26/06/2026
দেনমোহর ও স্বামীর নিঃস্বতা: ৩ মাসের জেল, এরপর কী?
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
যদি কোনো ব্যক্তির দেনমোহর পরিশোধের সামর্থ্য না থাকে—ঘরবাড়ি, জমিজমা বা কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি না থাকে—তবে কি তার জেল হতে পারে? আর জেল খাটার পর আইনগতভাবে তিনি কি দেনমোহর পরিশোধের দায় থেকে মুক্তি পাবেন? দেনমোহর মামলা ও ডিক্রি জারির আইনি জটিলতা এবং এর ব্যতিক্রমী সমাধান নিয়েই আজকের আলোচনা।
৩ মাসের জেল ও দ্বৈত দণ্ডের সীমাবদ্ধতা:
দেনমোহর বা খোরপোশ আদায়ের জারি মামলায় আদালত স্বামীকে সর্বোচ্চ ৩ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারেন। এটি মূলত টাকা আদায়ের একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। দেওয়ানি কার্যবিধির ৫৮ ধারা অনুযায়ী, একই ডিক্রির টাকার জন্য একজন ব্যক্তিকে বারবার জেলে পাঠানো যায় না। অর্থাৎ, স্বামী একবার ৩ মাস জেল খেটে বের হলে, ওই একই দেনমোহরের টাকার জন্য আদালত তাকে দ্বিতীয়বার জেলে পাঠাবেন না। (তবে খোরপোশের মামলা হলে প্রতি মাসের বকেয়ার জন্য আলাদাভাবে জেল হতে পারে)।
মনে রাখতে হবে: জেল খাটার মানে এই নয় যে স্বামী দেনমোহরের দায় থেকে মুক্ত হয়ে গেছেন। দেনমোহর স্ত্রীর আইনি অধিকার, যা জেল খাটার পরও বহাল থাকে।
সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম প্রক্রিয়া:
জেল খাটার পরও টাকা পরিশোধ না করলে স্ত্রীর আবেদনে 'জারি মামলা'র মাধ্যমে স্বামীর সম্পত্তি নিলামের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আদালত সরাসরি মাঠে না গিয়ে একজন ‘নিলাম কমিশনার’ (সাধারণত আদালতের নাজির বা আইনজীবী) নিয়োগ করেন।
ক্রোক ও বিজ্ঞপ্তি: সম্পত্তি ক্রোকের পর আদালত নিলামের তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করে নোটিশ জারি করেন বা স্থানীয়ভাবে প্রচার করেন।
নামজারি: নির্ধারিত দিনে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে সম্পত্তি বিক্রি করে স্ত্রীকে টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যদি নিলামে কেউ অংশ না নেয়, তবে আদালত বকেয়া দেনমোহরের সমপরিমাণ হিসেবে ওই সম্পত্তি সরাসরি স্ত্রীর নামে নামজারি করে দিতে পারেন।
অস্থাবর ও বেতন ক্রোক: স্বামীর গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স বা ব্যবসার মালামাল নাজিরের মাধ্যমে এনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায়। এমনকি স্বামী চাকরিজীবী হলে তার নিয়োগকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে বেতন কেটে নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
সম্পত্তি ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা ও আইনি প্রতিকার:
মামলা চলাকালীন স্বামী যদি তড়িঘড়ি করে সম্পত্তি বিক্রি বা দান করার চেষ্টা করেন, তবে আদালত থেকে ‘নিষেধাজ্ঞা’ (Status Quo) নেওয়া যায়। আবার দেনমোহর ফাঁকি দিতে যদি মা-বাবা বা ভাই-বোনের নামে নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে দেওয়া হয়, তবে 'প্রতারণামূলক হস্তান্তর' প্রমাণ করে সেই দলিল বাতিল করত সম্পত্তিটি পুনরায় ক্রোক করা সম্ভব। এছাড়া, জারি মামলার ৫৪ ধারায় স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হলফনামা তলব করা যায়, যেখানে মিথ্যা তথ্য দিলে আদালত অবমাননার মামলা করা যায়।
স্বামী নিঃস্ব হলে আদালতের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত:
বিবাদী জেল খাটার পর যদি তার কোনো দৃশ্যমান সম্পদ না থাকে, তবে মামলা সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে, কিন্তু চিরতরে বন্ধ হয় না। ভবিষ্যতে (৫ বা ১০ বছর পর) স্বামী যদি উত্তরাধিকার সূত্রে বা নিজস্ব উপার্জনে কোনো সম্পদ পান, তবে স্ত্রী ওই একই জারি মামলায় তা ক্রোকের আবেদন করতে পারবেন।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত এই বিষয়ে স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করেছেন:
৫১ ডিএলআর (১৯৯৯) ৩৯৯: আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, দেনমোহর স্ত্রীর একটি আইনগত অধিকার যা স্বামী যেকোনো পরিস্থিতিতে পরিশোধ করতে বাধ্য। স্বামীর সম্পদ না থাকলে আদালত তাকে সময় দিতে পারেন, কিন্তু ডিক্রি বাতিল করতে পারেন না।
৩৬ ডিএলআর (১৯৮৪) ২৫৪ (রাজিয়া বেগম বনাম আনোয়ার হোসেন): আদালত বলেছেন, স্বামীর দারিদ্র্য বা অক্ষমতা দেনমোহর আদায়ের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না। সম্পদ না থাকলে ডিক্রিটি কার্যকর করার জন্য স্থগিত রাখা যাবে, যতক্ষণ না সম্পদ পাওয়া যায়। এমনকি স্বামীর 'অবিভক্ত পৈতৃক অংশ' চিহ্নিত করেও তা ক্রোক করার অনুরোধ করা যায়।
পরিশেষে: দীর্ঘ সময় পরও যদি কোনো সম্পদ না পাওয়া যায়, তবে মামলাটি স্থবির হয়ে যেতে পারে। কারণ প্রচলিত প্রবাদেই আছে—"শূন্য কলস থেকে পানি বের করা সম্ভব নয়।" তবে আইন স্ত্রীকে অধিকারচ্যুত করে না, বরং স্বামীর সামর্থ্য ফেরার অপেক্ষায় ডিক্রিটি বাঁচিয়ে রাখে।
এডভোকেট মোহাম্মদ মুসলিম মিয়াজী
জজকোর্ট চাঁদপুর
01920-125104