08/06/2026
রিট অব সার্টিওরারি (Writ of Certiorari): গ্রহণযোগ্যতার সীমা ও হাইকোর্ট বিভাগের হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগকে প্রদত্ত সাংবিধানিক ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রিট অব সার্টিওরারি। এই রিটের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ অধস্তন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কোয়াসি-জুডিশিয়াল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বৈধতা পর্যালোচনা করতে পারে। তবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়; বরং সুপ্রতিষ্ঠিত বিচারিক নীতিমালার আলোকে এর প্রয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
সার্টিওরারি রিটের প্রকৃতি
রিট অব সার্টিওরারির উদ্দেশ্য কোনো মামলার পুনঃশুনানি (re-hearing) করা নয় কিংবা প্রমাণের পুনর্মূল্যায়ন (re-appreciation of evidence) করা নয়। হাইকোর্ট বিভাগ এ ধরনের রিট আবেদনে আপিল আদালতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় না। বরং এর লক্ষ্য হলো সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ আইনানুগভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে কি না এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক আইনগত ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা।
এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, কোনো ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট অব সার্টিওরারি আবেদনে হাইকোর্ট বিভাগ সাধারণত হস্তক্ষেপ করতে অনিচ্ছুক (loath to interfere), যদি না সিদ্ধান্তটি স্পষ্টতই বিকৃত (perverse) হয় অথবা এর ফলে গুরুতর বিচারিক ব্যর্থতা (gross miscarriage of justice) সংঘটিত হয়ে থাকে।
শুধুমাত্র আইনের সাধারণ ভুল যথেষ্ট নয়
কেবলমাত্র কোনো আইনগত ভুল (mere error of law) সংঘটিত হয়েছে—এই কারণেই সার্টিওরারি রিট জারি করা যায় না। আইনের ভুলটি এমন হতে হবে যা “error apparent on the face of the record”, অর্থাৎ রেকর্ডের উপরিভাগ থেকেই সুস্পষ্ট ও স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রতীয়মান হয়।
যদি কোনো আইনগত প্রশ্ন বিতর্কযোগ্য হয় অথবা তা নির্ধারণের জন্য দীর্ঘ যুক্তিতর্কের প্রয়োজন হয়, তবে সাধারণত সেটিকে “error apparent on the face of the record” বলা যায় না। সার্টিওরারি রিটের মাধ্যমে সংশোধনযোগ্য ত্রুটি হতে হবে দৃশ্যমান, প্রকট এবং মৌলিক প্রকৃতির।
যেসব ক্ষেত্রে সার্টিওরারি রিট জারি করা যেতে পারে
বিচারিক সিদ্ধান্ত ও প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুসারে নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট বিভাগ রিট অব সার্টিওরারি জারি করতে পারে—
১. প্রতারণা, আঁতাত বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সিদ্ধান্ত
যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো রায় বা আদেশ প্রতারণা (fraud), আঁতাত (collusion) অথবা দুর্নীতির (corruption) মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, তবে তা বিচারিক সুরক্ষার দাবিদার নয় এবং সার্টিওরারি রিটের মাধ্যমে বাতিলযোগ্য।
২. প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন
যেখানে কোনো পক্ষকে শুনানির সুযোগ প্রদান করা হয়নি, পক্ষপাতদুষ্টভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, অথবা “audi alteram partem” নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে, সেখানে হাইকোর্ট বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারে।
৩. রেকর্ডের উপরিভাগে স্পষ্ট আইনগত ত্রুটি
যদি সিদ্ধান্তে এমন কোনো আইনগত ভুল থাকে যা রেকর্ড পর্যালোচনা করলেই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, তবে সেটি সার্টিওরারি রিটের মাধ্যমে সংশোধনযোগ্য।
৪. কোনো প্রমাণ ব্যতিরেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
যদি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে প্রমাণবিহীন (based on no evidence whatsoever) হয়, তবে তা আইনসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হতে পারে না এবং বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
৫. অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত
কোনো সিদ্ধান্ত যদি বিদ্বেষমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা mala fide হয়, তবে তা আইনগত বৈধতা হারায় এবং হাইকোর্ট বিভাগের হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।
৬. বিকৃত বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত
যদি সিদ্ধান্তটি এতটাই অযৌক্তিক, অস্বাভাবিক বা বিকৃত (perverse) হয় যে কোনো যুক্তিসঙ্গত বিচারিক কর্তৃপক্ষ একই প্রমাণের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারত না, তবে হাইকোর্ট বিভাগ সার্টিওরারি রিট জারি করতে পারে।
উপসংহার
রিট অব সার্টিওরারি কোনো বিকল্প আপিল ব্যবস্থা নয়; এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী সাংবিধানিক প্রতিকার। এর উদ্দেশ্য হলো বিচারিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে আইনের সীমার মধ্যে রাখা এবং মৌলিক বিচারিক ত্রুটি সংশোধন করা। তাই কেবলমাত্র কোনো সিদ্ধান্ত ভুল বা বিতর্কযোগ্য হলেই সার্টিওরারি রিট গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং সিদ্ধান্তে এমন গুরুতর আইনগত ত্রুটি, এখতিয়ারগত অসঙ্গতি বা ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা থাকতে হবে, যা হাইকোর্ট বিভাগের সাংবিধানিক হস্তক্ষেপকে অপরিহার্য করে তোলে