20/05/2026
গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত স্বাধীন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে কেবল হত্যাই করা হয়নি, বরং এক চরম নৃশংসতায় তাঁর মৃতদেহটিকে টুকরো টুকরো করে কেটে সালফিউরিক অ্যাসিডে দ্রবীভূত করে দেওয়া হয়েছিল। ইউরোপীয় সামরিক অফিসারদের মনে এক মৃত মানুষের মরদেহের প্রতি যে কী বিপুল ভয় কাজ করছিল, এই ঘটনা তারই এক চরম ঐতিহাসিক প্রমাণ।
সালটা ছিল ১৯৬০, যখন লুমুম্বা নিজের খনিজ সম্পদে ঠাসা মাতৃভূমিকে বেলজিয়ামের রক্তক্ষয়ী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করে এক নতুন ভোরের আলো দেখিয়েছিলেন। শোষিত আফ্রিকান মহাদেশের বুকে তিনি ছিলেন এক আপসহীন গণতান্ত্রিক আশার প্রতীক, অথচ পশ্চিমা শক্তিগুলির দ্বিচারিতায় তাঁর সেই সরকার ছ’টি মাসও টিকে থাকতে পারেনি। যে রাষ্ট্রগুলি বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের বাণী প্রচার করত, তারাই পর্দার আড়ালে ঠান্ডা যুদ্ধের এক নির্মম সমীকরণ তৈরি করেছিল, যা বুঝতে হয়তো এই তরুণ নেতা কিছুটা ভুল করেছিলেন।
এই স্বাধীনচেতা নেতার ওপর ভূরাজনৈতিক মৃত্যুদণ্ডটি যেন লেখা হয়ে গিয়েছিল ঠিক সেই দিনই, যেদিন তাঁর দেশ নিজের স্বাধীনতা উদযাপন করছিল। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিবসের সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বেলজিয়ামের দাম্ভিক রাজা বোদুয়াঁ তাঁর পূর্বপুরুষদের নৃশংস ঔপনিবেশিক শাসনকে এক মহান ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরে অত্যন্ত অপমানজনক একটি ভাষণ দেন।
লুমুম্বা এই চরম অপমান মুখ বুজে মেনে নিতে চাননি। নির্ধারিত সূচির বাইরে গিয়ে তিনি সোজা পোডিয়ামে এসে দাঁড়ান এবং এক অত্যন্ত সাহসী ও তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় শোষণ এবং বর্ণবৈষম্যের ভয়াবহ বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে নগ্ন করে দেন। তাঁর সেই অকুতোভয় বক্তব্য শুনে উপস্থিত পশ্চিমা কূটনীতিকরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই স্বাধীনচেতা আফ্রিকান নেতাকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না এবং কোনো আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কেনাও অসম্ভব।
স্বাধীনতা উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই এই সদ্য স্বাধীন ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রটিকে এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। কঙ্গোর দক্ষিণ প্রান্তের খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ অত্যন্ত ধনী প্রদেশ কাতাঙ্গা আচমকাই এক রক্তাক্ত বিদ্রোহের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনটিকে পিছন থেকে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করছিল বেলজিয়ামের ক্ষমতাশালী খনি সংস্থাগুলি, যারা যেকোনো মূল্যে ওই অঞ্চলের বিপুল ইউরেনিয়াম এবং তামার ওপর নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখতে চেয়েছিল।
নিজের দেশকে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য লুমুম্বা রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা শক্তিগুলি যখন তাঁর সেই আর্তনাদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তখন নিরুপায় হয়ে প্রধানমন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে লজিস্টিক ও পরিবহন সহায়তা চাওয়ার এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সেই উত্তাল আবহে এই একটি পদক্ষেপই তাঁকে সরাসরি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর থেকে এই অবাধ্য নেতাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গোপনে হাত মেলানো হয়। পরবর্তীতে অবমুক্ত হওয়া মার্কিন নথিপত্র এবং ১৯৭৫ সালের চার্চ কমিটির তদন্ত থেকে জানা যায় যে, স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার লুমুম্বাকে চিরতরে শেষ করার জন্য সিআইএ-কে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এই নির্দেশের পর সিআইএ-র প্রধান বিষবিশেষজ্ঞ সিডনি গটলিয়েব একটি টুথপেস্টের টিউবের মধ্যে অত্যন্ত মারাত্মক জৈব বিষ লুকিয়ে আফ্রিকায় পাঠায়, যার কোড নাম দেওয়া হয়েছিল 'প্রজেক্ট উইজার্ড'। যদিও সেই বিষ প্রয়োগের পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু তাদের বিপুল গোপন অর্থায়নে কঙ্গোর মাটিতে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সফল করা হয়। পশ্চিমা গোয়েন্দা তহবিলের ওপর ভর করে কর্নেল জোসেফ মবুতু আচমকাই দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেন এবং স্বাধীনতার মূল কারিগরকে নিজের রাজধানীতেই গৃহবন্দী করে এক বন্দীতে পরিণত করেন।
নিজের অস্তিত্বই যে পশ্চিমা-সমর্থিত এই একনায়কতন্ত্রের জন্য এক মস্ত বড় হুমকি, তা বুঝতে পেরে লুমুম্বা এক চরম বিপজ্জনক রাতে বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সাঙ্কুরু নদীর কাদাভর্তি তীরের কাছে মবুতুর সশস্ত্র সেনারা তাঁকে অত্যন্ত নির্মমভাবে বন্দি করে। টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন ও মারধর করা হয় এবং এরপর বিমানে করে সরাসরি কাতাঙ্গায় তাঁর পরম শত্রুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি, এক হাড় কাঁপানো অন্ধকার রাতে, ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত প্রধানমন্ত্রীকে গভীর আফ্রিকান সাভানা অঞ্চলের এক নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি গাছের সঙ্গে তাঁকে শক্ত করে বেঁধে, বেলজিয়াম অফিসারদের প্রত্যক্ষ কমান্ডে থাকা একটি ফায়ারিং স্কোয়াড তাঁর বুকে ঝাঁঝরা করে দেয় বুলেটের পর বুলেট। ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির নীরব সম্মতিতে ইউরোপীয় বুলেটের আঘাতে স্তব্ধ হয়ে যায় কঙ্গোর স্বাধীনতার সেই মহান কণ্ঠস্বর।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধের মূল চক্রীরা এক নতুন এবং অত্যন্ত ভয়াবহ বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, সাধারণ মানুষ যদি কোনোদিন এই নেতার কবরের সন্ধান পেয়ে যায়, তবে সেই সমাধিটি রাতারাতি এক জাতীয় তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হবে। এর ফলে যে গণবিপ্লব ঘটবে, তা হয়তো পুরো মহাদেশ থেকে বিদেশী বহুজাতিক সংস্থাগুলিকে চিরতরে উপড়ে ফেলবে। তাই এই হত্যার সমস্ত শারীরিক প্রমাণ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া জরুরি ছিল। বেলজিয়ামের এক বিশেষ পুলিশ কমিশনার জেরার্ড সোয়াতকে গভীর রাতে সেই অগভীর কবরের পাশে ডেকে পাঠানো হয় এবং তাঁর ওপর সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গোপন এক দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাতে লুমুম্বার অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যায়।
রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সোয়াত এবং তাঁর সহযোগীরা লুমুম্বা ও তাঁর দুই বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার গলিত মরদেহ কবর থেকে তুলে আনে। লোহার করাত দিয়ে তারা সেই মৃতদেহগুলিকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় টুকরো টুকরো করে কাটে এবং একটি স্থানীয় বেলজিয়ান খনি কোম্পানি থেকে আনা ঘন সালফিউরিক অ্যাসিডে ভরতি ধাতব ড্রামের মধ্যে সেই দেহাংশগুলি ফেলে দেয়। শরীরগুলিকে সম্পূর্ণ গলিয়ে তরলে পরিণত করতে টানা দু'দিন সময় লেগেছিল এবং শেষে অবশিষ্ট থাকা বিষাক্ত কাদা ও ছাই পাশের মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে বিশ্ববাসীকে এই সাজানো গল্পটি বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী জেল থেকে পালিয়ে গ্রামবাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন, যতক্ষণ না গোপন আর্কাইভের নথিপত্র এই পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের আসল সত্যটি উন্মোচিত করে।
কিন্তু এই চরম ট্র্যাজেডির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিকৃত ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রমাণটি লুকিয়ে ছিল আধুনিক ইউরোপের একটি শান্ত ইটের বাড়ির ভেতর। যে পুলিশ কমিশনার এই পুরো অ্যাসিড প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছিলেন, তিনি আসলে আফ্রিকান নেতার সমস্ত স্মৃতি ধ্বংস করেননি। এক চরম ঔপনিবেশিক অহংকার ও পাশবিক উল্লাসে সোয়াত অ্যাসিডে ফেলার ঠিক আগের মুহূর্তে প্লায়ার্স দিয়ে টেনে লুমুম্বার মাথা থেকে দুটি সোনা বাঁধানো দাঁত এবং হাতের কয়েকটি আঙুলের হাড় উপড়ে নিয়েছিলেন। এই দেহাংশগুলিকে তিনি কয়েক দশক ধরে একটি ছোট কাঠের বাক্সে নিজের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন এক পৈশাচিক স্মারক বা ট্রফি হিসেবে। যে মানুষটি নিজের দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য এক বিশাল সাম্রাজ্যের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁরই শরীরের অংশ ইউরোপের এক খুনের মঞ্চে সাজানো ট্রফি হয়ে রয়ে গিয়েছিল।
এই ঘটনার দীর্ঘ সময় পর, ২০০০ সালে জেরার্ড সোয়াত কোনো বিচার বা শাস্তি পাওয়ার আগেই মারা যান। তবে ইতিহাসের বিচার এখানেই থেমে থাকেনি। ২০১৬ সালে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সোয়াতের মেয়ে যখন সেই কাঠের বাক্সটি জনসমক্ষে প্রদর্শন করেন, তখন বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সেই সোনা বাঁধানো দাঁতটি বাজেয়াপ্ত করে এবং ব্রাসেলসের জাস্টিস প্যালেসে তা সুরক্ষিত রাখা হয়।
লুমুম্বার মেয়ে জুলিয়ানা ২০২০ সালে বেলজিয়ামের রাজার কাছে এক আবেগঘন চিঠিতে তাঁর বাবার সেই শেষ অবশিষ্টাংশটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। অবশেষে ২০২২ সালের ২০ জুন, বেলজিয়াম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লুমুম্বার পরিবারের হাতে সেই দাঁতটি তুলে দেয় এবং তৎকালীন বেলজিয়ান প্রধানমন্ত্রী এই হত্যাকাণ্ডে তাঁদের দেশের নৈতিক দায় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ২০২২ সালের ৩০ জুন, স্বাধীনতার ঠিক ৬২ বছর পর, কঙ্গোর পতাকায় মোড়ানো একটি কফিনে করে লুমুম্বার সেই একমাত্র দেহাংশ স্বদেশে ফিরিয়ে এনে এক বিশাল স্মৃতিসৌধে সমাহিত করা হয়।