18/07/2020
প্রসঙ্গঃ ন্যায় বিচার; রিজেন্ট'র শাহেদ, জেকেজি'র সাবরিনা ও অন্যান্য
কয়েকদিন আগে স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত Bridge Of Spies মুভিটা দেখছিলাম।
নব্বই দশকের কোল্ড ওয়ার চলাকালীন সময়ের কাহিনী নিয়ে নির্মিত মুভিটিতে একজন রুশ গুপ্তচর আমেরিকায় গুপ্তচরবৃত্তির জন্য গ্রেফতার হন। তার বিচার শুরু হয়, রুশ গুপ্তচরের জন্য সরকারি ভাবে ডিফেন্স এটর্নি নিযুক্ত হন নিউইয়র্কের একজন বিখ্যাত আইনবিদ। এই আইনবিদ আবার আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র এজেন্ট। তা সত্ত্বেও তিনি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে তার মক্কেলকে রক্ষার যথাযথ চেষ্টা করেন। তিনি একপর্যায়ে তার মক্কেলকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়াই যথাযথ, তা আদালতকে বুঝাতে সক্ষম হন এবং এই গুপ্তচরের ত্রিশ (৩০) বছরের কারাদণ্ড হয়। এই আদেশের বিপক্ষেও উচ্চ আদালতে আপীল করা হয়।
মামলার শুনানি কালে এই ডিফেন্স এটর্নির পরিবার নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে পড়ে। কেননা জনমত এবং গণমাধ্যম এই রুশ গুপ্তচরের বিরুদ্ধে ছিলো। একপর্যায়ে জনগণ এই বিখ্যাত আইনবিদের বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর করে।
তবুও এই আইনবিদ তার পেশাগত দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি। তিনি আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার সমুন্নত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
প্রত্যেক মানুষেরই ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। একইসাথে অধিকার আছে আইনগত সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার।
আমাদের দেশে প্রায়ই চাঞ্চল্যকর হত্যা, ধর্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির মতো ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক সময়ই দায়ী হিসাবে অভিযুক্তদেরকে আইনের মুখোমুখি দাড় করানো হয়। স্বাভাবিকভাবেই তারা আইনগত সহায়তা পান, তাদের পক্ষে আইনজীবীরা দাড়ান।
এই ব্যাপারে ঢালাওভাবে আইনজীবীদের দোষারোপ করা হয়। অনেকে মনে করেন, আইনজীবীরা শুধুমাত্র টাকার জন্যই এই ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যা, ধর্ষণ কিংবা দুর্নীতির মামলা গুলোয় ডিফেন্স করেন।
অথচ, ন্যায় বিচারের স্বার্থে একটা সভ্য সমাজে প্রত্যেকেরই আইনগত সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়া একান্ত জরুরি। একটা সভ্য সমাজে চাইলেই কাউকে শ্যুট করে মেরে ফেলা যায়না। কাউকে প্রাণদন্ড কিংবা যেকোন দন্ড দিতে হলে তার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক।
এজন্যই আমরা সশস্ত্র বাহিনীগুলোর এনকাউন্টারের বিরোধিতা করি, র্যাব-পুলিশের ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করি। একই কারণে আমরা মব-জাস্টিস তথা গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যারও বিরোধিতা করি।
একজন সভ্য, সুশিক্ষিত নাগরিক হিসাবে, একজন আইনের ছাত্র হিসাবে, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসাবে এই কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রত্যেকেরই ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। প্রত্যেক মানুষেরই আত্মপক্ষ সমর্থনের সু্যোগ পাওয়ার অধিকার আছে। কোন অবস্থাতেই ট্রায়াল ব্যাতিরেকে কাউকে শাস্তি প্রদান কোনভাবেই সমর্থন করা যায়না।
যেকোনো ফৌজদারি অভিযোগের ক্ষেত্রে ভিকটিমের যেরূপ ন্যায় বিচার পাওয়া অধিকার, একইভাবে আইনগত সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়া আসামীরও ন্যায্য অধিকার।
বর্তমানে মহামারির এই সময়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুর্নীতি কান্ডে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহেদ এবং জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডাক্তার সাবরিনা চৌধুরীকে গ্রেফতার করে কোর্টে তোলা হয়েছে। তাদের পক্ষে যাতে কোর্টে কোন আইনজীবী না দাড়ান সেজন্য অনলাইনে ক্যাম্পেইনিংও চোখে পড়েছে। তাদের পক্ষে যেসকল আইনজীবী কোর্টে দাড়িয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে হেইট-স্পিচ ছড়ানো হচ্ছে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
আমাদেরকে বুঝতে হবে, দুর্নীতি বা খুন কিংবা ধর্ষণের জন্য অভিযুক্তদের পক্ষে কোর্টে দাড়ানোর মানে গুম, খুন কিংবা ধর্ষণের সমর্থন করা নয়।
এদেশের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের হতাশা আছে, একইভাবে বিচার বিভাগের প্রতিও মানুষ যথাযথ আস্থাবান নয়। পুলিশ এবং প্রসিকিউশন বিভাগের দুর্বলতার জন্যও অনেক সময় আসামিরা ছাড়া পেয়ে যায়। তারজন্যও সাধারণ মানুষ বিচার বিভাগের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়। সাধারণ মানুষ ভাবে, বিচার বিভাগ যথাযথ কাজ করেনা। অথচ আমরা বুঝিনা যে, শুধুমাত্র ভালো বিচার বিভাগই একটা ভালো বিচার এনে দিতে পারেনা। এজন্য প্রয়োজন সামগ্রিক উন্নয়ন।
একটা সভ্য ও উন্নত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য একটা উন্নত বিচার ব্যবস্থা অতি আবশ্যক।
একটা সুন্দর সমাজের স্বপ্নচারী হিসাবে আমি চাই, আমরা জনসাধারণ আরো সচেতন হই। সকল ধরনের গুম, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে অবস্থান নিই। একই সাথে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসি।
আলী আহমদ মাসুদ
বিএসএস (অনার্স), এমএসএস (১ম শ্রেণী)
(সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, এনইউ)
এলএল.বি (এন,ইউ)