05/06/2026
আইনজীবীগণ পেশাগত বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন কিনা এই নিয়ে বাংলাদেশে বেশ আলোচনা সমালোচনা চলছে। ভারতেও আইনজীবীদের বিজ্ঞাপন কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু আপনাদের মনে থাকবে শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে মাদক গ্রহনের মামলা হয় ৩/৪ বছর আগে । এক পর্যায়ে আরিয়ান খান জামিন পেলে তার আইনজীবী শাহরুখ খান এবং পুরো এসোসিয়েটসদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করলেন। আমার তখন সেটি দেখে মনে হয়েছে " This is the biggest advertisement for any Lawyer"....
তো ভাবলাম যে একটু ঘেটে দেখি অন্যান্য দেশে কি অবস্থা।
বাংলাদেশের আইনটি আমরা প্রায় সবাই জানি। তবুও উল্লেখ করছিঃ-
"বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ক্যাননস অফ প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট (অধ্যায় ২) অনুযায়ী, বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং কাজ চাওয়া (soliciting) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একজন আইনজীবী সার্কুলার, বিজ্ঞাপন, দালাল (tout), ব্যক্তিগত যোগাযোগ, বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে কোনো সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কাজের জন্য আবেদন করতে পারেন না" ।
মূল আইন: "The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972" (১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ৪৬ নম্বর আদেশ)। এই আইনের ক্ষমতাবলে আইনজীবীদের জন্য যে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, তার নাম "Canons of Professional Conduct and Etiquette" (পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধি)।
অন্যান্য দেশে কি অবস্থাঃ
ভারতঃ
ভারতের আইনি কাঠামোও প্রায় একই রকম। বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI) রুলস এর ৩৬ নম্বর বিধি অনুযায়ী, আইনজীবীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার করা নিষিদ্ধ। ২০০৮ সালের একটি সংশোধনীর পর BCI নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল করে, যার ফলে আইনজীবীদের একটি সাধারণ ওয়েবসাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে, এই ওয়েবসাইটে কেবল বস্তুনিষ্ঠ তথ্য থাকতে পারে: আইনজীবীর নাম, যোগাযোগের বিবরণ, পেশাগত যোগ্যতা এবং অনুশীলনের ক্ষেত্র। মক্কেলদের প্রশংসাপত্র (testimonials) এবং দক্ষতার ব্যক্তিগত দাবির প্রচার এখনও নিষিদ্ধ।
২. উদারপন্থী নিয়ন্ত্রণ (যুক্তরাষ্ট্র)
আইন পেশায় বিজ্ঞাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে উদার বাজার, যেখানে একে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়।
যুগান্তকারী পরিবর্তন: ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবীদের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ ছিল। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী মামলা বেটস বনাম স্টেট বার অফ অ্যারিজোনা (Bates v. State Bar of Arizona) এর মাধ্যমে এই দৃশ্যপট বদলে যায়, যেখানে আদালত রায় দেয় যে আইনজীবীদের বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা প্রথম সংশোধনীর (First Amendment) বাণিজ্যিক বাকস্বাধীনতার সুরক্ষার লঙ্ঘন।
বর্তমান নিয়ম: আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন (ABA) মডেল রুলস অফ প্রফেশনাল কন্ডাক্ট (বিধি ৭.১ থেকে ৭.৩) এর অধীনে, আইনজীবীরা বিলবোর্ড, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডাকযোগের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন।
বিধিনিষেধ: প্রাথমিক বিধিনিষেধ হলো বিজ্ঞাপনটি কোনোভাবেই "মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর" হতে পারবে না। এছাড়া, আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে বিপন্ন বা দুর্বল ব্যক্তিদের সাথে সরাসরি, তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে কাজ চাওয়া (যাকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে "অ্যাম্বুলেন্স চেজিং" বলা হয়) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
মধ্যম পন্থা (যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন)
এই বিচারব্যবস্থাগুলো কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে এসে একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো পেশার মর্যাদার সাথে ভোক্তাদের তথ্য পাওয়ার অধিকারের ভারসাম্য বজায় রাখা।
যুক্তরাজ্যঃ
যুক্তরাজ্যে সলিসিটর এবং ব্যারিস্টার উভয়কেই বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সলিসিটরস রেগুলেশন অথরিটি (SRA) এবং বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড (BSB) এর শর্ত হলো যে, যেকোনো ধরনের প্রচার হতে হবে নির্ভুল, বিভ্রান্তিকর নয় এবং অনধিকারপ্রবেশমূলক নয়। আইনজীবীরা সরাসরি বা টেলিফোনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে অযাচিতভাবে নিজেদের সেবা প্রদানের প্রস্তাব দিতে পারেন না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নঃ
ঐতিহাসিকভাবে, ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো সিভিল ল (Civil Law) দেশগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার মতোই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে, একক বাজার তৈরি এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইইউ (EU) নির্দেশনার কারণে এই দেশগুলো তাদের নীতি শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে আইনজীবীরা সাধারণত বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, তবে শর্ত থাকে যে সেই বিজ্ঞাপন হবে মর্যাদাপূর্ণ, সত্যনিষ্ঠ এবং তা মক্কেলের গোপনীয়তা ও পেশাগত গোপনীয়তাকে সম্মান করবে।
আমার একটি পর্যবেক্ষণ হল বাংলাদেশের আইনটি ১৯৭২ সালের। তখন যোগযোগ মাধ্যম ছিল অত্যন্ত সীমিত । আবার আজকের দিনের মত সোশ্যাল মিডিয়া কারো কল্পনাতেও ছিলনা। ফলে আইনটি নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিৎ। বাংলাদেশের মত দেশে নিয়ন্ত্রণ মুখী আইনই হবে কারণ এখানে জনসাধারণের শিক্ষা সচেতনতা একেবারেই কম। ভারতেও একারনে কঠোর নিয়ন্ত্রন রাখা হয়েছে । নিয়ন্ত্রণ তুলে নিলে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু একই সাথে এই সময়ের বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে একটি Progressive Regulation আনা যায়। কারণ Artificial Intelligence এবং Social Media এ আইনটিকে অনেকক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করছে। যেমন শাহরুখ খানের আইনজীবীর পোস্ট করা ছবিটি।
©Asaduzzaman Asad