19/03/2026
চেকের মামলায় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত! হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ, ৭১ ডিএলআর (এডি)
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
চেক দিলেই কি মামলা হয়? বিশেষ করে যদি চেকের গায়ে লেখা থাকে 'সিকিউরিটি চেক'? বছরের পর বছর ধরে চেকের মামলার এই জটিল ধাঁধার সমাধান দিয়েছে আমাদের উচ্চ আদালত। হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ মামলার সেই ঐতিহাসিক রায়টি কেন আজ প্রতিটি পাওনাদার এবং দেনাদারের জানা জরুরি, তা নিয়েই আজকের আজকের বিশেষ কলাম।
মামলাটির মূল কাহিনী ছিল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে জটিল। মামলার বাদী শাহিন আকন্দ বিবাদী হুমাযুন রশিদ এর কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তার দেওয়া একটি চেকের বিপরীতে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করেন। বিবাদীর পক্ষ থেকে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয় যে, বিতর্কিত চেকটি কোনো বিদ্যমান ঋণের বিপরীতে দেওয়া হয়নি, বরং এটি ছিল একটি 'সিকিউরিটি চেক'। যেহেতু এটি সরাসরি টাকা লেনদেনের জন্য নয়, বরং গ্যারান্টি হিসেবে দেওয়া হয়েছে, তাই এটি ডিজঅনার হলে ১৩৮ ধারায় কোনো অপরাধ হবে না। হাইকোর্ট বিভাগ এই যুক্তির প্রেক্ষিতে মামলাটি বাতিল করে দিলেও পরবর্তীতে বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ায়। মহামান্য আপিল বিভাগ দীর্ঘ শুনানি শেষে এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ের মূল নির্যাসগুলো হলো:
১. চেকের উদ্দেশ্যই হলো লেনদেন: এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় চেকটি 'সিকিউরিটি' হিসেবে দেওয়া হয়েছে নাকি 'পেমেন্ট' হিসেবে, তা কোনো মুখ্য বিষয় নয়। যদি চেকটি কোনো বৈধ দায় পরিশোধের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়ে থাকে এবং ব্যাংকে উপস্থাপনের পর তা পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়, তবেই অপরাধ সংঘটিত হবে।
২. স্বাক্ষরের দায়বদ্ধতা: আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় তার স্বাক্ষর করা চেক কাউকে প্রদান করেন, তবে ধরে নিতে হবে সেটি কোনো দায় পরিশোধের জন্যই দেওয়া হয়েছে। সেটি 'সিকিউরিটি চেক' হলেও তা এনআই অ্যাক্টের আওতাভুক্ত হবে।
৩. প্রমাণের ভার: চেকটি যে কোনো দায়ের বিপরীতে দেওয়া হয়নি, তা প্রমাণের ভার বিবাদীর ওপর। শুধু 'সিকিউরিটি চেক' বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
এই রায়ের আগে অনেক অসাধু ব্যক্তি পাওনা টাকা পরিশোধ না করার ফন্দি হিসেবে 'সিকিউরিটি চেক' শব্দটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন। ৭১ ডিএলআর (এডি) সেই ঢাল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এটি একদিকে যেমন পাওনাদারের অধিকার সুরক্ষিত করেছে, অন্যদিকে লেনদেনের ক্ষেত্রে চেক প্রদানের গুরুত্ব ও সতর্কতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে 'হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ' মামলাটি প্রমাণ করেছে যে, আইন কেবল শব্দের মারপ্যাঁচে চলে না, বরং ন্যায়বিচারের গভীরে গিয়ে সত্য উদ্ঘাটন করে। আপনি যদি কাউকে চেক প্রদান করেন, মনে রাখবেন সেটি যে নামেই দিন না কেন, তার আইনি দায়বদ্ধতা আপনার কাঁধেই বর্তাবে। সুতরাং, চেক প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই সচেতন হতে হবে এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ধন্যবাদ
অ্যাডভোকেট মোঃ এনামুল হক
জেলা ও দায়রা জজ আদালত নওগাঁ
মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮