05/01/2025
ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ:
ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ হলো একটি বৈধ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। এটি পারস্পরিক সম্মতি বা একতরফাভাবে হতে পারে এবং বিভিন্ন আইনি পদ্ধতি ও বিধানের অধীনে সম্পন্ন হয়। এখানে ডিভোর্স এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত আইনগত বিষয়ে আলোচনা করা হলো:
১. ডিভোর্সের আইনগত ভিত্তি:
ডিভোর্সের ক্ষেত্রে আইন দেশের ধর্মীয় ও পারিবারিক আইন অনুসারে ভিন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনগুলো (Muslim Family Laws Ordinance, Hindu Law, Christian Law) এবং কিছু সাধারণ বিধান (Special Marriage Act, Divorce Act) ডিভোর্স প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
২. মুসলিম আইনে ডিভোর্স (তালাক):
মুসলিম পরিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাক দেওয়া যেতে পারে তিনটি উপায়ে:
ক. তালাক (স্বামীর পক্ষ থেকে):
স্বামী লিখিতভাবে স্ত্রীর কাছে তালাকের নোটিশ প্রদান করবে।
নোটিশ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় জমা দিতে হবে।
৯০ দিনের মধ্যে সালিশি বোর্ড মীমাংসার চেষ্টা করবে।
যদি মীমাংসা না হয়, তালাক কার্যকর হবে।
খ. তালাক-এ-তাফবিজ (স্ত্রীর অধিকার):
স্ত্রী স্বামীর থেকে অনুমতি নিয়ে নিজে তালাক দিতে পারে, যদি বিবাহচুক্তিতে এ ধরনের শর্ত উল্লেখ থাকে।
গ. খুলা:
স্ত্রী যদি বিবাহবিচ্ছেদ চান এবং স্বামী সম্মত হয়, তবে পারস্পরিক চুক্তিতে তালাক কার্যকর হতে পারে।
৩. হিন্দু আইনে ডিভোর্স:
বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী, ডিভোর্সের বিধান নেই। তবে স্ত্রী নির্যাতন, পরিত্যাগ বা বিশেষ পরিস্থিতিতে পৃথক থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৪. খ্রিস্টান আইনে ডিভোর্স:
ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ অনুসারে, খ্রিস্টান দম্পতির ডিভোর্সের জন্য নিম্নলিখিত কারণ থাকতে পারে:
ক. ব্যভিচার
খ. নিষ্ঠুরতা
গ. পরিত্যাগ (দীর্ঘদিন ধরে)
আদালতে মামলা দায়েরের মাধ্যমে ডিভোর্স সম্পন্ন হয়।
৫. সিভিল বা বিশেষ বিবাহ আইনে ডিভোর্স:
Special Marriage Act, ১৮৭২ এবং Family Courts Ordinance, ১৯৮৫ অনুযায়ী-
পারস্পরিক সম্মতি থাকলে ডিভোর্স সহজ।
কোনো পক্ষ যদি একতরফাভাবে ডিভোর্স করতে চায়, তবে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।
৬. ডিভোর্সের কারণসমূহ:
ডিভোর্সের প্রধান কারণগুলো আইন অনুসারে হতে পারে। যথা:
ক. মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন।
খ. ব্যভিচার বা অবৈধ সম্পর্ক।
গ. অর্থনৈতিক অবহেলা।
ঘ. দীর্ঘ সময় ধরে পৃথক থাকা।
ঙ. পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা অমিল।
৭. ডিভোর্স পরবর্তী আইনি বিষয়ঃ
ক. মেয়াদী খোরপোষ (Maintenance):
স্বামীকে স্ত্রী ও সন্তানের জন্য ভরণপোষণ দিতে হতে পারে।
খ. সন্তানদের অভিভাবকত্ব (Custody of Children):
আদালত সন্তানের কল্যাণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করে।
3. সম্পত্তি ভাগ:
যদি যৌথ সম্পত্তি থাকে, আদালত উভয় পক্ষের অধিকার বিবেচনা করে তা ভাগ করবে।
৮. ডিভোর্সের আইনি প্রক্রিয়া:
ক. নোটিশ প্রদান: স্বামী বা স্ত্রী, যে পক্ষ ডিভোর্স চাইছে, তাকে নোটিশ দিতে হবে।
খ. সালিশি বোর্ড: ডিভোর্সের আগে সালিশি বোর্ড বা পারিবারিক আলোচনা বাধ্যতামূলক।
গ. আদালতে মামলা: যদি সমঝোতা না হয়, তবে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
ঘ. চূড়ান্ত ডিক্রি: আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিভোর্স কার্যকর হয়।
৯. আইনি সহায়তা:
ডিভোর্সের জন্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডিভোর্স একটি সংবেদনশীল বিষয়, তাই এটি আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা উচিত।