23/07/2025
#রিমঝিম
তখন বাজে সন্ধে সাতটা,, বর্ষাকালের এক অবিরাম বর্ষনমুখর সন্ধেবেলা......সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিলো,,ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে ছিলো.... কিন্তু বৃষ্টি ছিলো না,চারপাশটা কেমন যেন গুমরে কাঁদছিলো,,দুপুর থেকেই রিমঝিম বৃষ্টির আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো.....এরপর যত বিকেল গড়িয়ে আসছিলো বৃষ্টির দাপট আস্তে আস্তে বাড়ছিলো এবং এখন সেটা প্রবল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে...... বৃষ্টির জন্য অনেক দোকানপাটেই ঝাঁপ নেমে গেছে.....তবে স্টেশনের ধারে দু একটা চায়ের দোকানে তখনো টিমটিম করে আলো জ্বলছে ......একটি অখ্যাতনামা ছোট্ট স্টেশন,,দেখেই বোঝা যাচ্ছে সারাদিনে বেশি গাড়ি সেখানে দাঁড়ায় না,,তাই বেশি লোকজন ও ট্রেন ধরার জন্য অপেক্ষা করছে না,,আর এই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে ট্রেন যে কত দেরিতে পৌঁছাবে সেটা ভগবান ই জানেন.....।
স্টেশনের কিছুটা অংশ আলোকিত হোলেও দূরে একেবারেই অন্ধকার....আর বৃষ্টির জন্য চারপাশ সাদা হয়ে আছে,,সেই অন্ধকার রাস্তায় রেললাইনের পাত ধরে একটা মেয়ে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে চলেছে.....পরনে একটা শাড়ি,, আটপৌরে করে পরা আছে,, কিন্তু সে এতটাই ভয়ে দৌড়ে আসছিলো যে তার শাড়ির দিকে লক্ষ্য ছিলো না.....তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে প্রানের ভয়ে দৌড়ে চলেছে...... মুষলধারে বৃষ্টি ও তার গতিকে রুদ্ধ করতে পারছে না.....মেয়েটার পেছনে আরো তিনজন লোক ছুটে আসছিলো.....ওকে ধরার জন্য ই তারা ছুটে আসছে.....যদি সামনে কোনো ট্রেন আসতো তাহলে হয়তো মেয়েটি নিজের প্রান বিসর্জন দিয়ে দিতো,, কিন্তু মৃত্যু তার কপালে লেখা ছিলো না.....পাথুরে রেললাইনের ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে ধাক্কা লেগে পড়ে গেলো,,আর সাথে সাথেই তিনটে লোক এসে ওকে চেপে ধরলো.... মেয়েটা প্রানপনে চিৎকার করছে....."আমাকে ছেড়ে দাও...... ওখানে নিয়ে যেয়ো না....মেরে ফেলো তার চেয়ে.....আমি ওখানে.....",,কথা শেষ করার আগেই একজন ওর মুখটা চেপে ধরলো......"শালী....নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে তোকে কিনতে হয়েছে.....ছেড়ে দেবো????তোকে না নিয়ে গেলে আমি মুখ দেখাবো কি করে????চল.....",, মেয়েটা তবুও বাধা দিতে চেষ্টা করছিলো কিন্তু তিনজন লোকের সাথে পেরে উঠলো না,, ওর নাকে মুখে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেললো.....তারপরেই টেনে তুললো গাড়িতে.... অন্ধকারের মধ্যে গাড়িটা শহরের দিকে ছুটে চললো।
শহরের মধ্যিখানে একটা তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়ি..... আজকে সন্ধের পর থেকে প্রচন্ড বৃষ্টির দাপটে বাড়ির লোকগুলোর কাজকর্মে একটু ঢিলেমি দেখা দিয়েছে..... কারোর ই কাজে তেমন মন নেই....চলুন পরিচয় করি বাড়ির সদস্যদের সাথে....এই বাড়িটার মালিক রনজয় চ্যাটার্জি....তিনি একজন বিখ্যাত বিজনেস পার্সন না হোলেও মোটামুটি বলা যায়.....সচ্ছল ভাবেই তাদের সংসার চলে যায়....রনজয় চ্যাটার্জির দুই ছেলে..... অভ্র আর আবীর.....দুজনেই পড়াশোনায় ভীষন ভালো..... অভ্র এম বি এ করে বাবার সাথেই ব্যবসা সামলায়,,আর আবীর ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো তে চাকরি করতো....এখন স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চে আছে..... এছাড়াও বাড়িতে আছে ওনার স্ত্রী....সোমলতা,,, অভ্রর স্ত্রী অন্বেষা,,আর অন্বেষার বোন শ্রেয়া...... অভ্রর একটা সাত বছরের ছেলেও আছে,,টিঙ্কু.....এনারাই মোটামুটি বাড়ির সদস্য তবে শ্রেয়ার এখানে থাকার একটা অন্য কারন আছে...সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য।
অভ্র আর অন্বেষার প্রেমের বিয়ে.....অন্বেষা বিশাল বড়োলোক বাড়ির মেয়ে,, অভ্রর বাবার চাইতে তার শ্বশুরের নামডাক অনেক বেশি,,আর সেই কারনেই বাড়িতে অন্বেষার দাপট একটু বেশি,, প্রথম থেকেই সে ভীষন অহংকারী.... নাকউঁচু টাইপের মেয়ে,, বাড়িতে দুজন কাজের লোকের মধ্যে একজন শুধু অন্বেষার ফাইফরমাশ খাটে,,সে বাড়িতে কোনো কাজ করে না,,তার বাবা তাকে তুলোয় মুড়ে রাখতো,,এখানেই সে তাই থাকে.... রান্নাঘরে সে জন্মে ঢোকেনি,,ছেলে হওয়ার পরে শাশুড়ি মাকেই সব দায়িত্ব ঠেলে দিয়েছিলো.... ছেলেটা ঠাম্মা বলতে অজ্ঞান,,মাকে দেখলেই সে হাসে.....কারন অন্বেষা শুধু মুখে বড়ো বড়ো কথা বলে আর হম্বিতম্বি করে,,কোনো কাজেই সে পারদর্শী নয়....তবে এই নিয়ে সোমলতা কখনো ওকে কথা শোনায়নি কারন সোমলতা খুব শান্ত নম্র ভদ্র স্বভাবের মানুষ,, উঁচু স্বরে কথা বলা,, ঝগড়া করা চিৎকার করা,,কাজের লোকের ওপরে অহেতুক রেগে যাওয়া এগুলো তার ধাতে নেই,,সে সবাইকেই ভালোবাসে,ভালো রাখে,, হাজার কষ্ট থাকলেও মুখে হাসি লেগেই আছে,,আর ঠিক এই কারনের জন্য আবীর তার মা কে নিয়ে ভীষন প্রাউড ফিল করে,,আবীর প্রায় তার মায়ের মতোই.... ভদ্র,, সংযত, বুদ্ধিদীপ্ত.....রাগের মতো কারন থাকলে সে রেগে যায় কিন্তু মেজাজী,মুডি, রুক্ষতা তার চরিত্রের মধ্যে নেই,,সে যথেষ্ট সহনশীল একজন মানুষ ,,বুঝে কাজ করে,,বুঝে কথা বলে,, অল্পভাষী কিন্তু স্পষ্টবক্তা.....খারাপ লাগলে মুখের ওপরেই শুনিয়ে দেয়..... বৌদির এই বাড়াবাড়ি রকমের অত্যাধুনিকতা তার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে....সে বলতেও ছাড়ে না....।
অন্বেষা ভীষন অর্থলোভী অহংকারী একটা মেয়ে,, সুন্দরী.....তাই দেমাকের চোটে মাটিতে পা পড়ে না,,আর অভ্র ও খুব শান্ত ছেলে..... বৌ কে সে বেশ ভয় পায়,,তবে মায়ের মতো সেও ঝগড়া পছন্দ করে না.... অন্বেষা তার বর কে হাতের মুঠোয় করে রেখেছে....সে চাইছে এই পুরো বিজনেস টা রনজয় চ্যাটার্জি তার বরের নামে লিখে দিক কারন আবীর ব্যবসার কিছুই দেখে না....তাছাড়া সে যে ডিপার্টমেন্টে আছে বেশ মোটা মাইনে পায়,,বাবার টাকা তার দরকার নেই....তাই পুরো সম্পত্তি তার চাই....শ্রেয়া কে এই বাড়িতে রেখেছে কারন আবীরের সাথে তার বোনের বিয়েটা দিতে চায়..... আবীর ছেলে হিসেবে অতুলনীয়....দেখতে সুন্দর কম বয়স,, এরকম ভালো একটা জায়গায় চাকরি করে....একে সে মোটেই হাতছাড়া করতে চাইছে না.... কিন্তু আবীর জেনেও পাত্তা দেয়নি,,অন্বেষা বা শ্রেয়া কাউকেই তার ভালো লাগে না.... তাছাড়া বিয়ের কথা এখনো সে ভেবে দেখেনি,,কাজ নিয়েই পড়ে থাকে।
বৃষ্টির মধ্যে আবীর নিজের ঘরে বসে আছে,,,,কানে হেডফোন দিয়ে....এখন তার কোনো কাজ নেই....তবে তাদের এই লাইনে কখন কাজ চলে আসবে সেটা ভগবান ও জানে না....টিঙ্কু ঘরে ঢুকলো,,ছেলেটার বয়স সাত হলেও খুব পাকা,,বিজ্ঞ বিজ্ঞ টাইপের......"কাকা...ও কাকা....গান শুনছো নাকি?????"
আবীর হেডফোন নামিয়ে রাখে......টিঙ্কু তার বড়োই ন্যাওটা....."বলুন টিঙ্কু বাবু....কি খবর????"
টিঙ্কু চশমাটা নাকের ডগায় তুলে বললো....."নীচে চলো.....ঠাম্মি ডাকছে....."
আবীর ----"কেন????"
টিঙ্কু -----"তেলেভাজা হচ্ছে.....খাবে চলো....."
আবীর উঠে পড়লো....."তাই....চলো দেখি...."
নীচে সবাই বসে আছে,,মা আর কাজের লোকেরা মিলে গরম গরম তেলেভাজা করছে....অন্বেষা একটু দূরে বসে নাক সিঁটকে বলছে.....এইসব তেলের জিনিস সে খাবে না.....আবীর বা টিঙ্কু ওকে একেবারেই পাত্তা দেয় না....তারা নিজেদের মতো গল্প করছে..... হঠাৎ বাইরে একটা ঝটাপটির আওয়াজ হোলো.....সোমলতা----"এই দেখতো রে বাইরে কিসের আওয়াজ????"
একটা মেয়ে বেরিয়ে গেলো বারান্দায়....."ও মা!!!দেখবে এসো ,,কি সুন্দর একটা লক্ষ্মী প্যাচা...."
সোমলতা বেরিয়ে এসেছে......কি সুন্দর সাদা ধপধপে প্যাচাটা...."আহা রে!!!! বৃষ্টিতে ভিজে বেচারি একশেষ....শুভ জিনিস,,তাড়িয়ে দিস না......থাক ওখানে....."
"তোমার বাড়িতে খুব শিগগিরই একটা লক্ষ্মী মেয়ে আসবে..... লক্ষ্মী প্যাচা খুব পয়মন্ত.... সৌভাগ্যের প্রতীক জানো!!!দেখো গে ছোটো দাদাবাবুর বৌ আসবে হয়তো......"
চলবে.....
কেমন লাগলো প্রথম পর্ব কমেন্ট করে জানাবেন।