীয় বিতর্কে সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই বিলটি সব ধর্মের নাগরিকের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য এবং এটি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকে প্রতিস্থাপন করছে না।
#২. ফিকহি শর্তাবলির দিক থেকে যে সতর্কতা প্রয়োজন
যদিও সরাসরি সাংঘর্ষ নেই, তবুও প্রচলিত হিবায় যে তিনটি অপরিহার্য শর্ত—(১) ঘোষণা, (২) গ্রহণ, (৩) কবজা হস্তান্তর—সেগুলোর সঙ্গে ১২২এ মডেলের কার্যপদ্ধতি পুরোপুরি মিলে না।
- কবজা হস্তান্তর শর্তের সঙ্গে অসামঞ্জস্য: প্রচলিত হিবায় কবজা হস্তান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত; হিবা সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পত্তি দাতার মালিকানা থেকে চলে যায় এবং দাতা সাধারণত তা থেকে ভোগাধিকার বা দখল ফিরে পান না (যদি না শরিয়াহসম্মত পৃথক ব্যবস্থা, যেমন উমরি/সুকনা, করা হয়)। কিন্তু ১২২এ মডেলে মালিকানা হস্তান্তরিত হলেও দখল/ভোগাধিকার দাতার কাছেই থাকে।
- ফলে, যদি কোনো মুসলিম দাতা এই বিলের আওতায় দান করেন, তাহলে তা প্রচলিত হিবায় “কবজা” শর্তের সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে না। এজন্য এটিকে “হিবা” না বলে “জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান”নামে পৃথক শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত।
#আইনি-ফিকহি সমাধানের পথ
এই বিলটি ইসলামিক আইনের সাথে সাংঘর্ষ এড়াতে নিম্নলিখিত ব্যাখ্যাগত ও ব্যবহারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:
প্রচলিত হিবা ও ধারা ১২২এ-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
প্রচলিত মুসলিম আইনের হিবা এবং প্রস্তাবিত ধারা ১২২এ-এর অধীন সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থাকে একই প্রকৃতির আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। উভয়ের উদ্দেশ্য সম্পত্তি হস্তান্তর হলেও তাদের মৌলিক কাঠামো ও আইনগত প্রয়োজনীয়তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত, কবজা বা দখল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রচলিত হিবার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো দাতার পক্ষ থেকে গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির দখল হস্তান্তর। এটি সরাসরি বা constructive possession—উভয়ভাবেই হতে পারে। অন্যদিকে, ধারা ১২২এ-এর মডেলে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হলেও দাতা তাঁর জীবদ্দশায় সম্পত্তির দখল ও ভোগদখল বজায় রাখতে পারেন। ফলে দখল হস্তান্তরের এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ধারা ১২২এ-এর অধীন হস্তান্তরকে প্রচলিত মুসলিম আইনের হিবা হিসেবে সরাসরি অভিহিত না করে একটি স্বতন্ত্র statutory transfer mechanism হিসেবে চিহ্নিত করা অধিক আইনগতভাবে নিরাপদ।
দ্বিতীয়ত, রেজিস্ট্রেশনের প্রশ্নেও পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত মুসলিম আইনের হিবার বৈধতার মৌলিক উপাদান হিসেবে রেজিস্ট্রেশন সব ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়; তবে স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য statutory requirements অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। বিপরীতে, ধারা ১২২এ-এর অধীন সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশনের বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই দলিল প্রণয়নের সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে হস্তান্তরটি মুসলিম আইনের হিবা হিসেবে করা হচ্ছে, নাকি ধারা ১২২এ-এর অধীন statutory transfer হিসেবে করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, দাতার আজীবন ভোগাধিকার সংরক্ষণ দুই ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলোর একটি। প্রচলিত হিবার ক্ষেত্রে বৈধভাবে হিবা সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পত্তির মালিকানা ও দখল সাধারণত গ্রহীতার দিকে স্থানান্তরিত হয়। পক্ষান্তরে, ধারা ১২২এ-এর মডেলে দাতা সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও তাঁর জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন। মুসলিম দাতার ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যবস্থা প্রচলিত হিবার মৌলিক নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিশেষভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, প্রযোজ্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত মুসলিম আইনে হিবা সাধারণভাবে যেকোনো ব্যক্তির মধ্যে হতে পারে, যদি হিবার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়। কিন্তু ধারা ১২২এ-এর সুবিধা নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে এই বিধানের অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার আইনগত সম্পর্ক নির্ধারণ করা অপরিহার্য।
#বাস্তবিক সুবিধা ও সীমারেখা
#সুবিধা
- বৃদ্ধ পিতা-মাতা/দাদা-দাদিদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন বা উচ্ছেদের ঝুঁকি কমে।
- সামাজিক সুরক্ষার একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়; শেষ বয়সে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর ভয় দূর হয়।
#সীমারেখা
- এটি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের হিবা-সংক্রান্ত ফিকহি শর্তকে পরিবর্তন করছে না, বরং একটি বিকল্প পথ খুলে দিচ্ছে।
- তাই মুসলিম দাতাদের জন্য “কোন মডেলে দান করছেন” তা স্পষ্টভাবে দলিলে উল্লেখ ও আইনি পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর নতুন ১২২এ/১২২বি ধারা ইসলামিক আইনের মূল বিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক নয়, বরং এটি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে স্বীকৃত হিবা পদ্ধতির পাশাপাশি একটি ঐচ্ছিক, স্বতন্ত্র সিভিল-স্ট্যাটিউটরি মডেল তৈরি করেছে।
তবে এটি প্রচলিত হিবায় “কবজা হস্তান্তর” শর্তের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে ফিকহি শর্তাবলির দিক থেকে সতর্কতা ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মুসলিম দাতাদের জন্য এটি “হিবা” নয়, বরং “লাইফ-এস্টেট রিজার্ভেশন মডেল” হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত এবং যথাযথ আইনি-ফিকহি পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করা উচিত।
সরকারের উচিত বিলটির প্রয়োগগাইডলাইনে মুসলিম দাতাদের জন্য স্পষ্ট কাউন্সেলিং ব্যবস্থা করা, যাতে তারা বুঝতে পারেন তারা কোন মডেলে দান করছেন এবং কী কী বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। একইসঙ্গে, ইসলামিক আইন বিশেষজ্ঞ, মুফতি ও ফকিহদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে বিলটির প্রয়োগে যেকোনো ধরনের আইনি-ফিকহি জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
মহি উদ্দীন
সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
আইন বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।